বিনোদনহোমপেজ স্লাইড ছবি

প্রিন্স মাহমুদ : প্রজন্মকে চেনা যায় যার মাধ্যমে

আরিফুল আলম জুয়েলঃ নব্বই দশকে যাদের দুরন্ত কৈশোর-যৌবন; তাদের কাছে খুব প্রিয় আর পরিচিত নাম।‘প্রিন্স মাহমুদের সুরে’ এই কথাটি যেই অ্যালবামে জুড়ে থাকতো, সেটি না কেনা পর্যন্ত মনে শান্তি পেতাম না। মনে আছে স্পষ্ট, প্রিন্স মাহমুদের এলবাম ‘দাগ থেকে যায়’ যখন বের হয়, তখন ঢাকা কলেজে পড়ি! কলেজের পাশে চৌরঙ্গী মার্কেটের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় দেখি স্টেরিও ক্যাসেটের দোকানে পোস্টার সাঁটানো- ‘প্রিন্স মাহমুদের সুরে এলবাম ‘দাগ থেকে যায়’! মনের মধ্যে অদ্ভুত এক ভাল লাগার পরশ খেলে গেল! কখন কিনবো মনের মধ্যে এ উদ্রেক বারংবার উঁকি দিতে লাগলো!

৩৫ টাকা দিয়ে কিনে আনলাম সেই এলবাম, এনে শুনলাম গান- বাচ্চুর ‘বেলাশেষে’, শাফিন আহমেদের ‘আজ জন্মদিন তোমার’, জেমসের ‘কিছু ভুল ছিল তোমার’, আজম খানের ‘দূরে আছি’, খালিদের ‘হয়নি যাবার ও বেলা’, নকীব খানের ‘কোন দু:খ নেই’, জুয়েলের ‘তুমি বুঝনি বন্ধুত্ব কি’, মেহেদীর ‘আমি তো মরে যাবো’ গান! আহা! সেই স্মৃতি! এমন অগণিত গান ও অ্যালবামের মাধ্যমে শ্রোতা হৃদয়ে একজন গীতিকার, সুরকার ও সঙ্গীত পরিচালক হিসেবে স্থায়ী ভালোবাসার জায়গা করে নেন প্রিন্স মাহমুদ।

এলবামের কথা বললে কতগুলোর কথা বলবো- শক্তি, ওরা এগার জন, ক্ষমা, ঘৃণা, ব্যবধান, দূর থেকে ভালবেসে যাব, শেষ দেখা, এখনও দু’চোখে বন্যা, দাগ থেকে যায়, স্রোত, দেয়াল দুই হৃদয়ের মাঝে, হারজিৎ, পিয়ানো, তাল – হাসান, ১২ মাস, দেনা-পাওনা, সারেগামা, যন্ত্রণা, বাজনা, মাটি, প্রতারণা, আড্ডা, দেবীসহ অনেক অনেক এলবাম। এক জীবনে প্রিন্স মাহমুদ এত জনপ্রিয় আর কালজয়ী গান সৃষ্টি করেছেন যে, এটা খুব কম সঙ্গীতজ্ঞ পারেন। বাংলাদেশের ব্যান্ড সঙ্গীতের কিংবদন্তিদের একক কণ্ঠে জনপ্রিয় হওয়া সিংহভাগ গানই তার সৃষ্টি করা।

জেমসের ‘মা’, ‘বাবা’, ‘বাংলাদেশ’, ‘হতেও পারে এই দেখা শেষ দেখা’ কিংবা হাসানের ‘এত কষ্ট কেন ভালোবাসায়’, ‘এতদিন পরে প্রশ্ন জাগে’; আইয়ুব বাচ্চুর ‘বেলা শেষে, ‘বার মাস’ প্রিন্স মাহমুদের সৃষ্টি করা এসব গান মিশে আছে প্রতিটি শ্রোতার হৃদয়ের কেন্দ্রবিন্দুতে। প্রিন্স মাহমুদের সৃষ্ট কালজয়ী গানের সংখ্যা অনেক। প্রতিটি গানের পেছনেই রয়েছে একেকটা গল্প, প্রেক্ষাপট।কিন্তু সেসবের অনেক কিছুই তাঁর এখন আর মনে নেই! অবশ্য মনে করতে ও চান না এখন আর তিনি! বাবা-মা মারা যাওয়ার পর যেই অনুভূতি ছিল, সে অনুভূতি থেকেই জেমসের ‘মা’ ও ‘বাবা’ গানগুলো তিনি তৈরি করেছেন। তারপর ‘বেলাশেষে’, ‘এত কষ্ট কেন ভালোবাসায়’, ‘এত দিন পরে প্রশ্ন জাগে’ গানগুলো কিশোর বয়সের প্রেমকে ঘিরে করা। তাদের প্রেমের ছাড়াছাড়ির পরের অনুভূতি নিয়ে করা।

তার সঙ্গীতের শুরু ছেলেবেলা থেকেই । অনেকটা আড়ালে,অগোচরে পরিবারের ইচ্ছার বাইরে গিয়েই তার গান শেখা এবং গান করা শুরু করেন তিনি। স্কুলে পড়ার সময় থেকেই ব্যান্ডের সাথে জড়িয়ে পড়েন তিনি।‘দি ব্লুজ’ নামের একটি ব্যান্ডের ভোকালিস্ট ছিলেন বেশ কিছু দিন।তারপর কলেজের গন্ডি পেরিয়ে শুরু করেন পুরো দমে কম্পোজিশন। গান কম্পোজিশনের পাশাপাশি তিনি গানও লেখা শুরু করেন।

সংগীতের ভূবনে প্রিন্সের এর পথ চলা শুরু হয় ৮০র দশকের একেবারে শেষ প্রান্তে এই ‘দ্যা ব্লজ’ ব্যান্ড এর ভোকাল ও গিটারিস্ট হিসেবে।এরপর ৯০ দশকের শুরুতে প্রিন্স গঠন করেন ‘ফ্রম ওয়েস্ট’ নামক একটি ব্যান্ড যেখানে ব্যান্ড লিডার এবং মূল ভোকাল ছিলেন তিনিই।

সেই ব্যান্ড এর আলোচিত একটি গান ছিল ‘রাজাকার আলবদর কিছুই রইবো নারে/ উপরে দালাল ভিতরে চোর কিছুই হইবো নারে/সব রাজাকার ভাইসা যাইবো বঙ্গোপসাগরে’ গানটি। ফ্রম ওয়েষ্ট এর প্রকাশিত প্রথম অ্যালবাম এর নাম ছিল ‘সে কেমন মেয়ে’।

শূন্য দশকের গোড়ার দিকে মুক্তি পাওয়া ‘পিয়ানো’ অ্যালবামের ‘বাংলাদেশ’ গানটি বেশ আলোচিত হয়। গানে কণ্ঠ দেন মাহফুজ আনাম জেমস।উফ… কি সেই গান- ‘তুমি মিশ্রিত লগ্ন মাধুরীর জলে ভেজা কবিতায়….’এই গানটি নিয়েও আমাদের নোবেল এক কান্ড করে বসেন!
আমাদের জাতীয় সঙ্গীত নিয়ে করা মন্তব্য নিয়ে বেশ আলোচনা সমালোচনার শিকার হন নোবেল। কী বলেছিলেন নোবেল?

তিনি এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন- “রবীন্দ্র নাথের লেখা জাতীয় সঙ্গীত ‘আমার সোনার বাংলা’ যতটা না দেশকে এক্সপ্লেইন করে তারচেয়ে কয়েক হাজার গুণে এক্সপ্লেইন করে প্রিন্স মাহমুদ স্যারের লেখা এই গানটা।”

আর সাক্ষাৎকারের এই মন্তব্য নিয়ে দেশে ঝড় ওঠে- এমনকী কলকাতার জনপ্রিয়শিল্পীরাও নোবেলকে ছাড় দিয়ে কথা বলেননি। অন্যদিকে নোবেলের এই বক্তব্যকে সোশ্যাল মিডিয়ায় একটা শ্রেণি সমর্থন দিয়ে বসে।কিন্তু এই গানের স্রষ্টা অর্থাৎ গানের গীতিকার ও সুরকার প্রিন্স মাহমুদ বিষয়টি নিয়ে কী বলছেন তা নিয়েই অনেকেই উৎসুক ছিলেন। তিনিও কি তাই মনে করেন? এমনটা প্রশ্ন ছিল সবার মনে! অবশেষে মুখ খুলে কি বলেছিলেন এই সঙ্গীতস্রষ্টা- ‘জাতীয় সংগীত আমাদের অস্তিত্বের নাম।’

এখানেও অতি প্রিয় মানুষ গানের স্রষ্টা, সুরের কারিগর প্রিন্স মাহমুদ! সকল বিতর্ক নিমিষে উধাও! শুধু কি তাই, হালের আলোচিত শিল্পী, ভারতের পশ্চিমবঙ্গের বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেল জি বাংলার গানের প্রতিযোগিতা ‘সারেগামাপা’য় একের পর এক গান গেয়ে আলোচনায় এসেছেন বাংলাদেশের মাঈনুল আহসান নোবেল।এর মূলে ও কিন্তু প্রিন্স মাহমুদের গান! প্রিন্স মাহমুদের জনপ্রিয় গানগুলো নতুন আয়োজনে নোবেল উপস্থাপন করেছেন ‘সারেগামাপা’র মঞ্চে। নোবেল প্রশংসা পেয়েছিলেন প্রিন্স মাহমুদের কথা ও সুরে জেমসের গাওয়া ‘বাবা’ গানটি গেয়ে।প্রতিযোগিতার শুরুর দিকে ‘বাবা’র মতো জনপ্রিয় হৃদয়গ্রাহী গানের কারণেই দ্রুত পরিচিতি পেয়েছেন নোবেল। এরপর প্রিন্স মাহমুদের কথা সুরে ‘মা’ গানটি তাঁকে আরও বেশি আলোচনায় নিয়ে আসে।

এই প্রতিযোগিতায় প্রিন্স মাহমুদের কথা ও সুরের তিনটি গান গেয়েছেন। ‘বাবা’, ‘মা’ এবং ‘এত কষ্ট কেন ভালোবাসায়’। তিনবারের একবারও গীতিকার বা সুরকার হিসেবে প্রিন্স মাহমুদের নাম উচ্চারণ করেননি তিনি। ‘এত কষ্ট কেন ভালোবাসায়’ গানের শুরুতে গানটিকে আর্ক ব্যান্ডের গান বলেও উল্লেখ করেন। এটি ভুল তথ্য। বিষয়টি প্রিন্স মাহমুদের নজরে আসার পরে ফেসবুকে দেওয়া একটি স্ট্যাটাসে প্রিন্স মাহমুদ লিখেছেন-

‘দুঃখিত, “এত কষ্ট কেন ভালোবাসায়” আর্ক ব্যান্ডের গান না। এটা ১৯৯৮ সালে রিলিজ হওয়া আমার কথা ও সুরে মিক্সড অ্যালবাম “শেষ দেখা”–তে হাসান গেয়েছিল।’ব্যান্ডশিল্পী হাসানকে কে না চিনেন, সেই লম্বা চুলের লিকলিকে শরীরের প্রিয় হাসান। হাসান তাঁর প্রথম সলো এলবামটিও করিয়েছিলেন প্রিয় সুরকার প্রিন্স মাহমুদকে দিয়ে! দেশের জনপ্রিয় ব্যান্ডদল আর্ক-এর গায়ক হিসেবে সংগীতের ভুবনে হাসানের আত্মপ্রকাশ। আর্ক ব্যান্ড থেকে বেরিয়ে ২০০০ সালে হাসান প্রকাশ করেন তার প্রথম একক অ্যালবাম ‘তাল’। প্রিন্স মাহমুদের সুরে প্রকাশিত ওই অ্যালবামে ঠাই পায় ‘মেয়েরা এমনই হয়’ নামের একটি গান!

বগুড়ার আলোচিত রিফাত হত্যা, নয়ন বন্ড, মিন্নির ঘটনায় তিনি একটি স্ট্যাটাস দিয়েছিলেন যে- ‘মেয়েরা এমনই হয়‘!
পরে অবশ্য সমালোচনার ঝড় উঠে! কিন্তু পরবর্তীতে তিনি অবশ্য এ স্ট্যাটাসের বিষয়ে লিখেন- ‘কতজন কত কিছুর সাথে মিলিয়ে ফেলেছেন। ‘মেয়েরা এমনই হয়’ (হাসান) আমার একটা গান। অনেক বছর পর শুনছিলাম। স্মৃতি অগণন !!!

প্রিন্স মাহমুদের সৃষ্ট গানের অনেক মিউজিক ভিডিও নির্মিত হয়েছে। তবে এর মধ্যে প্রথম এবং তার প্রিয় মিউজিক ভিডিও ‘মাটি হবো মাটি’।রুমির গাওয়া এই গান দেশের আনাচে-কানাচে সবখানে পৌঁছে গিয়েছিল। এরপর রুমিরই করা ‘মন রে ওরে মন তুই বড় বোকা’ গানের ভিডিওটিও তার খুব পছন্দের। তপু ও ন্যান্সির গাওয়া ‘সোনার মেয়ে তোমায় দিলাম ভুবন ডাঙার হাসি’ ও ‘নিমন্ত্রণ’, তাহসান ও কনার ‘ছিপ নৌকো’ গানগুলোর ভিডিও-ও রয়েছে তার ভালো লাগার খাতায়। প্রিন্স মাহমুদের ক্যারিয়ার তিন দশকের। দীর্ঘ এই পথচলাকে সুন্দর ও মসৃণ বলতেই স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন তিনি। অনেক গুণীজন আশি-নব্বই বছর পর্যন্ত কাজ করে গেছেন। তিনি আরও ত্রিশ বছর কাজ করে যেতে চান!

ব্যক্তিজীবনে তিনি প্রথম ও পৃথুল নামক দু’সন্তানের বাবা। প্রিন্স মাহমুদ- আপনার কারনেই একটি প্রজন্মকে অনায়াসে চেনা যায়, একটি দশককে অনায়াসে বুঝা যায়, স্টেরিও ফিতার ক্যাসেটের যুগকে উদাহরণ হিসেবে হিসেব করা যায়, তুমুল জনপ্রিয় কনসার্টের উপাদান আপনারই কারনে পাওয়া যায়!

আপনি আমাদের প্রিয় গীতিকার, প্রিয় সুরকার, প্রিয় কম্পোজার! আপনাকে আমাদের ভালো লাগে, আপনার তৈরি করা আগের সেই গান এখনো মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে শুনি, এখনো বন্ধু-বান্ধব একত্র হলে আপনার গানই শুনি, গাড়িতে উচ্চস্বরে কোন গান শুনতে চাইলে পছন্দের তালিকায় অটোমেটিক্যালি আপনার গান চলে আসে! প্রিন্স মাহমুদকে আপনি ঘৃণা করতে পারবেন না; তার কাজকে অপছন্দ করতে পারবেন না, এমনকি তাঁকে কখনো আপনি অগ্রাহ্য ও করতে পারবেন না! যে মানুষটি ‘মা’, ‘বাবা’, ‘বাংলাদেশ’ এর মত গান সৃষ্টি করতে পারে, সেই মানুষটাকে অগ্রাহ্য করার উপায় কি আছে? প্রিয় প্রিন্স মাহমুদ, এখনো আমরা আপনার নতুন নতুন গান শুনতে চাই- আসুন না ফিরে আবার আরেকটি ক্ষমা, ঘৃনা কিংবা এখনো দু’চোখে বন্যা নিয়ে! অধীর আগ্রহ নিয়ে অপেক্ষায় থাকবো!

Related Articles

Adblock Detected

Please consider supporting us by disabling your ad blocker