বিনোদনহোমপেজ স্লাইড ছবি

একজন অভিনয়ের জাদুকর

মাহমুদুর রহমান: একজন অভিনেতার সবচেয়ে বড় গুণ কি? এ প্রশ্নের উত্তর নিয়ে নানা তর্ক, বিতর্ক হতে পারে। তবে একথা অনস্বীকার্য যে একজন অভিনেতার অন্যতম বড় গুণ হলো যে চরিত্রে তিনি অভিনয় করছেন, সে চরিত্রের সঙ্গে নিজেকে মিশিয়ে দেওয়া। বাংলাদেশের যে ক’জন অভিনেতার এই গুণটি ছিল, হুমায়ূন ফরিদী তাদের মাঝে অগ্রণী।

হুমায়ুন ফরিদী ১৯৫২ সালের ২৯ মে ঢাকার নারিন্দায় জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবার নাম এটিএম নূরুল ইসলাম ও মা বেগম ফরিদা ইসলাম। চার ভাই-বোনের মধ্যে তিনি দ্বিতীয়। তিনি ১৯৬৫ সালে পিতার চাকুরীর সুবাদে মাদারীপুরের ইউনাইটেড ইসলামিয়া সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ে ভর্তি হন। এ সময় মাদারীপুর থেকেই নাট্য জগতে প্রবেশ করে। তার নাট্যঙ্গনের গুরু বাশার মাহমুদ। তখন নাট্যকার বাশার মাহমুদের শিল্পী নাট্যগোষ্ঠী নামের একটি সংগঠনের সাথে যুক্ত হয়ে কল্যাণ মিত্রের ‘ত্রিরত্ন’ নাটকে ‘রত্ন’ রত্ন চরিত্রে অভিনয়ের মধ্য দিয় তিনি সর্বপ্রথম দর্শকদের সামনে অভিনয় করেন।

পরবর্তীতে জাহাঙ্গীর নগর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতিতে স্নাতক হুমায়ূন ফরিদী ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে সরাসরি অংশগ্রহণ করেন। অন্য অনেকের মতো মুক্তিযুদ্ধ তার মাঝেও প্রভাব ফেলেছিল। জাহাঙ্গীরনগরে পড়াশোনার সুবাদে নাট্যকার সেলিম আল দীনের সঙ্গে হুমায়ূন ফরিদী ঘনিষ্ঠ হন। ১৯৭৬ সালে জাহাঙ্গীরনগরে অনুষ্ঠিত নাট্য উৎসবের তিনি অন্যতম সংগঠক ছিলেন। এ সময়েই তিনি সকলের নজরে আসেন। পরবর্তীতে ঢাকা থিয়েটারে যোগ দেন তিনি। মঞ্চের পরে হুমায়ূন ফরিদী টেলিভিশন নাটকে অভিনয় করেন। সংশপ্তক নাটকে ‘কানকাটা রমজান’ চরিত্রে অভিনয় করে তিনি প্রভূত জনপ্রিয়তা অর্জন করেন।

নব্বই দশকে তিনি চলচ্চিত্র জগতে প্রবেশ করেন এবং সিনেমায় অভিনয়ের সূচনা হয়। কানকাটা রমজানের জনপ্রিয়তার কারনেই হোক কিংবা অন্য কোন কারনেই হোক, হুমায়ূন ফরিদীকে খল চরিত্রেই বেশি দেখা যেতো। নব্বই দশকে বড় হওয়া ছেলে মেয়েদের শৈশব কৈশোরে অন্যতম এক ভীতিকর চেহারা যে মানুষটির, তিনি হুমায়ূন ফরিদী। ফরিদী নাম তখন কয়জন জানতো? কেউ জানতো রমজান, কেউ জানতো অন্য কোন নামে। মজার ব্যপার হলো বাস্তব জীবনে মানুষটি ছিলেন একদম আলাদা। হুমায়ূন ফরিদী মজার মানুষ। রসিক, ভাবুক, বন্ধুসুলভ। সিনেমার খল চরিত্রের কুটিলতা, লালসা পূর্ণ, স্বার্থপরতা থেকে পুরোপুরি বিপরীত।

ক্রিকেটের দারুণ ভক্ত মানুষটি ২০০৩ সালের বিশ্বকাপের সময়ে ক্রিকেট নিয়ে একটি অনুষ্ঠান উপস্থাপনা করেন। বন্দুক হাতে যুদ্ধ করা হুমায়ূন ফরিদী পড়ুয়া এবং একটি দার্শনিক মনের অধিকারী ছিলেন। হুমায়ূন ফরিদীর অভিনয় জীবনের একটা বড় অংশ কেটেছে সিনেমায় খল চরিত্র করে। কিন্তু মনোযোগ দিয়ে দেখলে সেখানেও তার প্রতিভার দৃষ্টান্ত দেখা যাবে। প্রতিটি খল চরিত্র, তিনি ফুটিয়ে তুলেছেন দারুণ মুনশিয়ানায়। কখনও পৈশাচিক, কখনও নৃশংস, কখনও হাস্যকর পোষাকে উপস্থিত হয়ে চরিত্রটিকে পূর্ণতা দিয়েছেন। যারা মঞ্চে ফরিদীর অভিনয় দেখেছেন, তারা জানেন আসলে অভিনয়ে তার দক্ষতা কোন পর্যায়ের। কিন্তু গণ মানুষকে হুমায়ূন ফরিদী মুগ্ধ করেছেন টেলিভিশন নাটকেও। হুমায়ূন আহমেদের গল্পে, কিংবা পরিচালিত অনেক নাটকে অভিনয় করেছেন ফরিদী। কখনও গম্ভীর, কখনও কমিক চরিত্রে। ‘নিতু তোমাকে ভালোবাসি’ নাটকে কাজী সাহেবের কমিক উপস্থিতি যেমন আমাদের আনন্দ দেয়, তেমনি ‘কোথাও কেউ নেই’ নাটকে উকিলের চরিত্রে তার সিরিয়াস অভিনয় আমাদের মুগ্ধ করে এখনও।

স্ক্রিনে বেশি সময় হোক কিংবা কম, চরিত্র ছোট হোক বা বড়, প্রতিটি কাজে তার প্রতিভা, দক্ষতা আর নিষ্ঠা খুঁজে পাওয়া যায়। ব্যক্তিগত জীবনে বিয়ে করেছিলেন দুইবার। প্রথম স্ত্রীর সঙ্গে চার বছরের মাথায় বিচ্ছেদ। আরেক প্রতিভা সুবর্ণা মোস্তফার সঙ্গে ঘর করেছিলেন দুই যুগ। ২০০৮ সালে সে সংসার ভেঙে যাওয়ার পরপরই যেন ভেঙে গিয়েছিলেন ফরিদী নিজেও। ২০১২ সালে চলে গেলেন অন্য ভুবনে। ঠিক সেদিন বসন্ত এসেছিলো বাংলাদেশে। বসন্ত বুঝি বিদায় দিয়েছিলেন তাকে।

Related Articles

Adblock Detected

Please consider supporting us by disabling your ad blocker