বিনোদনহোমপেজ স্লাইড ছবি

কালজয়ী তিন বাংলা সিনেমা

সাবা তারান্নুম: বাংলা সিনেমার জয়যাত্রা গৌরব গাঁথায় পরিপূর্ণ। প্রায় সত্তর বছরের এই পথ পরিক্রমার সূচনা হয়েছিল আব্দুল জব্বার খানের নির্বাক চলচ্চিত্র ‘মুখ ও মুখোশ’ এর মুক্তির মধ্য দিয়ে। এরপর প্রতিবছর বাংলা সিনেমার ঝুলিতে জড়ো হয়েছে নতুন নতুন রত্ন। এই রত্নভাণ্ডার থেকে তুলে নেয়া এ যাবত কালের সেরা তিনটি বাংলা সিনেমা নিয়ে আজকের ফিচার।

জীবন থেকে নেয়া (১৯৭০)

জহির রায়হান এর  প্রযোজনা ও পরিচালনায় নির্মিত ‘জীবন থেকে নেয়া’ ছবিটিতে তৎকালীন অশান্ত বাংলার রাজনৈতিক পরিস্থিতির এক অসাধারন উপস্থাপনা করা হয়েছে।

মধ্যবিত্ত অতি সাধারণ এক পরিবারকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠে সিনেমার কাহিনী। একটি পরিবারের মধ্যে একনায়কতন্ত্র দেখানোর মধ্যে দিয়ে জহির রায়হান দেশের রূপক তুলে ধরেছিলেন। এখানে প্রেম ছিল, পরিবার, পারিবারিক আবহ, রাজনীতি কৌতুক সবকিছুর মিশেলে অসাধারণ এ সিনেমা।

রওশন জামিলের খল নায়িকার চরিত্র যেমন প্রশংসার দাবিদার তেমনি রোজী সামাদ, রাজ্জাক, সুচন্দা, খান আতাউর রহমান, রওশন জামিল, আনোয়ার হোসেন এর অভিনয়শৈলী মুগ্ধ করেছিলো বাঙালী দর্শকদের। এই ছবিতেই প্রথম ‘আমার সোনার বাঙলা’ গানটি চিত্রায়ন করা হয়েছিলো। পরবর্তীতে যা আমাদের জাতীয় সঙ্গীতের মর্যাদা পায়। আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙ্গানো গানটি জহির রায়হান সরাসরি একুশের প্রভাত ফেরি থেকে ধারণ করেছিলেন। এই ছবির সঙ্গীত পরিচালনায় ছিলেন আতাউর রহমান।

সিনেমাটির IMDB রেটিং ৯.৪। মুক্তিযুদ্ধ তখনও হয়নি, কিন্তু স্বাধিকারের কথা এই সিনেমায় ছিল। এবং এমন উপস্থাপনা বাংলা সিনেমার ইতিহাসে বিরল। ‘জীবন থেকে নেয়া’ জহির রায়হানের নির্মিত শেষ সিনেমা।

আগুনের পরশমণি(১৯৯৪)

নন্দিত কথাসাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদ পরিচালিত এবং স্বরচিত উপন্যাস থেকে নির্মিত প্রথম পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র “আগুনের পরশমণি”। ১৯৭১ সালের অবরুদ্ধ ঢাকার মানুষ যখন তীব্র ভয়ে হতাশ তখন মুক্তি বাহিনীর এক ঘায়েল যোদ্ধাকে আশ্রয় দেয় এক নিরীহ পরিবার। এই ঘটনাকে ঘিরে গড়ে ওঠে সিনেমার গল্প।  শ্রেষ্ঠাংশে ছিলেন আসাদুজ্জামান নূর, বিপাশা হায়াত, আবুল হায়াত, ডলি জহুর, দিলারা জামান, শিলা আহমেদ। মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠন ‘স্ক্র্যক প্লাটুন’ এর একটি সত্য ঘটনা অবলম্বনে ছবিটি তৈরী করা হয়েছে। সরকারের অর্থ সহায়তায় নির্মিত ছবি ‘আগুনের পরশমণি’ শ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্রসহ আটটি বিভাগে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার অর্জন করে।

হুমায়ূন আহমেদের এমন সাবলীল উপস্থাপনার সিনেমা আমাদের দর্শকেরা সর্বদাই লুফে নিয়েছে। এমনকি এর রেটিং ৯.১ । এবং রোটেন টম্যাটো ওয়েবসাইটটিতে ৯৬% মানুষএই সিনেমাটি দেখার ইচ্ছা প্রকাশ করেছে।

আয়নাবাজি (২০১৬)

থ্রিলার ও সাসপেন্সধর্মী সিনেমা আয়নাবাজি। অমিতাভ রেজা নির্মিত ‘শরাফত করিম আয়না’ চরিত্রকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠে সিনেমার গল্প। আয়না এমন এক মানুষ যে অন্যের হয়ে জেল খাটে। কিন্তু কেন সে এমন করে? এর পেছনে কাজ করছে আরও কত কিছু। সেসব শেকড় বাকর নিয়ে এমন থ্রিলারধর্মী ছবি বাংলা সিনেমার পর্দায় এই প্রথম দেখতে পায় বাংলাদেশের দর্শকেরা। ছবির কাহিনী ও চিত্রনাট্য লিখেছেন গাউসুল আলম শাওন ও অনম বিশ্বাস।মূল চরিত্রগুলোতে অভিনয় করছেন চঞ্চল চৌধুরী, মাসুমা রহমান নাবিলা এবং পার্থ বড়ুয়া।

২০১৬ সালের ১৭ মে কান চলচ্চিত্র উৎসবের মার্শে দ্যু ফিল্ম বিভাগে প্রদর্শিত হয়। এমনকি আলোচিত, ব্যতিক্রমধর্মী ও আন্তর্জাতিক মানের এই ছবিটির প্রিমিয়ার শো মধ্যপ্রাচ্যের কাতারেও অনুষ্টিত হয়।

১৯তম মেরিল-প্রথম আলো পুরস্কারে ছবিটি শ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্রসহ তিনটি বিভাগে পুরস্কার লাভ করে। এছাড়ও সিয়াটল সাউথ এশিয়ান ফিল্ম ফেস্টিভালে শ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্র এবং ১৬তম টেলি সিনে পুরস্কারে সেরা ছবির সম্মান লাভ করে।

সিনেমার মত নির্মল বিনোদনধর্মী মাধ্যম পাওয়া দুষ্কর। আর তা যদি হয় দেশী সিনেমা তাহলে দর্শকের মন কাড়বেই। চড়াই উতড়াইয়ের এক লম্বা পথ পাড়ি দিয়ে ধীরে ধীরে আলোর মুখ দেখছে আমাদের দেশের সিনেমা। বাংলা সিনেমার সেই সোনালি দিন ফিরে আসুক এমনটাই প্রত্যাশা।

Related Articles

Adblock Detected

Please consider supporting us by disabling your ad blocker