বিনোদন

জর্জ হ্যারিসন : যে সঙ্গীতশিল্পী বাংলাদেশের অকৃত্রিম বন্ধু ছিলেন

সাবা তারান্নুম: বিংশ শতাব্দীর সাড়া জাগানো ব্যান্ড বিটলসের একজন প্রতিভাবান জনপ্রিয় গায়ক জর্জ হ্যারিসন। ব্রিটিশ এই পপ আইকন যে শুধু তার শিল্পীগুণেই পরিচিত তা নয়, বরং মানবতার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত জর্জ হ্যারিসন। বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইতিহাসে জর্জ হ্যারিসনের নাম না নিলেই নয়। ১৯৭১সালের ১লা আগস্ট বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে নিপিড়ীত বাঙ্গালীদের সাহায্যের জন্য আন্তর্জাতিক সচেতনতা ও তহবিল গঠন উদ্দেশ্যে নিউইয়র্কের ম্যাডিসন স্কয়ার গার্ডেনে অনুষ্ঠিত “দ্যা কনসার্ট ফর বাংলাদেশ”-এর প্রধান সংগঠক ছিলেন হ্যারিসন।

জর্জ হ্যারিসন একাধারে গিটারিস্ট, সঙ্গীত পরিচালক, রেকর্ড পরিচালকসহ সিনেমা প্রযোজনার কাজেও নিজের ছাপ রেখে গেছেন। বিটলস ব্যান্ডের অধিকাংশ গান তার লেখা এবং সুর করা। এবং বিটলসের হাত ধরেই তিনি উঠে আসেন জনপ্রিয়তার শীর্ষে। ১৯৪৩ খ্রিস্টাব্দের ২৫ ফেব্রুয়ারি, ইংল্যান্ডের ল্যাংকাশায়ারের লিভারপুলে জন্মগ্রহণ করেন হ্যারিসন। বাবা হ্যারোল্ড হার্গ্রিভিস হ্যারিসন ছিলেন হোয়াইট স্টার লাইনের বাস কন্ডাকটর। মা লুইসে ছিলেন আইরিশ বংশোদ্ভূত। আর্থিক কষ্টে কাটানো হ্যারিসনের কৈশোর জীবনে মায়ের কিনে দেয়া গিটার নিয়ে শুরু হয় তার সঙ্গীত জীবনের পথচলা৷

পল ম্যাককার্টনি এবং জন লেনন মিলে তৈরি করেছিলেন “দ্যা কোয়ারিমেন্” নামক একটি ব্যান্ড তৈরি করেছিল। পরে সেটাই হয় দিগ্বিজয়ী দ্য বিটলস। পরবর্তীতে ১৯৫৮ সালে হ্যারিসন সেই ব্যান্ডে যোগদান করেন। বিটলসে সবার ছোট ১৫ বছর বয়সী হ্যারিসন গিটার বাজানোর দক্ষতায় দলের বাকি সদস্যরা মুগ্ধ করে ব্যান্ডের একজন মুখ্য সদস্য হয়ে যান। ১৯৬২ সালের প্রথম লিড এ্যালবামে লিড গিটারে ছিলেন হ্যারিসন এবং সেইসাথে অধিকাংশ গানের সুর আর কথা তারই লেখা। প্রথম এ্যালবামই উঠে আসে টপচার্টে। এরপর থেকেই সফলতা তাদের পিছু ছাড়েনি। বিটলস্ এর হয়ে এ সময়ের গানগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিল- ইফ আই নিডেড সামওয়ান, ট্যাক্সম্যান, হোয়াইল মাই গীটার জেন্টলী উইপস্, হেয়ার কামস্ দ্য সান এবং সামথিং ইত্যাদি। ৭০ সালে বিটলসের সাথে তার বিচ্ছেদ ঘটে।

এরপর হ্যারিসনের দুটি একক এ্যালবাম প্রকাশিত হয়েছিল “Wonderwall Music” এবং “Electronic Sound”. তিনি এর ভিতরে ‘Wonderwall Music’ এ্যালবামে, পণ্ডিত রবি শঙ্কর-এর দ্বারা প্রভাবিত হয়ে পাশ্চাত্য সঙ্গীতের সাথে ভারতীয় রাগ সঙ্গীতের মিশ্রণ ঘটান। ১৯৭১ সাল। পণ্ডিত রবিশঙ্করের সান্নিধ্যে এসে জর্জ হ্যারিসন জানতে পারলেন বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে নির্যাতিত বাংলাদেশীদের দুরবস্থা। পাক হানাদার বাহিনীর হত্যাযজ্ঞ থেকে রেহাই পেতে ভারতে আশ্রয় নেয়া প্রায় এক কোটি অসহায় মানুষের কথা।

 

মাত্র পাঁচ সপ্তাহের আয়োজনে পণ্ডিত রবি শঙ্কর, বব ডিলান এবং জর্জ হ্যারিসনের সঙ্গীত পরিবেশনায় অনুষ্ঠিত হয় বাংলাদেশের উদ্ভাস্তুদের জন্য কনসার্ট। উল্লেখযোগ্য পরিবেশনার মন্ত্রমুগ্ধ করা আকর্ষণ ছিল জর্জ হ্যারিসনের নিজের লেখা এবং সুর করা ‘বাংলাদেশ’ গানটি। এই কনসার্টে ২,৫০,০০০ মার্কিন ডলার সংগ্রহীত হয়। হ্যারিসন গান লিখেছিলেন ‘হোয়েন আই এম সিক্সটি ফোর’ তবে এই গুণী শিল্পী ৫৮ বছর বয়সে ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করেন। বাংলাদেশের অকৃত্রিম বন্ধু জর্জ হ্যারিসন। যার অবদানে আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রামে বিশ্ববাসীর সমর্থন এবং সহায়তা অর্জন করা সম্ভব হয়ে হয়েছে। তাই আমরা জর্জ হ্যারিসনকে শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করি।

Related Articles

Adblock Detected

Please consider supporting us by disabling your ad blocker