ব্যবসা ও বাণিজ্যহোমপেজ স্লাইড ছবি

একটি আইডিয়া যেভাবে বদলে দিয়েছে পৃথিবীর বাজার ব্যবস্থা

একটি আইডিয়া কিভাবে জীবনকে বদলে দিতে পারে তার অনেক উদাহরণ আছে। কিন্তু জেফ বেজোসের একটি আইডিয়া তার নিজের জীবন তো বটেই; পুরো পৃথিবীর বাজার ব্যবস্থাকে বদলে দিয়েছে। ৯০ এর দশকে দেখানো দূরদর্শিতা বেজোসকে নিয়ে গেছে অনন্য এক উচ্চতায়। ছোটবেলায় যেখানে পৃথিবীর সবচেয়ে ধনী ব্যক্তির নাম বিল গেটস বললে সঠিক উত্তর হতো, সেখানে বেজোস এসে সেই উত্তর বদলে দিয়েছেন! পৃথিবীর সবচেয়ে বিত্তশালী ব্যক্তির নাম এখন জেফ বেজোস। জনপ্রিয় অনলাইনভিত্তিক কেনাবেচার প্রতিষ্ঠান অ্যামাজন দিয়েই যার সফলতার সব গল্প। অনলাইন বুক স্টোর থেকে বেজোসের পৃথিবীর শীর্ষ ধনী হয়ে উঠার গল্প থাকছে এবারের আয়োজনে।

যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাসে বেড়ে উঠা বেজোসের ছোটবেলা থেকেই প্রযুক্তির প্রতি আগ্রহ ছিলো। স্কুল জীবনে কম্পিউটারের সাথে পরিচিত হওয়া বেজোসের, উদ্ভাবনের প্রতি ঝোঁক ছিলো অনেক। যে স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দিতে ১৯৮৬ সালে প্রিন্সটন ইউনিভার্সিটি থেকে কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইলেকট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে স্নাতক শেষ করেন। পড়াশুনা চলাকালে ছুটির সময় গুলোতে বসে না থেকে কিছু করার প্রবণতা পেয়ে বসতো বেজোসকে। প্রোগ্রামার ও অ্যানালিস্ট হিসেবে পার্ট টাইম চাকরি করেন। যে অভিজ্ঞতা তাকে বড় বড় কিছু প্রতিষ্ঠানে কাজ করার সুযোগ তৈরি করে দেয়। যার মধ্যে একটি ছিলো আনকোরা ‘ফিটেল’ নামের একটি কোম্পানি। বিভিন্ন কম্পিউটার একসাথে যুক্ত করে একটি সিস্টেম তৈরি করা ছিলো যেটির প্রধান কাজ। আর একটি বিশেষ প্রোটোকল তৈরি করা ছিলো বেজোসের কাজ।

১৯৯০ সালে D.E Show নামের একটি ইনভেস্টমেন্ট ফার্মের সাথে যুক্ত হন। সেসময় সদ্য শুরু হয়েছে ইন্টারনেটের বিকাশ। ৯০ এর দশকের ইন্টারনেট ছিলো কেবল বিশ্ববিদ্যালয়, রিসার্চ ল্যাব ও সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর তথ্য আদান প্রদানের মধ্যে সীমাবদ্ধ। প্রযুক্তির প্রতি আলাদা আকর্ষণ থাকাতে ইন্টারনেটের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে আন্দাজ করতে পারেন বেজোস। ভবিষ্যতের বাজার ব্যবস্থা যে ইন্টারনেটের দখলে যাবে সেটিও বুঝে যান দূরদর্শী জেফ বেজোস।

বেজোসের কর্মস্থল D.E Show বেশ কয়েকটি ইন্টারনেট ভিত্তিক সেবা দিতে শুরু করে। যার মধ্যে একটি ছিলো ফ্রি ইমেইল সার্ভিস ‘জুনো’। ‘ফারসাইট’ নামের ব্যক্তিগত ফাইনান্স সার্ভিসও বেশ জনপ্রিয় হতে থাকে। সেসময় বেজোসের মাথায় অনলাইনে পণ্য কেনা-বেচার ধারণাটি আসে। অনলাইনে যেহেতু বিক্রি হবে তাই প্রযুক্তিগত জিনিসই বিক্রি করবেন। জেফের পছন্দের তালিকায় তাই সফটওয়্যার, হার্ডওয়্যার ও সিডির মতো পণ্য ছিলো। কিন্তু পরবর্তীতে সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করে বই বিক্রির জন্য মনস্থির করেন। কেননা,  সাধারণ বইয়ের দোকানে পছন্দের বই খুঁজতে পাঠকদের অনেক সময় অপচয় হয়। আর অনলাইনে এক ক্লিকেই খুঁজে পাবেন।

এরপর একইসাথে ‘আত্মঘাতী’ ও জীবন বদলে দেয়া এক সিদ্ধান্ত নেন বেজোস। D.E Show এর অন্যতম বেতন পাওয়া বেজোস চাকরি ছেড়ে নিজের কোম্পানি গড়ার চিন্তা করে। পাড়ি জমান আমেরিকার পশ্চিম প্রান্তের সিয়াটল শহরে।  নিজের জমানো টাকা, পরিবার থেকে পাওয়া- সবমিলিয়ে ১ লাখ ডলারের কিছু অর্থ নিয়ে শুরু করেন নিজের প্রতিষ্ঠান। নিজের বাড়ির গ্যারেজে ছোট্ট এক অফিস খুলেন। আর সেখান থেকেই শুরু হয় আজকের অ্যামাজনের কার্যক্রম।

১৯৯৫ সালে শুরু হওয়া অ্যামাজন মাত্র এক মাসের মধ্যেই সফলতা পেতে শুরু করে। ৩০ দিনে যুক্তরাষ্ট্রের ৫০টি অঙ্গরাজ্য তো বটেই দেশের বাইরে ৪৫ টি দেশে অর্ডার পাঠাতে সক্ষম হয় অ্যামাজন। পাঁচবছরের মধ্যে অ্যামাজন ব্যবহারকারীর সংখ্যা ১ লাখ ৮০ হাজার থেকে বেড়ে দাঁড়ায় ১ কোটি ৮০ লাখে!  ৫ লাখ ১১ হাজার ডলারের বিক্রি দাঁড়ায় ১৬০ কোটি ডলারে! ৩৫ ছুঁই ছুঁই বেজোস বনে যান পৃথিবীর ধনী ব্যক্তিদের একজন। ১৯৯৯ সালে বিখ্যাত টাইম ম্যাগাজিন জেফ বেজোসকে আখ্যা দেন ‘কিং অব সাইবার-কমার্স’ হিসেবে।

একসময়ের পুরনো বই বিক্রির প্রতিষ্ঠান হয়ে যায় পৃথিবীর সবচেয়ে বড় অনলাইনভিত্তিক শপ। অ্যামাজনে কেনা যায়না এমন পণ্য হয়তো আঁতস কাঁচ দিয়ে খুঁজতে হবে। লাইভ স্ট্রিমিং টিভিও রয়েছে অ্যামাজনের। আশ্চর্যজনক হলেও সত্য, অ্যামাজনের এখন অ্যারোস্পেস কোম্পানিও রয়েছে। খুব তাড়াতাড়ি মহাকাশে ভ্রমণের সুযোগ মিলবে অ্যামাজনের হাত ধরে।

জেফ বেজোসের এতো সফলতার পিছনে বেশ কিছু  কারণও রয়েছে। প্রকৃতির নিয়মে অ্যামাজন পৃথিবীর সেরা হয়েছে এমন নয়। বেজোসের দূরদর্শিতা ও পরিশ্রমে অ্যামাজন আজকের অবস্থানে পৌঁছাতে পেরেছে। বার্ষিক লাভের কথা না ভেবে এক দশক ফ্রি শিপিং সুবিধা দিয়েছেন। কিন্ডল ই-বুক রিডারের মতো যন্ত্র তৈরির জন্য বছরের পর বছর সময় ব্যয় করেছেন। ঢেলেছেন হাজার হাজার ডলার। গোল ফুডস নামক খাদ্যদ্রব্য প্রস্তুতকারী কোম্পানি কিনে নিয়েছে অ্যামাজন। অনলাইন ফার্মেসিও কিনেছে অ্যামাজন। চলতে থাকা আরোও নানান চুক্তির কথা বুঝিয়ে দেয়, অ্যামাজন নতুন উদ্যোগ হাতে নেয়া থেকে এতটুকু পিছুপা হয়নি। প্রস্তুত হচ্ছে নতুন শতাব্দীর জন্য!

লেখক: মঞ্জুর দেওয়ান

 

Related Articles

Adblock Detected

Please consider supporting us by disabling your ad blocker