ব্যবসা ও বাণিজ্যহোমপেজ স্লাইড ছবি

মুদ্রার প্রচলন হয় যেভাবে

মঞ্জুর দেওয়ান: অর্থনীতি ব্যাপারটা কাঠখোট্টা হলেও মাঝে মাঝে এর মধ্যে আনন্দের খোরাকও খুঁজে পাওয়া যায়। বিশেষ করে অর্থনীতির প্রাচীন ইতিহাস জানতে। একবার ভাবুনতো আজ থেকে হাজার হাজার বছর আগে যখন কোন মুদ্রার প্রচলন ছিলোনা তখনকার সময়টা কেমন ছিলো? মানুষ কেনাকাটা করতো কিভাবে? হ্যাঁ, এই কথা আমরা সবাই জানি যে, বিনিময় প্রথার মাধ্যমে সবাই প্রয়োজনীয় চাহিদা মেটাতো। কিন্তু মুদ্রার প্রচলনের সময়টা কেমন ছিলো তা আমরা বেশিরভাগ মানুষই জানিনা। মুদ্রার ইতিবৃত্ত থাকছে এই আয়োজনে।

পৃথিবীতে কতো দিন আগে মুদ্রার প্রচলন কতোদিন আগে হয়েছিলো শুনলে অবাক হতে পারেন। এখন থেকে প্রায় সাড়ে চার হাজার বছরেরও আগে মিশরে বিনিময় প্রথার প্রথম প্রমাণ পাওয়া যায়। এর আগে মানুষ অনেক কিছুই টাকা হিসেবে ব্যবহার করেছে। লবণ, কফি বিন, শস্যদানা, গরু ও হাঙরের দাঁত, মূল্যবান পাথরও বাদ যায়নি। সবকিছুকেই বিনিময়ের বস্তু হিসেবে চালিয়েছে প্রাচীনকালের মানুষ। তবে প্রথম মুদ্রার প্রচলন করেন লিডিয়ার রাজা। বর্তমানে যে অংশটি তুরস্কের। এই লিডিয়ার হাত ধরেই প্রথম মুদ্রার দেখা পেয়েছিলো পৃথিবীর মানুষ। তিনি ছিলেন একজন ধনকুবের। কিন্তু আজকে আমরা যে ধরনের মুদ্রা দেখতে পাই শুরুতে এগুলো এরকম ছিলোনা।

ওজনের দিক থেকে মুদ্রা ছিলো অবিশ্বাস্য। ধাতুর তৈরি ২০ কেজি ওজনের মুদ্রার দেখাও মিলেছে। সুইডেনে একসময় মুদ্রার ওজন ছিলো প্রায় ২০ কেজি! অবাক লাগছে তাই না ? লাগারই কথা। এতো ওজনের মুদ্রা মানুষ কিভাবে কিভাবে বহন করতো সেটাও চিন্তার বিষয়। অন্যদিকে বিশ্বের সবচেয়ে ক্ষুদ্রতম মুদ্রার প্রচলন করেছিলো নেপাল। যার ওজন ছিলো মাত্র ০.০০২ গ্রাম! বহন করার জন্য এটিই ছিলো সবচেয়ে সুবিধার ধাতব মুদ্রা।

মুদ্রার উপর যে ধরনের লেখা থাকতো সেগুলো মূলত এক ধরনের কোড হিসেবে ব্যবহারের জন্য। কারণ, জায়গার অভাবে এতো লেখা সম্ভব ছিলোনা। তাই সংক্ষেপে কোড ব্যবহার করা হতো। আগের আমলে বেশির ভাগ মুদ্রার প্রান্তে খাঁজ কাটা থাকতো। নাহলে অসাধু ব্যবসায়ীদের খপ্পরে পড়তে হতো মুদ্রাকে! অসাধু ব্যবসায়ীরা মুদ্রার ভেতর থেকে মূল্যবান ধাতু বের করে ফেলতো বলে শোনা যায়।

কিন্তু এখন অবশ্য আর সে সুযোগ নেই। তা আমরা সবাই জানি। ব্যাংক নোট আসার পর ধাতব মুদ্রার প্রচলন একেবারেই কমে গেছে। আর আধুনিকতার ছোঁয়া পেয়েছে। বিশেষ কাগজ দিয়ে বানানো এসব নোটে জলছাপ দেয়া থাকে। আলোর কাছে ধরলেই যে জলছাপ স্পষ্ট হয়ে ওঠে। বিশেষ এক ধরনের নিরাপত্তা সুতা থাকাতে নোট জাল করার সুযোগও কম থাকে। মুদ্রার মতো ভেতর থেকে মূল্যবান ধাতু বের করার অবকাশও থাকেনা।

সবচেয়ে মজার বিষয় হলো, মুদ্রার মতো কাগজের নোট নিয়েও আমরা কম বিশ্লেষণ করা হয়নি। ডাকটিকিটের সমান করেও নোট ছাপানো হয়েছে! যার প্রচলন ঘটিয়েছে মরক্কো। মুদ্রার প্রচলন যখন জয়জয়কার ছিলো তখন খুব বেশি বড় লেনদেন সম্ভব ছিলোনা। টাকা আসাতে যা অনেকাংশেই বদলে গেছে। চা-বিড়ি খাওয়া থেকে শুরু করে হাজার হাজার টাকার বাজার করি কাগজের নোট দিয়ে। মুদ্রা দিয়ে যা করা সম্ভব হতো না।

কাগজের নোট আসাতে বিনিময় প্রথায় নতুন মাত্রা যোগ হয়েছে কোন সন্দেহ নেই। কিন্তু লেনদেনে আরোও বড় অংক বসানোর সুযোগ করে দিয়েছে চেক। কাগজের তৈরি চেকের মাধ্যমে কি পরিমাণ অর্থ লেনদেন করা সম্ভব তা বলা মুশকিল। একবার ভারত সরকারের উদ্দেশ্যে আমেরিকার রাষ্ট্রদূত ২৭ কোটি ৯১ লাখ ৮৭ হাজা ৪৯০ ডলারের একটি চেক লিখেছিলেন। বাংলাদেশি টাকায় যা প্রায় দুই হাজার ৪০০ কোটি টাকা ! ভাবা যায়! এতো বড় অংকের টাকা কেবল একটি কাগজের মাধ্যমে লেনদেন হয়ে গেলো!

আগের আমলে যে চেকের প্রচলন ছিলোনা ব্যাপারটি এমন নয়। এখনকার মতো কাগজের প্রচলন না থাকায় মানুষ যে কোন কিছুর উপরই চেক লিখতো! পাথর, কলার খোসা এমনকি গরুর চামড়াকেও বেছে নিতো চেকের কাগজ হিসেবে! তবে ধাতব মুদ্রা, টাকার পর চেকেরও হারিয়ে যাবার সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে। ডিজিটাল মার্কেটের যুগে মানুষ বহনযোগ্য যেকোন কিছুই মেনে নিতে নারাজ। ক্যাশলেস মার্কেটের কদরে হারিয়ে যেতে পারে চেকও। অদূর ভবিষ্যতে হয়তো ডিজিটাল মার্কেটিং সিস্টেমকেই বেছে নেবে পৃথিবীর মানুষ। আর হারিয়ে যাবে বিনিময়ের জন্য প্রচলিত ধাতব মুদ্রা, কাগজের নোট এবংকি চেকও !

Related Articles

Adblock Detected

Please consider supporting us by disabling your ad blocker