বিনোদনহোমপেজ স্লাইড ছবি

‘মাসুদ রানা’ সিনেমায় আমাদের প্রত্যাশা

রাজেশ পাল: মাসুদ রানা নিয়ে আলোচনা সমালোচনায় মুখর অনলাইন, অফলাইন। হঠাৎই মাসুদ রানা নিয়ে এই উন্মাদনা তৈরীর কারণ হলো মাসুদ রানাকে নিয়ে ৫০ কোটি টাকা বাজেটের চলচ্চিত্র তৈরী করার ঘোষণা দিয়েছে একটি প্রযোজনা সংস্থা। শুরু হয়েছে নতুন মুখের সন্ধান। যে সন্ধান প্রক্রিয়ার বিচারকদের ঔদ্ধতপূর্ণ আচরণ ইতিমধ্যেই জন্ম দিয়েছে ব্যাপক সমালোচনার। দেশজুড়ে চায়ের কাপে নিত্য ঝড় তুলে চলেছে “মাসুদ রানা” নামটি। অথচ রানাকে নিয়ে এদেশে সুপারহিট চলচ্চিত্র নির্মিত হয়েছিলো সত্তরের দশকেই। এদেশের চলচ্চিত্রের প্রথম “একশান হিরো” খেতাব পাওয়া নায়ক “মাসুদ পারভেজ সোহেল রানা” সেসময় রানা চরিত্রে অনবদ্য অভিনয় করে তাক লাগিয়ে দিয়েছিলেন সবাইকে।

একথা অনেকেই জানেন যে, মাসুদ রানা চরিত্রটি কাজী আনোয়ার হোসেন সৃষ্টি করেছিলেন আয়ান ফ্লেমিং এর পৃথিবী বিখ্যাত চরিত্র “জেমস বন্ড” অবলম্বনে। জেমস বন্ডের কাহিনীগুলো মৌলিক কাহিনী হলেও মাসুদ রানার প্রত্যেকটি কাহিনীই হলো “বিদেশী গল্পের ছায়াবলম্বনে” লেখা। জেমস বন্ডের “mi6” রানার ক্ষেত্রে হয়ে গিয়েছিলো “বাংলাদেশ কাউন্টার ইন্টেলিজেন্স ” (৭১ পূর্ববর্তী গল্পগুলোতে ছিলো “পাকিস্তান কাউন্টার ইন্টেলিজেন্স ” , দুজনের প্রিয় অস্ত্রই ছিলো “ওয়ালথার পিপিকে”, জেমস বন্ড এর মতোই রানাও এক তাগড়া জোয়ান যুবক, দুজনই দেশপ্রেমে উদ্ধুদ্ধ সাহসী সেনা গোয়েন্দা কর্মকর্তা, দুজনই ওয়াইন  উইমেন এবং সিগারেটের ব্যাপারে ব্যাড বয় ক্যারেক্টার, কিন্তু জেমসের চেয়ে রানাই বেশী প্রিয় ছিলো আমার। আমাদের প্রজন্মের শৈশব মাতিয়ে রেখেছিলো যেমন ফ্যান্টম, ম্যানড্রেক, টিনটিন, চাচা চৌধুরী বা হাদাভোদা, নন্টেফন্টের মতো কমিক ক্যারেক্টাররা, কৈশোর তেমনি মাতিয়ে তুলেছিলো তিন গোয়েন্দা আর মাসুদ রানা।

জেমস বন্ডের চেয়ে মাসুদ রানা বেশী প্রিয় হওয়ার অন্যতম দুটি কারণ ছিলো, রানার মাঝে খুঁজে পেতাম চিরচেনা স্বদেশী এক সাহসী তরুণের মুখ, যেটা জেমস বন্ডের মাঝে ছিলোনা। আর একটি কারণ হলো, জেমসের সাথে পরিচয় ঘটেছিলো আমার Dr. No ছবির মাধ্যমে,মাসুদ রানার সাথে পরিচিত হওয়ার অনেক অনেক পরে। প্রথম প্রেমের স্মৃতির মতোই কিশোর মনের গহীনে যে দাগ কেটে গিয়েছিলো মাসুদ রানা চরিত্রটি, একটু ম্যাচুউরড হওয়ার পরে আগত জেমস বন্ড পারেনি সেই দাগ মুছে নিজের স্থান গড়ে নিতে। যদিও জেমস বন্ড ই হচ্ছে কায়া, রানা তার ছায়ামাত্র। আমরা যা হতে চেয়েছিলাম অনেকেই, কিন্তু হতে পারিনি, সেই অতৃপ্ত স্বপ্নের বাস্তব রূপায়নের মাধ্যমেই স্বপ্নের নায়ক হয়ে উঠেছিলো “মাসুদ রানা” চরিত্রটি। আমাদের আগের প্রজন্মের কাছে যেমন অতি আপন ছিলো দস্যু বনহুর, গুপ্তচর বাকার, কুয়াশা বা বায়োনিকম্যান মেহেদী চরিত্রগুলো।

আমি প্রথমত চলচ্চিত্র নির্মাতা প্রতিষ্ঠানটিকে ধন্যবাদ জানাই, আমাদের কৈশোরের নায়ক রানাকে নিয়ে এরকম বিগবাজেটের একটি চলচ্চিত্র নির্মাণের উদ্যোগ নেয়ায়। এখনকার নবীন প্রজন্ম, যেটিকে “হেইট পলিটিক্স ” বা “লাব্যিউ জেনারেশন ” বলে উপহাস করেন অনেক বন্ধুরাই, এদের সিংহভাগের ফেসবুক, ইউটিউবের প্রতি যে পরিমাণ আগ্রহ , বইয়ের প্রতি তেমনটা নেই। এরা সালমান মুক্তাদির, সুলেমান সুখন, রাবার খানদের যতটা চেনেন, মাসুদ রানা, ফেলুদা , ব্যোমকেশ বক্সীরা তাদের কাছে ঠিক ততটাই অপরিচিত non academic পড়াশোনায় অনাগ্রহের ফলে। কিন্তু চলচ্চিত্রের প্রতি এখনো অনেকটাই আগ্রহী তারা। রানাকে নিয়ে তৈরী চলচ্চিত্র তাদের কাছে পরিচিত করে তুলবে আমাদের স্বপ্নের নায়ককে। তাদেরকে জানিয়ে দেবে যে , মাসুদ রানা কোনো চিরাচরিত একশান মুভির হিরো নন, রানা হলো একটি প্রজন্মের স্বপ্নপুষের প্রতিচ্ছবি।

আর সেইসাথে এও প্রত্যাশা করি রানা চরিত্রটি যেন কোনোভাবেই “সিনেমার প্রয়োজনে ” বড়ধরণের ওলটপালট করা না হয়। আমরা যে Bad boy ইমেজের বেপরোয়া দুঃসাহসী যুবক মাসুদ রানাকে চিনি, যে রানা চরিত্রটিই হলো “Death for dinner, sex for breakfast ” , যার জীবনের একমাত্র লক্ষ্যই হলো, “Country above all” , যে বিশ্বাস করে . “Death before dishonour” এ , সেটিকে যেন বাংলা সিনেমার প্রথাগত Good boy, “প্রেমের নাম বেদনা ” গাওয়া আর “মা আমি পরীক্ষায় ফার্স্ট ক্লাস ফার্স্ট হয়েছি” মার্কা অতি আবেগী ডায়ালগ ঝাড়া, পিপড়ে কামড়ানো পথচারীর মতো তিড়িংবিড়িং লম্ফঝম্ফ নাচে কোমড় দোলানো, পিস্তল দিয়ে মেশিনগানের গুলি ছোঁড়া বা ১০০ গুলি লাগার পরেও খালি হাতে ভিলেনের পুরো গ্যাং পিটিয়ে পরপারে পাঠানো নায়ক হিসেবে পর্দায় হাজির করা না হয়।

মাসুদ রানাকে “মাসুদ রানা” হিসেবেই দেখতে চাই আমরা , “আলেকজান্ডার বো” যেন পর্দায় হাজির না হয়, সেই প্রত্যাশাই আমাদের।

 

Related Articles

Adblock Detected

Please consider supporting us by disabling your ad blocker