বিনোদনহোমপেজ স্লাইড ছবি

বাঙালির অনুভূতির সকল শাখায় রবীন্দ্রনাথের গান

মৃন্ময়ী মোহনা: মানুষের মন বড় অদ্ভুত। তাই তার অনুভূতিও সীমাহীন। হাসি আনন্দ দুঃখ ছাড়াও মানুষের হাজারো অনুভূতি আছে যা কখনো মুখে বর্ণনা করে প্রকাশই করা যায় না। তবে একজন যেন তা প্রকাশ করে গেছেন সাহিত্যের পাতায় পাতায়। বলছিলাম বাঙালির প্রাণের পুরুষ রবীন্দ্রনাথের কথা। বাঙালির সকল অনুভূতিতে রবীন্দ্রনাথের সাহিত্যের রয়েছে বিস্তর প্রভাব। তার প্রেম, প্রকৃতি, পূজা -সকল স্তরের গানেই মিলেমিশে গেছে বাঙালির মনের গোপন অনুভূতি।

বুদ্ধদেব বসু তাঁর ‘কবি রবীন্দ্রনাথ’ বইয়ে রবীন্দ্রনাথকে ‘জন্ম-রোমান্টিক’ কবি বলে আখ্যায়িত করেছেন। কল্পনা বোধ,
সূক্ষ দৃষ্টি, গভীর দর্শন,  সৌন্দর্যবোধ এবং প্রকৃতির প্রতি বাঁধভাঙা আকর্ষণ রবীন্দ্র রচনার  প্রধান বৈশিষ্ট্য। তাঁর গানে ‘না পাওয়ার হাহাকারগুলো’ প্রকাশিত হয়েছে অন্তরের গভীরে পাওয়ার মধ্যে। কবির রচনায় শারীরিক উপস্থিতির চেয়ে আত্মিক উপস্থিতিই প্রধান হয়ে উঠেছে…
‘নয়ন সমুখে তুমি নাই…নয়নের মাঝখানে দিয়েছি যে ঠাঁই…’ অথবা, ‘নয়ন তোমারে পায় না দেখিতে রয়েছো নয়নে নয়নে…’ আবার ‘জাগরণে তারে না দেখিতে পাই,থাকি স্বপনের আশে/ঘুমের আড়ালে যদি ধরা দেয় বাঁধিব স্বপন পাশে…’ এ কথাগুলো তারই প্রমাণ।
রবীন্দ্রনাথ বলেছেন, ‘প্রেম যেখানে গভীর নত হওয়া সেখানে গৌরবের’- এই এক বাণী দিয়ে তিনি সমাধান করে দিয়েছেন প্রেম বিষয়ক নানা জটিলতা…
তাঁর ‘তুমি সুখ যদি নাহি পাও, যাও সুখের সন্ধানে যাও…’, অথবা, ‘লুকিয়ে ভালোবাসবো তারে জানতে দেবো না…’ প্রভৃতি গানও এক একটি মহার্ঘ। যা মনের না পাওয়ার কষ্টকে করেছে মহান।
স্মৃতিকাতরতা মানুষের সহজাত প্রবৃত্তি। মানুষ অতীতকে কখনো ভুলতে পারেনা। জীবন যত এগিয়েই যাক, আমরা পেছন ফিরে তাকাই ই…
‘পুরানো সেই দিনের কথা
ভুলবি কি রে হায় ও সে…
মোরা ভোরের বেলা ফুল তুলেছি দুলেছি দোলায়’
এ যেন আমাদের হৃদয় নিঙড়ানো অনুভূতিরই বহিঃপ্রকাশ।
আমাদের পাওয়া -না পাওয়া অথবা হতাশার অনুভূতি নিয়েও কাজ করেছেন রবীন্দ্রনাথ।
‘আমি বহু বাসনায় প্রাণপণে চাই
বঞ্চিত করে বাঁচালে মোরে
এ কৃপা কঠোর সঞ্চিত মন
জীবন ভরে…’
মানুষের রাগ, অভিমান সবকিছুই তিনি গানের ছন্দে তুলে ধরেছেন।
‘তারই লাগি যত ফেলেছি অশ্রুজল
বীণাবাদিনীর শতদল দলে করিছে সে টলমল…’
‘আমি হৃদয়ের কথা বলিতে ব্যাকুল শুধাইলো না কেহ…’
মনের গভীরে লুকানো অভিমানের অনুভূতি গুলো এভাবেই তিনি মূর্ত করে তুলেছেন কলমের আঁচড়ে।
আত্মবিশ্বাস, নির্ভীকতা, সাহসী মনোভাব তৈরি করতেও তাঁর গান মহৌষধ।
‘যদি তোর ডাক শুনে কেউ না আসে, তবে একলা চলো রে…’
এই গানের মর্মবাণী আমাদের হৃদয়ে জাগায় অন্যরকম শক্তি।
রবীন্দ্রনাথের গানে পূজা, স্রষ্টা, দৃষ্টে পূর্ণ বিশ্বাস স্থাপনের দিকটি এসেছে বারবার।
‘আমারে তুমি অশেষ করেছো এমন লীলা তব
ফুরায়ে ফেলে আবার ভরেছো জীবন নব নব’
অথবা, ‘মাঝে মাঝে তব দেখা পাই/চিরদিন কেন পাইনা…’
এ সবই যেন সৃষ্টিকর্তার সাথে আমাদের কথোপকথন।
রবীন্দ্রনাথ প্রকৃতি বন্দনাকে নিয়ে গেছেন এক অনন্য অবস্থানে। তাঁর রচনায় বর্ষা এসেছে বারবার। বাঙালির বর্ষাপ্রীতির সিংহভাগই রবীন্দ্রনাথের অবদান।
দেশপ্রেম, বিশ্বপ্রেম, মানবপ্রেম এমন বিচিত্র অনুভূতির সবই রবীন্দ্রনাথ দেখিয়ে গেছেন। আমাদের জাতীয় সঙ্গীত -‘আমার সোনার বাংলা, আমি তোমায় ভালবাসি…’ এত সুন্দর অনুভূতি পূর্ণ জাতীয় সঙ্গীত আর কোন দেশের আছে কিনা জানা নেই!
রবীন্দ্রনাথ শুধু কবি বা সাহিত্যিকই ছিলেন না! তিনি ছিলেন একজন দার্শনিক। এ কারনেই তাঁর প্রতিটি গানেই থাকে গভীর দর্শন আর জীবনবোধের স্পর্শ। যা আমাদের হৃদয় গভীরে প্রবেশ করে নিংড়ে আনে চেনা-অচেনা নানা অনুভূতি! তাই যতদিন বাঙালি থাকবে, বারবার তাকে ফিরে আসতে হবে রবীন্দ্রনাথের কাছে,তাঁর সৃষ্টির কাছে।

Related Articles

Adblock Detected

Please consider supporting us by disabling your ad blocker