বিনোদনহোমপেজ স্লাইড ছবি

বাংলা সিনেমার পথে আসিয়াছে ‘বিউটি সার্কাস’

মাশরুর ইমতিয়াজ: ‘বিউটি সার্কাস’ – এই সিনেমার টিজার এসেছে আন্তর্জালে। এই ট্রেলার দেখে অদ্ভুত চোখে তাকিয়ে থাকি। একটা কারণ, এই সিনেমার ট্রেলারের অসামান্য গল্প বলা ছবির হাঁটা চলা দেখে। অন্য কারণটা, মাহমুদ দিদার!পরিচালক, এই সিনেমার।
তো কী দেখবেন এর শুরুতেই? তাঁবুপথে হেঁটে যাওয়ার মধ্যের ডালিভরা সার্কাসজীবন, মঞ্চের ঠিক মাঝেই আলোর ঘেরা-টোপ জড়ানো অন্ধকার। আমাদের জীবনযাপনের মতোই এটা, তাই তো? এরপরে ফেইডেড ব্ল্যাকআউট থেকে জাঁকালো গোঁফের ফেরদৌস এর সামন্ততান্ত্রিক হাত, ঐ হাতে মণিকাঞ্চনের অলংকারসহ কামের স্পর্শ – সবকিছু যায় কেনা, এমনটাই কী ঐ হাসির আড়াল? তীক্ষ্ণ  চোখের আর কালো পোশাকের শতাব্দী ওয়াদুদের হাতের তরবারি, ঐ তরবারি টিনের নাকি মৃত্যুর? হ্যাট আর সানগ্লাস পড়া হুমায়ূন সাধু সার্কাসের জোকারের বেশে ঘণ্টা বাজাচ্ছে, জমকালো টিকেট ঘরে স্বেচ্ছাবন্দী হয়ে? চতুর্দিকে ঘুরছে সার্কাস কন্যা, উচ্চকিত দর্শকের দল – থ্রিলার দেখার হাততালির শব্দ হচ্ছে। কুলাঙ্গারের মতোন থাপ্পড় মারছে কাউকে এবিএম সুমন, অতি সুদর্শন এক বখে যাওয়া কোন মাস্তান সে? নাকি গলায় রুমাল বাঁধা তৌকির আহমেদ সিগ্রেটের ধোঁয়া ছেড়ে বাতাসের ভাঁজে উড়িয়ে দিচ্ছে উড়িয়ে দিচ্ছে ক্রোধ?
আর সবশেষে, পৃথিবীর ধূলা স্পর্শ করা একজন অতিমানবী, যাকে দেখার পরে মেডুসা নিজেই পাথর হয়ে যায়, যিনি দেবী না কি মানবী – এই বিভ্রান্তি নিতেই কেটে যাচ্ছে বঙ্গদেশের কয়েকটা দশক! এবং, জয়া আহসান তখন মাটিতে নেমে আসেন, তিনি কি বর্ণিল টুপি আর চাদর ভেতর থেকে বের করছেন শুধুই কতগুলো শাদা পায়রা? সেই বখাটে মাস্তান না কি মুগ্ধ হয়ে যাওয়া দর্শকের জন্য – তিনি বলে উঠছেন – ‘আই লাভ ইউ’! আমাদের জয়া বিষয়ক বিভ্রান্তি আরো বেড়ে যায় এইসব প্রশ্নের খুঁজতে খুঁজতে। প্রশ্নোত্তর খুব সহজ এক অর্থে, ট্রেলার এর একদম শেষে, পাখির চোখ থেকে দেখা বিউটি সার্কাসের তাঁবুর লাল-নীল-হলুদ রঙ মাখা আলোময় তাঁবু! ব্যক্তিগত উপসংহারে বা সামাজিক মানুষের দলে, সবকিছুই তো ঐ সার্কাসি জীবনের চৌহদ্দিতে আটকে যায় দিনের শেষে।
ট্রেলার দেখা শেষে আমাকে ফিরে যেতে হয় এগারো বছর আগের দুপুরে। হলের ঠিক পাশের রুমের একজন অন্যরকমের মানুষ, হুট করে এসে বলেন – এই নে ‘থার্ড সিনেমা’র ওপর বই। এটা পড়, আর সিনেমাগুলো দেখবি। তোকে একটা লেখা লিখতে হবে ‘তৃতীয় সিনেমা’ নিয়ে। এরপরে কোন একদিন তিনি আসেন, আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের দুধেভাতে উৎপাতের সাথে। কখনো কামুর ‘মিথ অফ সিসিফাস’ নিয়ে ফিসফিসান তিনি। আবার কখনো কলা ভবনের ডানপাশের গেটের সিঁড়িতে, অনভ্যাসে তিনি বলে ওঠেন, এই বুলেটিন বিকিয়ে বিল্পব হবে তো! সেই মানুষটা বানিয়েছেন বানিয়ে যেতে থাকেন অজস্র সব ঘোরগ্রস্থ করে দেয়া টেলিভিশন নাটক, আজ অবধি।
কখনো তিনি একজন ডোম আর লাশকাটা ঘরের মৃত লাশের মধ্যে আলাপ ঘটান খসড়া চিত্রনাট্যে। কখনো চেরি ফুলের নামে নাম রাখেন, আর কখনো একটা ম্যাজিকাল ঘোরের এক ঘন্টার টেলিভিশনে বন্দি করেন খ্যাপাটে পরিচালকের সাদাকালো চুলদাঁড়ি। এইসব নাটকগুলো আমাদের সময়ের মেকাপসর্বস্বতা, ভাঁড়ামো সংযোগের চরিত্র, দর্শনহীন সংলাপ, আর পয়সা কামানোর শিল্পছাড়া প্রযোজনার মুখের উপর সপাটে থাপ্পড় কষায়। বলে যায়, এইভাবে হয় না; এইভাবে শুধু ভেসে যেতে হয় জৈবসার হয়ে। আমি, এবং আমি জানি আরো কিছু মানুষ বলে, এটাই শেষ না। মাহমুদ দিদার এর সিনেমা আসবে। এখন বলো – আসিতেছে আসিতেছে।
একদিন ‘বিউটি সিনেমা’ সরকারি অনুদান পায়। নির্মাণে যায়। কিন্তু মাঝেমধ্যেই হোঁচট খায়, শ্যুটিং বন্ধ থাকে। ‘পয়সা একটা ফ্যাক্টর বটে’ – এইসব ভেবে বাজারিরা হাই তোলে। কিন্তু বিউটি সার্কাস আগায়, ধীরে কিন্তু নিশ্চিতভাবে। একটুও আপোষ না করে। দ্যাখো, এইটারে বলে, ডিরেক্টরস স্ট্রাগল! এইভাবে সিনেমা বানাতে হয়, এইভাবে সত্যিকারের সিনেমা হয়। এবং বিউটি সার্কাস টিজার দেখিয়েই জাত চিনিয়েছে, যে সিনেমা দেখে মানুষ ঘরে ফিরে পান চিবিয়ে ঘুমিয়ে যাবে এমন সিনেমা তো এটা না। ‘ম্যাস’ আর ‘ক্লাস’ – ‘আর্ট’ আর ‘বিজনেস’ – এইসব দ্বিমুখী দ্বন্দ ভাংবে এই সিনেমা।
‘বিউটি সার্কাস’ এর জন্য ভালোবাসা শুধু। শুভকামনা আসলে অতিশয়োক্তি হবে, কারণ এই সিনেমা এসেছে আদতে-সুরতে সত্যিকারের এক সিনেমা হয়। বাংলা সিনেমার একটা সত্যিকারের পথ তৈরি হবে হয়তো ‘বিউটি সার্কাস’ এর টিকিট বিক্রির দিন থেকেই। আমি নিজে তো এটা বিশ্বাস করিই, সিনেমা দেখা পরে অন্যদেরও বিশ্বাস হবে অবশ্যই। ব্যক্তিগত আবেগ ছাপিয়ে যাওয়ার পরেও, নিরপেক্ষ চোখে দেখে টিজার দেখে আবারও বলতে হয় – কেমন করে এইসব দৃশ্য আসবে সিনেমায়? কীভাবে এমন দৃশ্যের জন্ম হয়, কবি তো এমন প্রশ্ন কবেই রেখেছেন করে।
সুতরাং, ‘বিউটি সার্কাস’ আসছে। আমরা আমাদের চোখকে অজর রাখি, আমাদের মনে জমা রাখি এইসব প্রশ্ন, আর সিনেমা হলের টিকিট কাউন্টারে যেয়ে লাইনের দাঁড়ানোয় অপেক্ষায় থাকি। ‘বিউটি সার্কাস’ চলে এসেছে, এবারে শুধু বাংলা সিনেমার একটা মাস্টারপিসের নাম হয়ে ওঠাটার অপেক্ষায় থাকা। আর একইসাথে আমাদের বাংলাদেশের সিনেমাটাও আসছে, একদমই আমাদের দেশের সিনেমার ভাষাভঙ্গিতে। আমি-আমরা, তুমি-তোমরা, সে-তারা, আপনি-আপনারা দেখুন, এই সিনেমাকে একটা সত্যিকারের জায়গায় আনতে সহযাত্রী হোন। আগামী দিনের মায়েস্ত্রো, দ্য ডিরেক্টর, ভাই, সুহৃদ, পথ দেখানো একজন – মাহমুদ দিদার – আপনাকে অভিনন্দন
লেখক: শিক্ষক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।
 টিজার লিংক: https://bit.ly/2SFgOM5

Related Articles

Adblock Detected

Please consider supporting us by disabling your ad blocker