বিনোদন

‘এই শহরে’র ‘আমাদের সমাজবিজ্ঞান’ এ আমরা ‘কিংকর্তব্যবিমূঢ়’!

ঈদের সেরা তিন ফিকশন

ফিকশনঃ এই শহরে

সাইদুর বিপুঃ আমাদের এই শহরে কি সবাই ভালোভাবে জীবন যাপন করে? নাহ করে না। আমাদের চারপাশে অনেক মানুষই আছে যাদের রুজি রোজগার নির্ভর করে অপরাধের উপর। যাদের বেঁচে থাকা নির্ভর করে সমাজের অপরাধ সংগঠিত হওয়ার মধ্য দিয়ে। পরিচালক আশফাক নিপুন এবারের ঈদের ফিকশনের জন্য বেছে নিয়েছেন তেমনি একটি অপরাধী পরিবারের গল্প। নাম দিয়েছেন ‘এই শহরে’।

নামের মতোই এই শহর আর তার নিষ্ঠুরতার গল্প বলে গেছেন পুরোটা জুড়ে। পরিচালকের সাম্প্রতিক কিছু কাজের মাধ্যমে সমাজের সমসাময়িকতার অস্থিরতার বিষয়গুলো উঠে এনেছেন বরাবরই। তবে সেই গল্প কে ফুটিয়ে তোলার জন্য বেছে নিয়েছেন কান্না সম্রাজ্ঞী বলে পরিচিত মেহজাবিন চৌধুরী আর টাইপড হয়ে যাওয়া অভিনেতা আফরান নিশো কে। কিন্তু লোহা যখনই কোন কামারের হাতে পড়েছে তখনই কোন না কোন ভালো কিছু হয়েই বের হয়েছে। এবারো তারই প্রতিফলন হয়েছে। একটা দৃশ্যের কথা বলি, বাচ্চা ছেলেটা দরজার সামনে পড়ে আছে আর কাঁদছে আর মেহজাবিন গেটের বাইরে দাঁড়িয়ে গেটের মধ্যে আলতো করে বাচ্চার কান্নার থামানোর মতো করে যাচ্ছেন অবিরত। এতোদূর থেকে মায়ের যে আকুতি, মায়া আর বাচ্চার জন্য ভালোবাসা ফুটে তুলেছেন তা প্রশংসার দাবিদার। আফরান নিশোর চেয়ে তিনি অভিনয়ে অনেক খানি এগিয়ে আছেন অন্তত এই ফিকশনে। তবে নিশোর একটা ডায়লগ দিয়ে শেষ করি এই শহরের নিষ্ঠুরতার গল্প…

-থানায় নিয়া কি করবেন স্যার?
-বিচার?
-ডাহেন না দশজন, এহেনেই মাইরা ফেলাক
-আমি তো চোর, এইডাই আমার বিচার…!

ফিকশনঃ আমাদের সমাজবিজ্ঞান

কখনো কখনো পর্দায় নিজেকে দেখতে ইচ্ছে করে। নিজের গল্পগুলো কেউ হয়তো পর্দায় তুলে ধরবে, দেখে মনে হবে ‘আরেহ, এতো আমারই গল্প’। এমন পুরোটা না হলেও মাঝে মাঝে একটু আধটু নিজের ছায়াকে কিছুক্ষনের জন্য হলেও দেখা যায় ফিকশনাল কাজ গুলোতে। কেমন হতো যদি আপনার পুরো জীবনের প্রতিচ্ছবিই কোন নাটকে তুলে ধরা হয়?

তেমনি আপনারই গল্প নিয়ে এবারের ঈদের ফিকশন ‘আমাদের সমাজ বিজ্ঞান’, বানিয়েছেন পরিচালক শাফায়েত মনসুর রানা।

ছোটবেলায় যখন ক্লাসের শিক্ষক জিজ্ঞেস করতো ‘তোমার জীবনের লক্ষ্য কি?’। এই প্রশ্নের উত্তরে বিনা দ্বিধায় বলা হতো ডাক্তার কিংবা ইঞ্জিনিয়ার। ব্যাপারটা এমন যেনো এই সমাজে ডাক্তার আর ইঞ্জিনিয়ার ছাড়া আর কো পেশা নাই। আর কোন কিছু নাই যা করলে সমাজ আপনাকে সাদরে গ্রহন করবে। সময়ের পরিক্রমায় সেটা এখন হয়ে দাঁড়িয়েছে ‘বিসিএস ক্যাডার’। যেনো জীবনের ফুল স্টপ এখন বিসিএস ক্যাডার। বিসিএস হলে আপনি সমাজে মানুষ হিসেবে গণ্য হবেন অন্যথায় হবেন না।

কতগুলো মানুষ মিলে সমাজ হয়। তারপর আসে সমাজে থাকার জন্য কিছু নিয়মকানুন যা মানুষকে সামাজিক হতে সাহায্য করে। কিন্তু সমাজ যদি এমন হয় যেখানে ঘুম ভাঙলেই কোন না কোন খারাপ সংবাদ পাওয়া যায়। যে সমাজে তিন মাসের বাচ্চা থেকে শুরু করে সত্তর ঊর্ধ মহিলা ধর্ষণের শিকার হয়, রাস্তায় বের হলে সুস্থভাবে ঘরে ফেরার নিশ্চয়তা নেই, জান মালের নিরাপত্তা নেই, প্রত্যেকটা ইস্যুই রাজনিতিক ভাবে দেখার প্রয়াস, যোগ্যতার মাপকাঠি বিসিএস, সেতু বানাতে মাথা লাগে, হুজুগে মানুষ মেরে ফেলা যে সমাজে এখন ডাল ভাত এর মতো সহজলভ্য। এমন ঘুনেধরা সমাজে একটা ছেলে বা মেয়ের বেঁচে থাকার গল্পের মধ্য দিয়ে পরিচালক অনেকগুলো প্রশ্ন দিয়ে গেলেন এই সমাজের প্রতি। যদিও আমরা ভালো করেই জানি সেসবের কোন সঠিক উত্তর কারো কাছে নেই!!

ফিকশনঃ কিংকর্তব্যবিমূঢ়

‘এতো জোরে কেউ হাত তালি দেয়? হাত লাল হয়ে গেছে না’। বলেই হাত মালিশ করতে করতেই কথাটা একজন ভালোবাসার মানুষ আরেকজন ভালোবাসার মানুষ কে বলল। ভালোবাসা বোঝাতে এর চেয়ে আর কি কিছু দেখাতে হয়। যত ন্যাকামোই দেখানো হয় না কেন এভাবে ভালোবাসার উপস্থাপন সত্যি মনের মধ্যে ভালোলাগা তৈরি করে। আর এই ভালোলাগা তৈরি করেছেন অনেকদিন আড়ালে থাকা, ছবিয়ালের অন্যতম সেরা পরিচালক ইফতেখার আহমেদ ফাহমি তার এই ঈদের ফিকশন ‘কিংকর্তব্যবিমূঢ়’ দিয়ে।

‘কিংকর্তব্যবিমূড়’ শুধুমাত্র এই ভালোবাসারই গল্প না। এ গল্প যাদুর গল্প, পরিবারের গল্প, মায়ের গল্প, সমাজের গল্প। এ গল্পে দেখানো হয় ছোট যাদুকর চঞ্চল চৌধুরী হঠাৎ করেই তার যাদুর বাক্সে একটি বাচ্চা মেয়েকে আবিষ্কার করে। আশেপাশের সবাই তার এই হঠাৎ যাদুর প্রশংসা শুরু করে দেয়। শুরুতে তা একধনের ভালোলাগা তৈরি হলেও আস্তে আস্তে এই মিথ্যেটা সহজ সরল চঞ্চলের মনে আশান্তি দানা বাঁধতে শুরু করে দেয়। এবং অবাক হবেন সেই অশান্তি আপনার ভেতরেও কাজ করা শুরু করছে। শুরুর দিকের প্রশান্তি গুলো কোথায় যেন হারিয়ে গিয়ে, দৃশ্য আর মিউজিকের কল্যাণে মনের কোনে অশান্তি ভর করছে।

কেন তাকে সেরা বলা হয়, কিংবা এখনো ফাহমি ফুরিয়ে যাননি তারই প্রমাণ এই ফিকশন। ছোট্ট একটা দৃশ্যের কথা বলি, মানুষ যখন খুব কষ্টে বা দুখে থাকে তখন তার নিজেকে সাবার থেকেই সবচেয়ে ছোট মনে হয়। ফিকশনের একটা দৃশ্যে চঞ্চল যখন বাচ্চাটা কে নিয়ে ঘর থেকে বের হচ্ছিলো তখন তিশার উপর ক্যামেরার ফোকাস করা হয়েছিলো একদম উপর থেকে। চিত্রগ্রহণটা এমন ছিলো যেনো তিশা কে আশেপাশের টিনের চাল, ঘর বা মেঝে থেকে খুব ছোট লাগছিলো। এখানেই বুঝি পরিচালকের সার্থকতা বলা যেতো কিন্তু শেষের ৫ মিনিট তিনি তুলে রেখেছেন অন্য এক টুইস্ট দেয়ার জন্য। যা আপনি ঘুনাক্ষরেও টের পাবেন না কি হতে যাচ্ছে শেষে!।

এবারের ঈদে শুরু থেকেই সবাই কন্টেন্টের উপর ফিকশন নির্মাণ করার কথা বলে গেছেন। এরপরেও বেশীরভাগই কোয়ালিটির চেয়ে কোয়ান্টিটিতে বিশ্বাসী ছিলেন। যার দরুন তাদের ফিকশন গুলো কে সেরা তিনের কাতারে রাখা গেলো না। পুরোনো প্রবাদ সব সময় সত্যি হয় ‘কোয়ান্টিটির চেয়ে কোয়ালিটি সব সময় ভালো’। তবে সব শেষে এই তিন নির্মাতাদের কাছে অনুরোধ থাকবে ‘তাদের কোয়ালিটি কাজের কোয়ান্টিটি যেনো আরেকটু বাড়ানো হোক’। তাতে অন্তত আমাদের দর্শকের জন্য ভালো হয়।

 

Related Articles

Adblock Detected

Please consider supporting us by disabling your ad blocker