আন্তর্জাতিক বিশ্লেষণবাক্যহোমপেজ স্লাইড ছবি

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের বর্বরতা প্রকাশ পায় যেভাবে

আরিফুল আলম জুয়েল: প্রিয় বিষয় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ! যত জানি তত অবাক হই, আরো বেশি জানি আরো বেশি অবাক হই! জাপানের নাগাসাকিতে যে পারমানবিক বোমা ফেলা হয়েছিল সেটা নাগাসাকিতে ফেলার কথা ছিল না, কথা ছিল জাপানের এককালের রাজধানী কিয়োটো তে ফেলার। কিন্তু কিয়োটো পরিবর্তিত হয়ে সেটা হয়ে যায় নাগাসাকি, যার পেছনে ছিলেন আমেরিকার যুদ্ধ বিষয়ক সচিব হেনরি স্টিমসন। যিনি বিয়ের পর হানিমুনে গিয়েছিলেন কিয়োটোতে, গিয়ে প্রেমে পড়ে গিয়েছিলেন কিয়োটো শহরের। তাই তিনি মোটামুটি একক প্রচেষ্টায় পারমানবিক বোমা নিক্ষেপের স্থান হিসেবে কিয়োটো কে নষ্ট হতে দেননি। আহা! ভালবাসা ! এবার আরেকটি ভালবাসার কাহিনী বলবো, সেটাও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ সম্পর্কিত।

হলোকাস্ট তো সবাই জানেন—কনসেনট্রেশন ক্যাম্পে ইহুদিদের উপর বীভৎস নির্যাতন! দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে ইহুদীদের উপর সংঘটিত হলোকাস্টের অন্যতম মূল পরিকল্পনাকারী ছিলেন জার্মান লেফট্যানেন্ট কর্নেল অটো অ্যাডলফ আইখম্যান। যুদ্ধ পরবর্তীকালীন সময়ে ‘মোস্ট ওয়ান্টেড ক্রিমিনাল’দের মাঝে এক দশক পর্যন্ত তার নাম ছিলো শীর্ষস্থানীয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে জার্মানি পরাজিত হলে আইখম্যান প্রথমে পালিয়ে যান অস্ট্রিয়ায়। সেখানেই তিনি কাটান পরবর্তী পাঁচটি বছর। এরপর জাল কাগজপত্র ব্যবহার করে আরো অনেক নাৎসি অফিসারের মতোই তিনি চলে যান আর্জেন্টিনায়। আইখম্যান হয়তো তার বাকি জীবনটা সুখেই কাটিয়ে দিতে পারতেন মেসি-ম্যারাডোনার দেশটিতে। কিন্তু পারলেন না, কারণ ‘কর্মফল’ বলে একটি শব্দ আছে। এই কর্মফল আমরা ইহকালে যেমন পেয়ে থাকি, তেমনি পাই পরকালেও।এবার মূল ঘটনায় আসি,আর্জেন্টিনায় গিয়ে প্রেমের সম্পর্কে জড়িয়ে পড়ে আইখম্যানেরই ছেলে নিকোলাস আইখম্যান।

তার প্রেমিকার নাম ছিলো সিলভিয়া হারম্যান। প্রেমিকার অনেক কিছু জানলেও একটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্যই জানতো না নিকোলাস। সিলভিয়া ছিলো একজন ইহুদী! নিকোলাস প্রায় সময়ই সিলভিয়ার কাছে হলোকাস্টের সময় তার বাবার ভূমিকা নিয়ে গর্ব করতো। এমনকি মাঝে মাঝে আক্ষেপ করে এটাও বলতো, “ইশ, নাৎসি বাহিনী যদি তাদের কাজটা শেষ করতে পারতো!”একজন ইহুদী হবার কারণে কথাগুলো স্বাভাবিকভাবেই সিলভিয়াকে মারাত্মকভাবে আহত করেছিলো। নিজের জার্মান রক্ত নিয়ে গর্বিত নিকোলাস একদিন অহঙ্কারবশত তার বাবার নাম যে ‘আইখম্যান’ সেটাও জানিয়ে দেয় সিলভিয়াকে। সিলভিয়ার বাবা আবার ছিলেন হলোকাস্টের নির্মমতা থেকে বেঁচে যাওয়া এক ইহুদী। পত্রপত্রিকা পড়ে তিনি হলোকাস্ট চলাকালীন সময়ে অ্যাডলফ আইখম্যানের ভূমিকার কথা জেনেছিলেন। সিলভিয়া বাবাকে গিয়ে সব বলে দেয়।

ছেলের এ ভালবাসায় টেনে আনে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের অন্যতম চরিত্র আইখম্যানের মৃত্যু!সিলভিয়ার বাবা এরপর যোগাযোগ করেন ইজরায়েলের অ্যাম্বাসিতে। সেখান থেকে এই খবর ইজরায়েলের প্রধানমন্ত্রীকে জানানো হয়। তিনি কুটনৈতিক উপায়ে আইখম্যানকে শাস্তির আওতায় আনতে ব্যর্থ হবে জেনে আইখম্যানকে গ্রেফতার করে ইজরাইলে নিয়ে আসার নির্দেশ দেন ইসরায়েল গোয়েন্দা সংস্থাকে। মোসাদ এই অত্যন্ত গোপন মিশনের জন্য তাদের অন্যতম শ্রেষ্ঠ কিছু এজেন্টকে নিয়োগ দেয়। এই এজেন্টেদের মধ্যে ছিল পিটার মালকিন এবং নাম না জানা আরো পাঁচ জন। শুরু হয় ‘অপারেশন ফিনালে!’ অপারেশন ফিনালের লক্ষ্য ছিল এডলফ আইখম্যানকে আর্জেন্টিনায় গোপনে গ্রেফতার এবং আইখম্যানের নিজের ইচ্ছায় ইসরায়েলে এনে শাস্তির আওতায় আনা। তবে সেটা তৎকালীন পরিস্থিতিতে প্রায় অসম্ভব ছিল। কারণ আর্জেন্টাইন ফ্যাসিস্ট সরকার আইখম্যানকে সহায়তা করেছিল এবং ইসরায়েলকে কোনো প্রকার সাহায্যই করেনি।

অসম্ভব জেনেও পিটার মালকিন এই মিশনের পরিকল্পনা করেন। তাদের পরিকল্পনা ছিল আর্জেন্টিনার ১৫০ তম স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষে ইসরায়েল থেকে একটি প্লেনে আর্জেন্টিনার জন্য উপহার পাঠাবে। সেই প্লেনে করে আগে থেকে গোপনে বন্দী করা আইখম্যানকে লুকিয়ে ইসরায়েলে নিয়ে আসা হবে। পরিকল্পনা অনুযায়ী মোসাদের গোয়েন্দারা ১৯৬০ সালে ১৯ মার্চ আর্জেন্টিনা যায়। তারা লাতিন আমেরিকার কিছু দেশের পর্যটক এবং ব্যবসায়ী হিসেবে আর্জেন্টিনায় প্রবেশ করে।২১ মার্চ দু’জন এজেন্ট আইখম্যনের বাড়ি পরিদর্শন করেন এবং ছবি মিলিয়ে কনফার্ম করে তিনিই আইখম্যান। এছাড়াও তারা দু’দিনব্যাপি আইখম্যানের প্রতিদিনের রুটিন চেক করে। পরবর্তীতে ১১ মে সন্ধ্যায় কাজ থেকে ফেরার পথে একটি নির্জন জায়গায় এজেন্টরা আইখম্যানকে কিডন্যাপ করে। তারা আগে থেকে ঠিক করা সেইফ হাউজে নিয়ে আসেন তাকে।

পরিকল্পনা ছিল সেদিনই তারা প্লেনে করে পালিয়ে যাবেন। কিন্তু পরবর্তী তে জানা যায় যে প্লেন আসতে ১১ দিন দেরি হবে।অপরদিকে আর্জেন্টাইন কর্তৃপক্ষও আইখম্যান এর নিখোঁজ হওয়ার খবর পেয়ে যায়। ফলে তারাও পুরো আর্জেন্টিনাব্যাপী অভিযান শুরু করে। যা মোসাদের অপারেশনকে আরো কঠিন করে দেয়।মোসাদও কম যায় না, অত্যন্ত চালাকির সাথে মোসাদ এজেন্টরা ১১ দিন ব্যাপি এডলফ আইখম্যানকে লুকিয়ে রাখতে সক্ষম হয়। আইখম্যানকে নিজ ইচ্ছায় নিয়ে যাওয়ার স্টেটমেন্ট সাক্ষর করাতেও সক্ষম হয়। ১১ দিন পর অর্থাৎ ৪ এপ্রিল আর্জেন্টাইন কর্তৃপক্ষের চোখে ধুলা দিয়ে প্লেনের ক্রু সেজে সকল এজেন্ট এবং এডলফ আইখম্যানকে অচেতন করে মদ্যপ ক্রু হিসেবে প্লেনে উঠানো হয়।

পরবর্তীতে দুই বছর ধরে আইখম্যানের বিচারকার্য চলে।১৯৬১-৬২ সাল ধরে চলা আইখম্যানের বিচার কার্যক্রম হলোকাস্ট সংক্রান্ত অনেক কিছুই জানার সুযোগ করে দেয় বিশ্ববাসীকে। সেই বিচারকার্য টিভিতে সম্প্রচার করা হয়েছিলো। এর মাধ্যমেই প্রথমবারের মতো বিশ্ববাসী হলোকাস্ট থেকে জীবন নিয়ে ফিরে আসতে পারা মানুষগুলোর প্রত্যক্ষ বর্ণনা শুনতে পেরেছিলো। ১৯৬২ সালের ১ জুন ফাঁসিতে ঝুলিয়ে আইখম্যানের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়।

তার শেষ কথা ছিলো–“দীর্ঘজীবী হও জার্মানি। দীর্ঘজীবী হও আর্জেন্টিনা। দীর্ঘজীবী হও অস্ট্রিয়া। এই দেশগুলোর সাথেই আমি সবচেয়ে বেশি সংযুক্ত ছিলাম এবং আমি সেটা ভুলবো না। স্ত্রী, পরিবার ও বন্ধুবান্ধবদের জন্য আমার খারাপ লাগছে। আমি প্রস্তুত। আমাদের শীঘ্রই দেখা হবে, এটাই সকলের নিয়তি। ঈশ্বরের উপর বিশ্বাস রেখেই আমি মৃত্যুবরণ করছি।”

কয়েক ঘণ্টা পর আইখম্যানের মৃতদেহটি পুড়িয়ে ফেলা হয়। ইসরায়েলের জলসীমার বাইরে তাদেরই একটি নেভি পেট্রোল বোট ভূমধ্যসাগরে তার দেহভস্ম ফেলে দেয়। আইখম্যানের ছেলের ভালবাসার কারনে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের বর্বরতা প্রকাশ পেল, মানুষ জানলো দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়টা কত বীভৎস ছিল, কতটা ভয়াবহ ছিল!!

Related Articles

Adblock Detected

Please consider supporting us by disabling your ad blocker