বিনোদনহোমপেজ স্লাইড ছবি

অন্ধকার জগতের গল্প ‘নারকোস’

চৌধুরী সোহেল শাহরিয়ার: ৯০ দশকের গোড়ার দিককার কথা। আমরা তখন সবেমাত্র কলেজ জীবনে পদার্পন করেছি। আজকের মতো তখন মোবাইল, ইন্টারনেট বা স্যাটেলাইট টিভির মতো অবাধ তথ্য প্রযুক্তির যুগ ছিলো না। বিটিভির খবর, রেডিওতে বিবিসি বা ভযেস অব আমেরিকা এবং পত্র পত্রিকায় ছিলো আমাদের খবর জানার একমাত্র ভরসা। তো সেই সময় আমরা সূদুর কলম্বিয়ায় একজন গরীবের রবিনহুডের খবর পাই। যার বিরুদ্ধে সিনিয়র বুশের শাসনামালের মার্কিন প্রশাসন ভীষনভাবে ক্ষ্যাপা। তারা তাকে সাইজ করতে নানান ফন্দি ফিকির করছে। লোকটার বিরুদ্ধে অভিযোগ সে বড় মাপের মাদক সম্রাট। যার কারনে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সহ সারা দুনিয়ার যুব সমাজ ধ্বংসের পথে ইত্যাদি ইত্যাদি। কিন্তু আমাদের আলোচনায় এসকোবার একজন বীর হিসেবেই আলোচিত হতো। কারন আমরা শুনেছিলাম সে তার আয়কৃত উপার্জনের অনেকটাই গরীব-দুঃখীদের বিলিয়ে দিতো। তার নিজস্ব জেলখানা রয়েছে যেখানে সে স্বেচ্ছায় বন্দী ছিলো।

সবচেয়ে বড় কথা আমেরিকা যার পেছনে লাগে সে নিশ্চয়ই খারাপ মানুষ হতে পারে না। কারন আমেরিকা নিজের সিনিয়র বুশের নের্তৃত্বে নিজেদের স্বার্থে তখন কিউবা, পানামা, ইরাক সহ বিভিন্ন দেশে সাম্রাজ্যবাদী এ্যাকশানে নেমেছিলো। যাই হোক পাবলো এসকোবার নামক সূদুর কলম্বিয়ার এক রবিনহুড হিরো বিষয়ক আমাদের আচ্ছন্নতা প্রথম কাটে ৯০’র বিশ্বকাপ ফুটবলের সময়। ইতালিতে অনুষ্ঠিত ওই বিশ্বকাপটা নানান কারনেই আলোচিত হয়েছিলো। এরমধ্যে অন্যতম ঘটনা ছিলো কলম্বিয়া ফুটবল দলের ফুটবলার এসকোবারের (হায়! তার নামটাও একই ছিলো!!) মাদক সিন্ডিকেটের হাতে খুন হওয়া।

সম্ভবত ওই বিশ্বকাপের দ্বিতীয় রাউন্ডে কলম্বিয়া হেরে টুর্নামেন্ট থেকে বিদায় নেয় আফ্রিকার ক্যামেরুনের কাছে। আর সেই ম্যাচটায় কলম্বিয়ার ডিফেন্ডার এসকোবারের আত্মঘাতী গোলে তার দল হেরে যায়। দলটি দেশে ফিরলে অজ্ঞাত আততায়ীর গুলিতে মারা যায় ফুটবলার এসকোবার। আর এই ঘটনায় সন্দেহের তীর ঘুরে যায় কলম্বিয়ার অবিসংবাদিত মাদক সম্রাট পাবলো এসকোবার নিয়ন্ত্রিত মাদক সিন্ডিকেটের দিকে।

আমরা ধীরে ধীরে আরও জানতে পারি এই কুখ্যাত মানুষটার হাতে নিহত হাজার হাজার নাগরিকের কথা। প্রেসিডেন্ট ক্যান্ডিডেট, বিচারক, পুলিশ, সাংবাদিক, উকিল থেকে শুরু করে তার হিট লিষ্ট থেকে বাদ পড়েনি রাস্তার সাধারণ পথচারী পর্যন্ত। যেইই পাবলোর মাদক ব্যবসা বা স্বার্থ সংশ্লিষ্টতায় বাধা হয়েছে তাকেই অবলীলায় পৃথিবীর বুক থেকে সরিয়ে দিয়েছে তার অধীনস্ত সন্ত্রাসীরা। তো এহেন পাবলো এসকোবারকে নিয়ে তৈরী নারকোস দেখতে আমি বেশ আগ্রহীই ছিলাম। এবং সৎভাবে স্বীকার করতে বাধ্য হচ্ছি এই সিরিজটা আমাকে রীতিমত চমকে দিতে বাধ্য করেছে।

পাবলো এস্কোবার, কোকেইন, কলম্বিয়া- এই বিষয়গুলোর সমন্বয়ে তৈরী নেটফ্লিক্সের অসাধারণ সিরিজ “নারকোস”। বিশেষ করে এর প্রথম দুই মৌসুম। কারন এই সিরিজের প্রথম দুইটা সিজন মূলত কলম্বিয়ান ড্রাগলর্ড এবং নারোটেররিস্ট পাবলো এস্কোবারের উত্থান-পতন ও তাকে ধরার জন্য আমেরিকান ও কলম্বিয়ান অথরিটির ধুন্ধুমার কান্ড-কারখানাকে ঘিরে আবর্তিত হয়েছে। অসাধারণ অভিনয় করেছেন পাবলো চরিত্রের ব্রাজিলিয়ান অভিনেতা ভেগনার মাউরা। সিরিজটার সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো কোনরকম ওভারল্যাপড না করেও পাবলোর দ্বৈত চরিত্রকে সুনিপুণভাবে তুলে ধরা। একদিকে তার খুনে মানসিকতা, রাজ্যের সব শয়তানী ও নৃশংস কাজ কারবারে দর্শক যেমন তাকে ঘৃণা করছে আবার পরিবারের প্রতি আবেগ, সাধারণ মানুষের কাছে জনপ্রিয়তা এসব দেখে দর্শকরা চরিত্রটার মোহেও পড়ে যাচ্ছে সমানভাবে।


এতক্ষণে কেউ যদি ভেবে থাকে সিরিজটা একতরফা এসকোবার নির্ভর তাহলে সে নিতান্তই ভুল করে থাকবে। কেননা এই সিরিজটিতে সমান গুরুত্বে তুলে ধরা হয়েছে পাবলোকে ধরার জন্য দৃঢ়প্রতিজ্ঞ আইনের লোকদের তৎপরতাকেও। প্রিয়জনদের নিরাপত্তা ঝুঁকিতে ফেলে স্টিভ মারফি আর হেভিয়ের পিনার মত নিবেদিত প্রাণ আইনের সেবকরা কিভাবে দিনের পর দিন ধৈর্যের শেষ বিন্দু দিয়ে লড়েছে পাবলোকে ধরতে তেমনি নিজের মা, স্ত্রী আর সন্তানদের নিরাপদে দেশের বাইরে পাঠানোর জন্য পাবলো কি ভয়ংকর হয়ে উঠতে পারে সেটাও এই সিরিজে যুগপৎ উঠে এসেছে।

স্টিফেন মরফির চরিত্রে অভিনয় করা বয়ড হলব্রুকের নেপথ্য ধারা বিবরণী আপনাকে মুগ্ধ করতে বাধ্য। বিজিএম, সূচনা ও বিভিন্ন দৃশ্যে ব্যবহৃত সঙ্গীত আপনাকে দিবে ল্যাটিন মিউজিকের দূর্দান্ত ফ্লেভার! সিরিজটার আরেকটা বড় বৈশিষ্ট্য হলো সময়ে সময়ে বাস্তব ঘটনার ভিডিও ক্লিপিংস জুড়ে দেওয়া। যা আপনাকে বুঝিয়ে দেব যা দেখছেন তা মোটেও বানোয়াট নয়। এসবই ঘটেছিলো এসকোবারের নীল দংশনের সময়টাতে। চমৎকার সমন্বিত স্ক্রীনপ্লে। কোথাও ছন্দপতনের বিন্দুমাত্র সুযোগ নেই। আর অভিনেতা-অভিনেত্রীদের অনবদ্য অভিনয়তো রয়েছেই।

Related Articles

Adblock Detected

Please consider supporting us by disabling your ad blocker