বিনোদনহোমপেজ স্লাইড ছবি

যে পাঁচটি ব্যান্ড আমাদের অনুভূতির অংশ হয়ে আছে!

মাহমুদুর রহমান: ব্যান্ড সংগীত সারা বিশ্বেই দারুণ জনপ্রিয়। সেই ধারায় পিছিয়ে নেই আমাদের দেশও। বিভিন্ন সময়ে নানা ব্যান্ড আমাদের মাতিয়েছে, এখনও মাতিয়ে যাচ্ছে। এখানে এমন পাঁচটি ব্যান্ডের কথা বলা হবে যারা আমাদের অনুভূতির অংশ হয়ে আছে।

এলআরবি ১৯৯০ সালের ৫ই এপ্রিল এই ব্যান্ডটি যাত্রা শুরু করে। প্রতিষ্ঠাতা আইয়ুব বাচ্চু। প্রতিষ্ঠাকালীন সময়ে এস আই টুটুল, হাবিব আনোয়ার জয় এবং স্বপন ব্যান্ডের সহ-সদস্য হিসেবে যোগ দিয়েছিলেন। শুরুতে ব্যান্ডটির নাম রাখা হয়েছিল লিটল রিভার ব্যান্ড। আরো পরে এই নামটিও পরিবর্তন হয়ে এখন হয়েছে লাভ রানস ব্লাইন্ড।

‘৯০ দশকের শুরুর দিকে এল আর বি-র যাত্রা শুরু একটি ডাবল অ্যালবাম দিয়ে। এলআরবি-র প্রথম এই ডাবলস-টি বের হয়েছিল মাধবী এবংহকার  নামে। এরপর আর থেমে থাকেনি এলআরবি। একের পর এক উপহার দিয়েছে এল আর বি-১ (১৯৯২), এল আর বি-২ (১৯৯২), সুখ (১৯৯৩),  তবুও (১৯৯৪), ঘুমন্ত শহরে (১৯৯৫) থেকে যুদ্ধ (২০১২)। অ্যালবামের সাথে ছিল মনোমুগ্ধকর, শ্বাসরুদ্ধকর একেকটি কনসার্ট। ব্যান্ড এবং তার প্রতিষ্ঠাতা আইয়ুব বাচ্চু হয়েছিলেন কিংবদন্তী।

আর্ক আর্ক ব্যান্ডটি এই সময়ের সংগীত ভক্তদের কাছে কিছু অপরিচিত নাম মনে হতে পারে। আশিকুজ্জামান টুলু এই ব্যান্ডের প্রতিষ্ঠাতা। ১৯৯৩ সালে ‘মুক্তিযুদ্ধ’ অ্যালবাম দিয়ে আর্ক-এর যাত্রা শুরু। আর্ক-কে না চিনলেও সংগীতপ্রেমীরা অবশ্যই হাসানকে চিনবেন। হাসান ছিলেন আর্কের সদস্য। মাইকেল জ্যাকসনের আদলে নিজেকে সাজানো হাসান নব্বই দশকের ব্যান্ড প্রেমীদের কাছে অন্যতম প্রিয় নাম। তিনি আর্ক-এ যোগ দিয়েছিলেন ১৯৯৬ সালে। এরপর আর্ক উপহার দেয় ‘তাজমহল’, ‘জন্মভূমি’ অ্যালবাম। 

২০০০ সালে হাসান আর্ক ছেড়ে চলে যান। প্রতিষ্ঠা করেন নিজের ব্যান্ড। ২০০৪ সালে তিনি ‘জন্মভূমি’ নামে ব্যান্ড তৈরি করেন। কিন্তু সেই পুরনো হাসান কিংবা হাসানের ছেড়ে যাওয়া আর্ক আগের মতো ছিলো না। ২০১০ সালের শেষের দিকে হাসান ঘোষণা দেন যে তিনি আবার আর্কে ফিরে আসছেন। কানাডা প্রবাসী আশিকুজ্জামান টুলুর সাথে একসঙ্গে কাজ করবেন। হাসান বলেন, ‘আমার আর টুলু ভাইয়ের মধ্যে কখনোই কোনো ব্যক্তিকেন্দ্রিক ভুল বোঝাবুঝি ছিল না। যে কারণে আমরা দূরে সরে ছিলাম, তা নিতান্তই দলকেন্দ্রিক ভুল বোঝাবুঝির ফল।’  ২০১১ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে আশিকুজ্জামান টুলু দেশে ফিরলে অ্যালবামের কাজ শুরু হবে। কিন্তু ভেঙে যাওয়া নৌকা আর আগের মতো চলেনি কখনও।

নগর বাউল ফারুক মাহফুজ আনাম নামটি চাপা পড়ে গেছে  যে দুইটি নামের আড়ালে, তা হলো জেমস এবং নগর বাউল। ‘গুরু’ নামেও তিনি সমধিক পরিচিত। মূলত ‘নগর বাউল’ ব্যান্ডের প্রতিষ্ঠাতা জেমস। কিন্তু ‘নগর বাউল’ কথাটা ব্যান্ডকে যতটা প্রকাশ করে, স্বয়ং জেমসকে ততটাই প্রকাশ করে। নগর বাউল আর জেমস একই কথা।

প্রথমে, চট্রগ্রাম থেকে শুরু হওয়া ব্যান্ড দল ‘ফিলিংস’-এ যোগ দেন। এখান থেকেই তিনি খ্যাতি অর্জন করেন। পরবর্তীতে তিনি নিজে ‘নগর বাউল’ নামে ব্যান্ড দল গঠন করেন। বাংলা ভাষায় তিনিই প্রথম সাইকিডেলিক রক শুরু করেন। গিটার বাজানোতেও তিনি দারুণ পটু। বলছিলাম নগর বাউল কেবল ব্যান্ড নয়, জেমস নিজেই নগর বাউল। কেননা তিনি যেখানে থাকবেন সেখানেই ভিড় জমে যাবে, তৈরি হবে ব্যান্ড আপনা আপনি।

নগরবাউল ব্যান্ডের মূল ভোকাল ও গিটারিষ্ট হলেও জেমস তার সলো ক্যারিয়ারকেই বেশি গুরত্ব দেন। অনেক গীতিকার তার জন্য সংগীত রচনা করেছেন। যাদের মধ্যে কবি শামসুর রহমান, প্রিন্স মাহমুদ, লতিফুল ইসলাম শিবলী। কর্মজীবনের প্রথম দিকে তিনি জিম মরিসন, মার্ক নফলার এবং এরিক ক্ল্যাপটনের সংগীত শিল্পীদের দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়েছেন। ১৯৮৭ সালে ফিলিংস ব্যান্ডের সাথে তার প্রথম অ্যালবাম “স্টেশন রোড” মুক্তি পায়। ১৯৮৮ সালে মুক্তি পায় তার প্রথম একক অ্যালবাম অনন্যা। পরবর্তীতে তিনি ফিলিংস ব্যান্ডের নাম পরিবর্তন করে নতুন নাম দেন “নগর বাউল”।  জেল থেকে বলছি (১৯৯৩), নগর বাউল (১৯৯৬), লেইস ফিতা লেইস (১৯৯৮), দুষ্টু ছেলের দল (২০০১), আমি তোমাদেরই লোক (২০০৩) অ্যালবাম গুলো এখনও আমাদের দোলা দেয়।

রেনেসাঁ বাংলাদেশের সবচেয়ে ‘সফিস্টিকেটেড’ ব্যান্ড রেনেসাঁ। মূলত ব্যান্ড বলতে আমরা যে প্রচুর মিউজিক, চিৎকার ভরা গান শুনি বা বুঝি, রেনেসাঁ তেমন গান বা তেমন পারফর্মেন্স দেয় নি। বরং গানের কথা, সুন্দর সঙ্গীত তাদের মূল বৈশিষ্ট। ভিন্ন ধারার ব্যান্ড সঙ্গীতে তারা প্রথম এবং প্রায় একমাত্র সংযোজন। 

১৯৮৫ সালে গঠিত হয়। এই ব্যান্ডের সবাই ছোটবেলা থেকে গান করতেন বা বাদ্যযন্ত্র বাজাতেন। ১৯৮৫ সালে নকীব খান সোলস ছেড়ে ঢাকায় আসার পর এই ব্যান্ড গঠন করেন। গঠনের পরও তাদের মধ্যে চলছিল ব্যাপক আলোচনা, গানের কাঁটাছেড়া, যোগ-বিয়োগ। পরবর্তীতে নকীব খান বলেন- ‘তখন দেশে রক গানের জোয়ার চলছে। আমরা চাচ্ছিলাম সেখান থেকে বেরিয়ে এসে নতুন কিছু করতে। মেলোডিয়াস, শক্তিশালী লিরিকস নিয়ে বাংলা গান করতে আমাদের দারুণ আকাঙ্খা হচ্ছিল।’ রেনেসাঁর অন্যতম সদস্য নকীব খান বলেন, ‘যেহেতু আমরা সবাই চাকরি নিয়ে ব্যস্ত থাকি তাই একটু সময় নিয়ে অ্যালবামের কাজগুলো করতে হয়। তা ছাড়া আমাদের ব্যান্ডের সবাই গানের ব্যাপারে খুবই সিরিয়াস। গানের গুণগত মানের ব্যাপারে আমরা কখনোই আপস করতে রাজি নই’।

নকীব খান, ফয়সাল সিদ্দিকি বগী, পিলু খান (নকীব খানের ছোট ভাই), কাজী হাবলু, মোটো, মামুনদের নিয়ে গঠিত এই ব্যান্ডের ‘রেঁনেসা (১৯৮৮), তৃতীয় বিশ্ব (১৯৯৩), একাত্তরের রেনেসাঁ (১৯৯৮), একুশ শতকে রেঁনেসা (২০০৪)’ অ্যালবামের গানগুলো এখনও আমাদের শুদ্ধ সংগীতের আনন্দ দেয়।

সোলস পপ মিউজিকের প্রতিনিধিত্ব করেছে যে ব্যান্ডটি তার নাম সোলস। চট্টগ্রামে শুরু হওয়া ব্যান্ডের প্রতিষ্ঠাকালীন সদস্য ছিলেন নকীব খান, তপন চৌধুরী, কুমার বিশ্বজিৎ এর মতো বর্তমান তারকারা। পরবর্তীতে নানা কারনে তাদের অনেকেই দল ছেড়ে দিয়েছিলেন। কিন্তু থেমে থাকেনি সোলস এর পথ চলা। 

পার্থ বড়ুয়া, নাসিম আলী খানের হাত ধরে অনেকটা পথ হেঁটেছে সোলস। দিয়েছে অনেক অ্যালবাম আর তাতে চমৎকার সব গান। কেন এই নিসঃঙ্গতা, আজ দিন কাটুক গানে, বাঁশি শুনে আর কাজ নেই, আমি আর ভাবনা, ব্যস্ততা আমাকে দেয় না, মন শুধু মন ছুয়েছে, কলেজের করিডোরে, তুমি রোজ বিকেলে, সাগরের ওই প্রান্তরে, ভালবাসি ওই সবুজ মেলা; এসব গান তাদেরই উপহার।

এই পাঁচটি ব্যান্ডের বাইরেও দলছুট, মাইলস, ফিডব্যাক সহ আরও অনেক ব্যান্ড আমাদের সময় সুন্দর করে তুলেছে। এখনও নতুন নতুন ব্যান্ড তৈরি হচ্ছে। সুন্দর হোক আমাদের ব্যান্ড-যাত্রা।

 

 

 

Related Articles

Adblock Detected

Please consider supporting us by disabling your ad blocker