ব্যবসা ও বাণিজ্য

একজন তানজিম হকের সফলতার গল্প!

মিজানুর রহমান টিপু: তানজিম জিন্স কিংবা এক্সটাসি যত পরিচিত আমাদের তরুণ সমাজের মাঝে, তার থেকে তানজিম আশরাফুল হক নেহায়েত কম পরিচিত নয়। ব্যক্তি হিসেবে যতটা না ইন্টারনেটের মাধ্যমে মানুষের কাছে পৌছেছেন, তার অনেক পূর্বেই নিজের পণ্য দিয়ে পৌঁছে গেছেন তরুণ প্রজন্মের কাছে। নিজের ব্র্যান্ড দিয়ে পরিচিতি ও সুনাম অর্জন করেছেন দেশ ও দেশের বাইরে ।

বাবা লন্ডনে পড়াশুনা করার সময় থেকেই ব্রিটিশ ফ্যাশন দ্বারা প্রভাবিত হয়েছেন। বাবার ফ্যাশন আগ্রহ থেকেই আগ্রহ টা অর্জন করেছেন তিনি। ঢাকা ল্যাবরেটরি স্কুল এবং ঢাকা কলেজে পড়ার সময় টিফিন টাইমে চলে যেতেন এলিফেন্ট রোড, পকেটে টাকা না থাকলেও ঘুরে ঘুরে দেখতেন সেখানের সব হালের জামা কাপড়, আর নীলক্ষেত থেকে কিনতেন পুরাতন ফ্যাশন ম্যাগাজিন। তখন থেকেই ব্যাপক ফারাক লক্ষ্য করতেন দেশ ও দেশের বাইরের ফ্যাশনের মাঝে।

চার্টার্ড একাউন্ট্যান্ট বাবার তিন ছেলের মধ্যে মেঝো ছেলে তানজিম হক পড়ালিখায় আগ্রহী না হলেও, বড় ও ছোট ছেলে পড়েছেন আই বি এ তে। বাবা মায়ের স্বপ্ন পূরনণের জন্য তাকেও ভর্তি হতে হয়েছিল একটি বেসরকারী মেডিকেলে। কিন্তু তার স্বপ্ন ছিল আলাদা, পড়তে চেয়েছিলেন বিবিএ, হতে চেয়েছিলেন রকস্টার, হতে চেয়েছিলেন লং টেনিস খেলোয়ার। মূলত লং টেনিস খেলার সময় থেকেই ভালবাসা জন্মে নাইক ও এডিডাসের মত ব্র্যান্ডের প্রতি। কিন্তু চাইলেই কিনতে পারতেন না, অপেক্ষা করতে হত কবে কোন আত্নীয় আসবে। তখন শুরু করেন বাংলাদেশি ব্র্যান্ডের খোজ খবর নেওয়া, এবং জানতে পারেন, বেশির ভাগ আন্তর্জাতিক ব্যান্ডগুলোই বাংলাদেশে তৈরী।

বাংলাদেশীদের দেশের বাইরে শ্রমিক-গোষ্ঠি ভাবা, তার নিজের ফ্যাশনের প্রতি ভালবাসা,এবং পরিবারের মধ্যে বিজনেস ভিশনারি থাকায় তার নানার বিজনেস, মূলত এগুলো থেকেই তার ভিতরে বিজনেস করার আগ্রহটা জন্মে। মেডিকেলে পড়ার সময় পরিচয় হয় গার্লফ্রেন্ড আসমা সুলতানার সাথে, তাকে সাথে নিয়েই কিছু হাত খরচের জন্য ১০০ টি-শার্ট প্রিন্ট করান, এবং তখন থেকেই শুরু তার পথচলা। হোটেল শেরাটনে সর্বপ্রথম একদিনের একটা মেলায় দোকান নেন, এবং সেখান থেকে লাভ করে আরও মোটিভেটেড হন।

সেখান থেকে বাংলাদেশ মেডিকেলের সাথে একটা ১২০ ফিটের দোকান নেন তারা। রক মিউজিকের প্রতি ভালবাসা থেকেই দোকানের নাম রাখা হয় এক্সটাসি। মাত্র এক জন লোক নিয়ে চলতে থাকে, কোন লোন না পেয়ে ধীরে ধীরেই চলতে থাকে তাদের ব্যাবসা। বেশ কিছু দোকান নেবার পরে এক্সটাসি একটা মাল্টি ব্র্যান্ড শপ হয়ে যায়। একটা লেভেল তৈরী করার ইচ্ছা তখনও ছিল। এর মাঝে ২০০০ সালে বিয়ে করে এবং মেডিকেল কলেজ ছেরে দেন তানজিম হক, এবং ফ্যাশন নিয়ে পড়াশুনা শুরু করেন।

২০০৬ সালে ফ্যাশন ফর এভ্রিওয়ান কথা টি মাথায় রেখে নিজের নামে লঞ্চ করেন তানজিম জিন্স। পথচলা প্রথমে সহজ না হলেও সাফল্য এসেছে এবং পরবর্তীতে ২০০৯ সালে তার দুই মেয়ের নামের সাথে মিল রেখে তার ওয়াইফ আসমা সুলতানা শুরু করেন যারজেইন। এরপর তাদের ৩য় মেয়ে ও আসমা সুলতানার নামের সাথে মিল রেখে ‘’জুয়াইন এশ’’ নামে আর একটা লেভেল করে ২০১৫ সালে।

আসমা সুলতানার জুয়াইন এশ শুধু দেশেই নয়, হলিউডের অনেকের কাছেই সুনাম কুড়িয়েছেন। জুয়াইন এশ এর মাধ্যমে তারা অন্যতম সেরা ফ্যাশন শো নিউ ইয়োর্ক ফ্যাশন উইক ২০১৭ তে আমন্ত্রিত হন এবং তার তিন বছেরে মেয়ে জুয়ানা কে নিয়ে রানওয়ে তে হেটেছেন, এছাড়াও প্যারিস ফ্যাশন উইকে অংশগ্রহন করেছেন । গ্র্যামি এ্যয়ার্ড উইনার টনি ব্রাক্সটন, লিওনা ম্যান্ডজা, ভেনেসা কারি সহ অনেকের জন্যই এখন জুয়াইন এশ পরছেন বিভিন্ন জায়গায়। এসব ক্ষেত্রেই আমাদের দেশীয় ঐতিহ্য জামদানী, কাতান, মুসলিন, বেনারসি কাপড় ব্যাবহার করা হচ্ছে।

এখন দেশের মধ্যে প্রায় ২৮ টির মত আউটলেট আছে তাদের, সেখানে রয়েছে তাদের নিজস্ব ব্র্যান্ডের জিনিস ছাড়াও রয়েছে কেল্ভিন ক্লেইন, এডিডাসের মত ব্র্যান্ডের পোশাক। শার্ট, প্যান্ট, স্যুট, জুতা ও বিভিন্ন এক্সেসরিসের জন্য সুনাম কুড়িয়েছে তারা।

২৩ মে ১৯৭৪ সালে পৃথিবীতে আসা যে তানজিম আশরাফুল হক থেকে শুরু, ছোট্ট বয়সে মায়ের থেকে শোনা “পরিশ্রমের মূল্য পাবেই” কিংবা, বাবার থেকে শোনা “যা কর শতভাগ দিয়ে কর” আর নয়ত নিজের প্যাশনের প্রতি ভালবাসা থেকেই হোক, তাদের এই সাফল্যের জন্য গর্বিত হতে পারে আমাদের দেশ, বাংলাদেশ।

Related Articles

Adblock Detected

Please consider supporting us by disabling your ad blocker