আন্তর্জাতিক বিশ্লেষণচলতি হাওয়াট্রেন্ডিং খবরবাক্যহোমপেজ স্লাইড ছবি

কেন পুড়ছে আমাজন?

ড.নাহিদুল ইসলাম: আমাজন রেইন ফরেস্ট পুড়ছে। পুরো ব্যাপারটা বুঝতে হলে আরেকটি বিষয়কে বুঝতে হবে, সেটি হল “বায়োডিজেল”।

জীবাশ্ম জ্বালানী এঁর সীমাবদ্ধতা ও ক্ষতিকর প্রভাব হতে মুক্তির জন্য বিকল্প জ্বালানী হিসেবে বায়োডিজেল (বায়োফুয়েল) বেশ জনপ্রিয়। ভেজিটেবল অয়েলে মিথানল/ইথানল ও পটাশিয়াম হাইড্রোক্সাইড মিশিয়ে এস্টারিফিকেশন বিক্রিয়া ঘটালে ডিজেল ও গ্লিসারিন উৎপন্ন হয়। এটাই কাঙ্ক্ষিত বায়োডিজেল। নতুন টেকনোলজির মধ্যে রয়েছে, জেনেটিক্যালি ইঞ্জিনিয়ারড ইকোলাই ব্যাক্টেরিয়া দিয়ে সুগার থেকে প্রোপেইন উৎপাদন। এছাড়া ব্রাজিলের রেইনফরেস্টে ডিজেল ট্রি নামের একটি বৃক্ষ জন্মায়, সেই গাছের কষ ও ফল দিয়ে ডিজেল উৎপন্ন হয়। এসব হচ্ছে, ফার্স্ট জেনারেশন বায়োডিজেল।

পুরো পৃথিবীতে যে পরিমাণ বায়োডিজেল উৎপন্ন হয় তাঁর শতকরা প্রায় ৩১ ভাগ আসে পাম অয়েল থেকে, ২৭ ভাগ আসে সয়াবিন অয়েল, আর ২০ ভাগ সরিষার তেল (rapeseed) থেকে। অর্থাৎ শতকরা ৮০ ভাগ বায়োডিজেল প্রস্তুত হয় চাষাবাদ হতে প্রাপ্ত ভেজিটেবল অয়েল হতে। চাষাবাদের জন্যে প্রয়োজন চাষযোগ্য জমি। পুরো চাষাবাদের ব্যাপারটা পামঅয়েল বা সয়াবিন অয়লে চাষাবাদেই সীমাবদ্ধ নয়, বায়োডিজেল উৎপাদনে যে ইথানল ব্যবহৃত হয় সেটিও আসে ভুট্টা, আখ এসব থেকে।

আগুনে যত বেশী জঙ্গল পুড়বে, আদিবাসীরা বাসাবাড়ি ছেড়ে পালাবে, তত বেশী এরিয়াতে পরবর্তীতে চাষাবাদ করা যাবে। কোন ঘটনা গভীর ভাবে বুঝতে হলে খুঁজতে হয় সেই ঘটনায় লাভবান কারা হচ্ছে? উপরের আলোচনা থেকে থেকে বুঝা যায়, এই আগুণের প্রত্যক্ষ বেনেফিসিয়ারি হচ্ছে বায়োডিজেল প্রস্তুতকারী কোম্পানিগুলো ও পরোক্ষ বেনিফিসিয়ারি হচ্ছে সে দেশের সরকার এবং কোন না কোন ভাবে সাপোর্ট করে যাচ্ছে তাঁরা, যারা পরিবেশ বাঁচাতে ফসিল ফুয়েলের পরিবর্তে এই বায়োডিজেল ব্যবহার করছে।

পৃথিবীতে যত বায়োডিজেল উৎপন্ন হয় তাঁর বেশিরভাগ ব্যবহৃত হয় ইউরোপে। ইউরোপে, ফ্রান্স ও জার্মানি সবচাইতে বেশী বায়োডিজেল ব্যবহার করে (একত্রে দৈনিক প্রায় ৯৫,০০০ ব্যারেল)। তুলনামূলক হিসেবে ডেনমার্ক অনেক কম বায়োডিজেল (দৈনিক প্রায় ৭০০ ব্যারেল) ব্যবহার করে। দায়বদ্ধতা থেকেই কিনা, ফ্রান্স ও জার্মানির নেতাদের নাম দেখা যায় পত্রিকার পাতায়। কমপক্ষে তাদের কথা বার্তায় টনক নড়েছে ব্রাজিলের, আগুন নেভাতে অনুদান দিয়েছে জি৭ দেশগুলো।

ইউরোপে বায়োডিজেল উৎপাদনে এগিয়ে আছে জার্মানি। বায়োডিজেল উৎপাদনে ইউরোপের চিত্রটা কিছুটা ভিন্ন, এখানে rapeseed অয়েলের দিকে ঝুঁকছে সবাই। উৎস হিসেবে ভেজিটেবল অয়েল এখনো ৮৫ ভাগ ব্যবহৃত হলেও বাকি ১৫% আবর্জনা থেকে উৎপাদিত হচ্ছে এবং প্রতি বছর এই হার বাড়ছে। আবর্জনা থেকে উৎপন্ন ফুয়েল হচ্ছে সেকেন্ড জেনারেশন বায়োডিজেল। এটা অবশ্যই ভালো খবর। যেখানে পৃথিবীতে এখনো লক্ষ লক্ষ মানুষ অনাহারে অর্ধাহারে দিন কাটায় সেখানে খাবার উৎপাদন না করে, খাদ্য শস্য উৎপাদন করে তা দিয়ে ডিজেল বানানো একদিক থেকে নৈতিকতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে।

গতবছর অর্থাৎ ২০১৮ সালের গ্রীষ্মকাল ছিল নিকট অতীতের সবচাইতে দীর্ঘ গ্রীষ্মকাল। বেশ কয়েকদিন রেকর্ড তাপমাত্রা উঠেছিল ডেনমার্কে। এমনও সময় গেছে যখন টানা দুই মাস বৃষ্টির দেখা মেলেনি। ১৯৭৬ সালের পর গতবছর রোদে পোড়া হলুদ ঘাস দেখা গেছে উত্তর ইউরোপে। অর্থাৎ আমাদের সমসাময়িক বয়সের কেউ জীবনে এঁর আগে এমন চিত্র দেখেনি। এমন পরিস্থিতিতে সরকার ঘোষণা দিল মাঠে ঘাটে আগুন জ্বালানো যাবেনা, বারবিকিউ করার উপরও নিষেধাঙ্গা চলে আসল। এত সতর্কতার পরেও কয়েকটি যায়গায় আগুন ধরেছিল এবং সবগুলোই ম্যানমেইড।

এতে সহজে বোঝা যায়, আগুনটা লাগে কোথা থেকে? এসব কোন চারপেয়ে বানরের অকাজ নয়, যে পাথর দিয়ে বাদাম ফাটাতে গিয়ে ঘর্ষনে আগুন লেগে যায়, বরং আগুন লাগিয়ে দেয় দুপেয়ো সুক্ষ বুদ্ধির অধিকারী মানুষ। সরকার চাইলেই আঈন প্রয়োগ করে আগুন লাগানো বন্ধ করতে পারত। কিন্তু ব্রাজিলের ট্রাম্প বন্ধু ব্যবসায়ী সরকার সেটি চায়নি। এবছর ৭০,০০০ এঁর বেশী আগুন লাগানো হয়েছে আমাজনে রেইনফরেস্টে। এনার্জি উৎপাদনের নিমিত্ত্বে এভাবে বন-জঙ্গল ধ্বংস করে আমরা কি আল্টিমেইটলি বাঁচতে পারবো?

 

Related Articles

Adblock Detected

Please consider supporting us by disabling your ad blocker