বিনোদনহোমপেজ স্লাইড ছবি

সুরের মায়ায় ভাসিয়েছেন যে তিন কালজয়ী সুরকার

মঞ্জুর দেওয়ান: দৈনন্দিন জীবনের খাদ্যের পাশাপাশি মনকেও ’খাওয়ানো’র প্রয়োজন পড়ে। আত্মার খোরাক জুগাতে আমরা বেছে নিই সঙ্গীতকে। সুরের মূর্ছনায় হারাতে চাই কিছু মুহূর্ত। যে সুর আমাদের যান্ত্রিকতা ঠেলে নিয়ে যায় এক অন্যরকম স্রোতে। যে স্রোতের বিপরীতে সাতার কাটতে চায়না কেউ। গা এলিয়ে দিয়ে ভাসতে পছন্দ করেন এই পৃথিবী নামক গ্রহের মানুষেরা। আর এই সুরের পিছনে থাকে এক নিবেদিত প্রাণ। একটি গান অনেকগুলো ধাপের মধ্য দিয়ে যায়। প্রথমে পংক্তিমালার কাজ। যা একজন গীতিকার করে থাকেন। গানের কথা লিখেই গীতিকারের কাজ শেষ হয়ে যায়।

নিষ্প্রাণ এক শরীরকে রেখে যান সুরকারের সুরের আশায়। গীত নামক একটি নিথর দেহকে প্রাণ দেন একজন সুরকার। গানের পংক্তি জীবিত করে তুলেন একজন সুরকার। কিন্তু প্রাণ দেয়া এই মানুষটিকে বেশিরভাগ মানুষই চিনেন না। সুকণ্ঠের অধিকারী কিংবা অধিকারীণির ছায়ায় আড়াল হয়ে যান। পংক্তিমালাকে যিনি প্রাণ দেন তাকে নিয়ে মাতামাতি করতে শ্রোতাদের যেন বয়েই গেছে! কিন্তু পর্দার এতো পিছনে কাজ করেও কিছু মানুষ পর্দার সামনে চলে আসে। মৌলিক সুর দিয়ে যারা আলাদা ধারা তৈরি করতে সক্ষম হয়, তাদেরকে পর্দার পিছনে রাখার সাধ্য কার! বাংলা গানকে বিশ্ব দরবারে আলোচনার বস্তু হিসেবে পরিচিত করেছেন তাদের জন্য শ্রদ্ধা আর ভালোবাসার কমতি ছিলোনা বাংলা গানের শ্রোতাদের। এমনই তিনজন কালজয়ী সুরকারের জীবনের গল্প জানবো এই আয়োজনে।

আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুল

গানের পাখি বুলবুলের সাথে মিলে যায় এই কালজয়ী সুরকারের নাম। প্রচণ্ড দেশপ্রেমিক এই মানুষটিকে চিনেন না এমন মানুষের খোঁজ পাওয়া সত্যিই ভার! অসংখ্য কালজয়ী গানের স্রষ্টা বীর মুক্তিযোদ্ধা এই সুরকার। জীবদ্দশায় যিনি কাজ করেছেন সাবিনা ইয়াসমিন, রুনা লায়লা, সৈয়দ আব্দুল হাদী, এন্ড্রু কিশোর, সামিনা চৌধুরী, খালিদ হাসান মিলু, আগুন, কনকচাঁপাসহ বহু জনপ্রিয় সংগীতশিল্পীদের নিয়ে।

ঢাকার আজিমপুরের ওয়েস্টটেন্ট হাইস্কুলের ছাত্র থাকাকালীন সময়ে মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেন। মাত্র ১৫ বছর বয়সে যুদ্ধে যোগ দেয়া বুলবুলের জীবন কাহিনী অনেকটা সিনেমার গল্পের মতো। পাক সেনাদের হাতে ধরা পড়েও যিনি বেঁচে ফিরেছিলেন। মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে যোগ দেন ঢাকার কিংবদন্তি ক্র্যাক প্লাটুনের সাথে। সফল অপারেশন চালিয়ে সুনাম কুড়ান কিংবদন্তি এই সুরকার।

সেই ১৯৭৮ সালে ‘মেঘ বিজলী বাদল’ দিয়ে সিনেমার জগতে পা রেখেছিলেন বুলবুল। এরপর মৃত্যুর আগ পর্যন্ত থেকেছেন সঙ্গীতের সাথে। সুর সাধনা থেকে সরে যাননি একচুলও! ১৯৮৪ সালে ’নয়নের আলো’ চলচ্চিত্রের সংগীতায়োজন করেন বুলবুল। এই সিনেমায় লেখা বুলবুলের গানগুলো ব্যাপক জনপ্রিয়তা পায়। ঘুরে বেড়ায় শ্রোতাদের মুখে মুখে। ‘আমার সারা দেহ খেয়ো গো মাটি’, ’আমার বুকের মধ্যখানে, আমি তোমার দুটি চোখের দুটি তারা হয়ে’, ’আমার বাবার মুখে’ গানগুলো তুমুল জনপ্রিয় হয়।

প্রায় চার দশকের ক্যারিয়ারে অসংখ্য জনপ্রিয় গান রচনার পাশাপাশি সুর দেন এই সুরকার। ’মরণের পরে’, ’আম্মাজান’, ’প্রেমের তাজমহল’, ’অন্ধ প্রেম’, ’রাঙ্গাবউ’, ’প্রাণের চেয়ে প্রিয়’, ’পড়ে না চোখের পলক’, ’তোমাকে চাই’, ’ভুলোনা আমায়’, ’জীবন ধারা’, ’সাথী তুমি কার’, ’অবুঝ দুটি মন’, ’মাতৃভূমি’, ’মাটির ঠিকানা’সহ দুইশো’র বেশি চলচ্চিত্রের সংগীত পরিচালনা করেন বুলবুল। ২০০১ সালে সেরা সঙ্গীত পরিচালকের পুরস্কার পান। ২০০৫ সালে ‘হাজার বছর ধরে’ চলচ্চিত্রের জন্য শ্রেষ্ঠ সঙ্গীত পরিচালকের জন্য জাতীয় পুরস্কার দেয়া হয় তাকে। ২০১০ সালে সঙ্গীত জগতে অনবদ্য অবদানের জন্য একুশে পদকে ভূষিত করা হয় আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুলকে।

আলাউদ্দিন আলী

বাংলাদেশের সঙ্গীত অঙ্গনে এখনো যাদের পদচারণা আছে তাদের মধ্যে আলাউদ্দিন আলী সবচেয়ে পরিচিত নাম। বাংলা গানের জগতে যার নাম স্বর্ণাক্ষরে লেখা হয়ে গেছে। চলচ্চিত্রে সঙ্গীত পরিচালনার পাশাপাশি ‍যিনি কাজ করেছেন বেতার ও টেলিভিশনে। অনেক চলচ্চিত্রের জন্য গানও লিখেছেন এই গুণী সুরকার।

পুরান ঢাকার নাজিমউদ্দিন লেনে জন্ম নেয়া আলাউদ্দীন আলীর শৈশব কেটেছে মতিঝিলের এজিবি কলোনীতে। ক্লাস থ্রি-তে পড়ার সময় ছোট চাচার দেয়া চায়নিজ বেহালা থেকে সুরের জগতে আসেন আলাউদ্দীন আলী। ছোটবেলাতেই বেহালা বাজানোর জন্য অল পাকিস্তান চিলড্রেনস প্রতিযোগিতায় পুরস্কার জিতেন তিনি। চাচার দেয়া বেহালা থেকে হাতেখড়ি নেয়া আলাউদ্দিন আলী তৎকালীন পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট আইয়ূব খানের থেকে শ্রেষ্ঠ বেহালাবাদকের পুরস্কার পান সুরের জাদুকর।

বেহালা বাজাতে বাজাতেই চলচ্চিত্রের সাথে জড়িয়ে যান আলাউদ্দীন। সিনেমার সাথে তার এতাটাই সম্পৃক্ততা হয় যে, আলাউদ্দিন আলীর সাথে কাজ না করা মানে সে কিছুই করেননি! যে কাজ করেনি তার সঙ্গীত জীবনই ব্যর্থ! বহু শ্রোতাপ্রিয় গানের স্রষ্টা আলাউদ্দীন আলী ১৯৭৫ সালে ’সন্ধিক্ষণ’ সিনেমা দিয়ে সঙ্গীত পরিচালক হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন। প্রথম চলচ্চিত্রে বলার মতো খ্যাতি না পেলেও সফলতা ধরা দেয় বছর দুই পরে। ১৯৭৭ সালে একসাথে দুটি ছবির সঙ্গীত পরিচালনার দায়িত্ব পান তিনি। যার মধ্যে একটি ছিলো ‘গোলাপী এখন ট্রেনে’। অন্যটি ছিলো ‘ফকির মজনু শাহ’। দুটি সিনেমার গানই ব্যাপক শ্রোতাপ্রিয় হয়। এবং আলাউদ্দীন আলীকে পরিচিতি এনে দেয় সঙ্গীতাঙ্গনে।

খান আতাউর রহমান

একাধারে চলচ্চিত্র অভিনেতা, সুরকার, গায়ক, চলচ্চিত্র নির্মাতা, সঙ্গীত পরিচালক, গীতিকার, প্রযোজক, সংলাপ রচয়িতা, কাহিনীকার ছিলেন ওখান আতাউর রহমান। একজন মানুষের এতোগুলো গুণ থাকা সত্যিই আশ্চর্যের! এ যেন, ’দূর্গার দশ হাত’! একসাথে এতোগুলো কাজ করার বিশেষ ক্ষমতা দিয়ে ঈশ্বর পাঠিয়েছিলেন ক্ষণজন্মা এই সুরস্রষ্টাকে।

ঢাকার অদূরে মানিকগঞ্জ জেলার সিঙ্গাইর উপজেলার রামকান্তপুর গ্রামে জন্মগ্রহন করেন খান আতাউর রহমান। ছোটবেলায় বাবা-মা আদর করে ’তারা’ নামে ডাকতেন খান আতাউরকে। বড় হয়েও সে নামের সুবিচার করেছেন তিনি। হয়েছেন শোবিজ জগতের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ।

লন্ডনে ফটোগ্রাফি নিয়ে পড়তে যাবার পেছনে মূল উদ্দেশ্য ছিলো সিনেমা। ১৯৪৯ সালে তাই আবার বাড়ি ছেড়ে পালাবার চেষ্টা! তবে এবারে সফল আতা! পাড়ি জমান ভারতের মুম্বাইয়ে। আনকোরা আতা অলিগলি ঘুরে জ্যোতি স্টুডিওর ক্যামেরাম্যান জাল ইরানির সাথে পরিচিত হন। জাল ইরানি তাকে শিক্ষানবিশ হিসেবে কাজ করার সুযোগ দিলেও থিতু হতে পারেননি আতা।

‘এ দেশ তোমার আমার চলচ্চিত্রে প্রথম সঙ্গীত পরিচালক হিসেবে কাজ করেন। ১৯৬২ সালে সূর্যস্নান ছবিতে ’পথে পথে দিলাম ছড়াইয়া রে’ গান উপহার দেন। কলিম শরাফী কণ্ঠ দেয়া গানটি ব্যাপক শ্রোতাপ্রিয় হয়। পরের বছরই জহির রায়হান পরিচালিত কাঁচের দেয়াল ছবিতে সঙ্গীত পরিচালনা করেন খান আতা। এই সিনেমায় ‘শ্যামল বরণ মেয়েটি শীর্ষক গানটি ব্যাপক জনপ্রিয় হয়। ১৯৬৫ সালে পাকিস্তান চলচ্চিত্র উৎসবে সূর্যস্নান ও কাঁচের দেয়াল ছবির জন্য শ্রেষ্ঠ সঙ্গীত পরিচালক হিসেবে পুরস্কার পান খান আতাউর রহমান। ’বাহানা’, ’সাগর’, ’আখেরি স্টেশান’, ’মালা’র মতো উর্দু ছবিতে সঙ্গীত পরিচালনা করেন তিনি। ১৯৭০ সালে জহির রায়হানের জীবর থেকে নেয়া ’এ খাঁচা ভাঙ্গবো আমি কেমন করে’ কালজয়ী গানটি লেখার পাশাপাশি কণ্ঠ দেন আতা। যে গানটি ৭০’র দশক দাপিয়ে বেড়িয়েছিলো।

সাবিনা ইয়াসমীনের গাওয়া ‘এ কি সোনার আলোয়’ এবং শাহনাজ রহমতুল্লাহর কণ্ঠে ’এক নদী রক্ত পেরিয়ে’র মতো গানের নেপথ্যে ছিলেন। ২২তম জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারে ’এখনো অনেক রাত’ ছবিতে সঙ্গীত পরিচালক ও শ্রেষ্ঠ গীতিকারের পুরস্কার জিতেন খান আতাউর রহমান। ১৯৯৭ সালে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত ৫০০ গানের জন্ম দিয়ে গেছেন বরেণ্য এই সঙ্গীত পরিচালক।

Related Articles

Adblock Detected

Please consider supporting us by disabling your ad blocker