শুক্রবার, ১৮ আগস্ট ২০১৭
webmail
Fri, 14 Apr, 2017 01:47:28 AM
ড. তানভীর আহমেদ সিডনী

বাঙালি ও বৈশাখ অভেদ্য আত্মা। কৃষিজীবী বাঙালির জীবনাচরণের সঙ্গে বাংলা সনের যোগ অনস্বীকার্য। তবে কোন সময়কাল থেকে বছরের প্রথম মাস হিসেবে বৈশাখ পালিত হয় তা জানা যায় না। মধ্যযুগের কবি ভারতচন্দ্র বৈশাখ বন্দনা করে লিখেছেন :

‘বৈশাখে এ দেশে বড় সুখের সময়
নানা ফুল গন্ধে মন্দ গন্ধবহ হয়॥”

নবাবরা এ দেশে বছরের প্রথমদিনে পূন্যাহ পালন করতেন। অবশ্য ইংরেজ শাসনামলে জমিদাররাও এ কৃত্য পালন করতো। জমিদারি প্রথা উচ্ছেদের মধ্য দিয়ে এই আয়োজন শেষ হয়ে যায়। এর অনুসরণে বর্তমানে ব্যবসায়ীরা হালখাতা করেন। গ্রামের ন্যায় শহরের ব্যবসায়ীদের মাঝেও এই উৎসব পালনের প্রচলন দেখা গেছে।


প্রাচীন ও মধ্যযুগে পহেলা বৈশাখ সাড়ম্বরে উদযাপিত হয় কৃষিনির্ভর বাংলার পল্লিতে। এই উদযাপন কৃত্য (Rituals) হিসেবে বিবেচ্য ছিল সেকালে। পরবর্তীকালে নাগরিক সমাজেও এর বহুল প্রচলন লক্ষ্যণীয়। এতদঞ্চলে শাসকরা রাষ্ট্র পরিচালনার স্বার্থে নানা বর্ষপঞ্জি প্রণয়ন করে প্রচলন করেছেন। আল বেরুনির কাছ থেকে জানা যায়, শ্রী হর্ষাব্দ, বিক্রমাব্দ, শকাব্দ, বলভাব্দ ও গুপ্তাব্দ প্রচলিত ছিল এ অঞ্চলে। মুসলিম শাসকরা তাদের দলিলাদিতে হিজরি সালের প্রচলন করেছেন। তবে এই বর্ষপঞ্জি সাধারণ্যে জনপ্রিয়তা পায়নি।  মধ্যযুগের বিভিন্ন পুথি থেকে এ অঞ্চলে বিভিন্ন বর্ষপঞ্জির তথ্য মিলে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য সম্বৎ, ত্রিপুরাব্দ, মঘী অব্দ, লক্ষণাব্দ, শালিবাহন সন, জালালি সন, সেকান্দর সন ইত্যাদি।

গবেষক যতীন্দ্রমোহন ভট্টাচার্যের হিসেবে এ দেশে ২৪ রকমের অব্দ বা সন প্রচলিত ছিল। সম্রাট আকবর ‘তারিখ-ই- ইলাহি’ প্রবর্তনের মাধ্যমে এ অঞ্চলে রাষ্ট্রীয়ভাবে বাংলা সন গণনার প্রচলন করেন। যদিও এ নিয়ে ভিন্নমত আছে। সে আলোচনা স্থগিত করে বলা চলে বাঙালির বছর হিসেবে বঙ্গাব্দের প্রচলন হয় মোগল সম্রাট আকবরের হাতে। বাংলা অঞ্চলে বহু বর্ষপঞ্জির প্রচলন ছিল। এই বর্ষ হিসেব যুক্ত হতো ক্ষমতার সঙ্গে; তাই ক্ষমতা বদলই বর্ষপঞ্জির ভাগ্য বদলে দেয়। বাঙালির নামের সঙ্গে বর্ষপঞ্জি একটিই আর তা হলো বঙ্গাব্দ। বাঙালি এই বর্ষপঞ্জি আকবরের পর থেকে অনুসরণ করছে।

রাজনৈতিক নানান পালা বদল এবং ইংরেজদের নৈকট্য লাভের প্রচেষ্টার মাধ্যমে নাগরিক বাঙালি মধ্যবিত্ত শ্রেণি গড়ে ওঠে। এই শ্রেণি তাদের শেকড় থেকে উন্মূল হতে পারে না। বিপরীতক্রমে শেকড়েও অবস্থান করতে পারে না। এই শ্রেণির হাতেই নতুন পরিবর্তনের স্পর্শ লাগে। আত্ম অনুসন্ধানে নামে বাঙালি, এই সূত্রেই পাকিস্তান আমলে বৈশাখকে উদযাপন করা হয়। একই সঙ্গে স্মরণে রাখা প্রয়োজন দ্বিজাতিতত্ত্বের ভিত্তিতে গঠিত পাকিস্তান রাষ্ট্রের মূল অভিপ্রায় ছিল ধর্মের নামে বাঙালিকে শোষণ। তাই রাষ্ট্র গঠনের অল্প সময় পরেই ক্ষমতাসীনদের পদলেহনকারীরা বাঙালির সংস্কৃতি বদলের কাজটি করার প্রয়াস নেয়। মুসলিম লীগ পন্থিরা আঞ্চলিক পর্যায়ে নববর্ষ উদযাপনকেও বিরোধীতা করে। তারা মনে করেছিল, নববর্ষ  উদযাপনের মধ্য দিয়ে বাঙালি নিজের মাটির সঙ্গে আত্মীকৃত হবে, যাতে পাকিস্তানি চেতনা বিনষ্টের আশঙ্কা প্রবল।

ধর্মীয় চেতনার ভিত্তিতে গঠিত রাষ্ট্রে নববর্ষের মতো একটি অসাম্প্রদায়িক উৎসব উদযাপন রাষ্ট্রের জন্যে নিশ্চিতরূপেই বিপত্তি টেনে আনবে। সত্যিই বিপত্তি টেনে আনে পাকিস্তান রাষ্ট্রে। ১৯৫৪ সালের নির্বাচনে বাঙালি রায় দেয় পাকিস্তানিদের বিরুদ্ধে, সে রায়ের ফলও মিলে। পহেলা বৈশাখ পায় রাষ্ট্রীয় ছুটির মর্যাদা। অবশ্য পহেলা বৈশাখের দেশজুড়ে মেলাসমূহ এই ছুটির চেয়ে রাষ্ট্রীয় সহায়তা কামনা করে। নববর্ষে গ্রামে-গঞ্জে মেলার আয়োজন হয়। বৈশাখ জুড়ে অনুষ্ঠিত এই মেলাসমূহে গৃহস্থালি সামগ্রী, চারু ও কারুপণ্যর পসরা সাজানো থাকে। আর থাকে যাত্রা, পুতুলনাচ ও সার্কাস। এই আয়োজনসমূহ বাঙালি জাতীয়তাবাদী চেতনার ধ্বজা উর্ধ্বে তুলে ধরে। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, পহেলা বৈশাখের অনেক আয়োজন কালের বিবর্তনে মুছে গেছে। দুয়েকটির কথা না লিখলেই নয়, ঢাকার ঘুড়ি উড়ানো, বিক্রমপুরের গরুর দৌড় প্রতিযোগিতা ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য। এর বদলে নতুন আয়োজনে নতুন চেহারা পেয়েছে বৈশাখের উৎসব।

বাঙালির উৎসবের রূপান্তর ঘটলেও আদিবাসী জীবন ও সংস্কৃতিতে বৈসাবি এখনও পালিত হচ্ছে। চৈত্র সংক্রান্তির আগের দিন থেকে বৈশাখের প্রথম দিন, এই তিন দিন নানা আয়োজনে বরণ করা হয় নতুন বছর। ত্রিপুরারা পালন করে বৈসুক, চাকমারা পালন করে বিজু আর মারমারা সাংগ্রাই। এখনও বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানসমূহ পত্র পল্লব বিস্তার করে গ্রাস করেনি আদিবাসী সংস্কৃতির এই বিশেষ আয়োজনকে। কেননা বছরের প্রথম দিন আনন্দ-উল্লাসে মেতে ওঠার দিন নয় বরং দ্রোহ ও কর্মচেতনায় জাগবার দিন। নিজস্ব সংস্কৃতির বাইরে ভিন্ন আমোদে মেতে উঠে নয় বরং কর্মের যোগে আপন ভূমির সঙ্গে অন্বিত হওয়ার কাল। রবীন্দ্রনাথ তা স্পষ্ট করেছেন : “আজ প্রভাতে আমি তোমার গৌরব বিস্মৃত হব না। মানুষের যজ্ঞ আয়োজনকে ফেলে রেখে প্রকৃতির স্নিগ্ধ বিশ্রামের মধ্যে লুকোবার চেষ্টা করব না।”

পাকিস্তান আমলে কয়েকজন বাঙালি চিন্তকের ফসল নাগরিক বর্ষবরণ উৎসব, তা ছিল সাংস্কৃতিক প্রতিরোধের দিন। দীর্ঘ সময় পরেও এই প্রতিরোধ চেতনা মুছে যায়নি। বরং প্রতিবছরই তা নতুন নতুন মাত্রায় ডাক দেয়। দুটি শত্রু নিয়ে নাগরিক বাঙালি বর্ষবরণের উৎসব পালন করে। একদিকে পণ্য সভ্যতার হাতছানি, অন্যপক্ষে আমাদের মাঝে বসবাসকারী পাকিস্তানি দোসররা। পণ্য সভ্যতা বৈশাখি উৎসবের গায়ে মোড়ক স্থাপন করতে চায় আর অন্যপক্ষের অভিপ্রায় ভিন্ন। অবশ্য সে অভিপ্রায় আমরা লক্ষ্য করেছি রমনা বটমূলে বোমা হামলার মধ্য দিয়ে। তারা বারবার বলতে চেয়েছে নববর্ষ উদযাপন হিন্দুয়ানী সংস্কৃতি, যার ফলে স্বাধীন রাষ্ট্রেও আক্রান্ত হয় বৈশাখ।

এ প্রসঙ্গে অস্বীকার করতে দ্বিধা নেই, বাঙালির উৎসব হিসেবে নববর্ষকে প্রতিষ্ঠা করা যায়নি। প্রধান নগরগুলিতে যে উৎসব আয়োজিত হয় তা নিতান্তই মধ্যবিত্ত শহুরে উৎসব। একদিনের জন্যে বাহারি পোষাকে সাজে বাঙালি নারী-পুরুষ, আবাল বৃদ্ধ বনিতা। এ পোষাকে ষোলআনা বাঙালিয়ানার প্রচেষ্টা থাকে। আর এই একটি দিনে পান্তা-ইলিশ খাওয়ার ধুম লেগে যায়। জানি না পান্তা-ইলিশের এই উদ্ভট ভাবনার সঙ্গে বাঙালির যোগ কখন ও কীভাবে ঘটল? কেননা পান্তার সঙ্গে ইলিশের যোগ নেই। একটি উন্মূল কৃত্য উদযাপনের মাধ্যমে মধ্যবিত্ত নিজস্ব সংস্কৃতি নির্মাণ করতে চেয়েছে।
জাতীয় উৎসব হিসেব চিহ্নায়নের জন্যে সাধারণের যোগ থাকা চাই। সাধারণ বলতে গ্রামের জনগোষ্ঠী, যাদেরকে আমরা নিজেদের বানানো পুতুল হিসেবে বিবেচনা করছি। উৎসব দেশজুড়ে ছড়িয়ে দেয়ার দায় আমাদের সকলের। নাগরিক মধ্যবিত্ত এবং সংস্কৃতিকর্মীরা এ দায় পালন করবে, একই সঙ্গে জাতির চিন্তকদেরও এ দায় নিতে হবে। বৈশাখের নাগরিক আয়োজনের অংশ হওয়া কিংবা গণমাধ্যমে নববর্ষ বন্দনা নয়। তাদের নিতে হবে কর্মীর ভূমিকা, বৈশাখে ছড়িয়ে পড়বে দেশময়।

জঙ্গীবাদ এবং সাম্প্রদায়িকতা যেমন করে দেশময় ডালপালা বিস্তার করেছে তেমন করে মুক্তচিন্তার মানুষেরা কি ভিত্তি তৈরি করতে পেরেছেন? এ জন্যে প্রয়োজন সাধারণের সঙ্গে সংযোগ তৈরি। নাগরিক মধ্যবিত্ত বললে পুরো বাংলাদেশকে বোঝায় না। এটা সত্য যে, নাগরিক মধ্যবিত্ত প্রধান নগরীসমূহে ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনা নিয়ে বছরের প্রথম দিন উদযাপন করে। কিন্তু দেশজুড়ে সে অর্থে উদযাপিত হয় না। বেশ কিছু মেলা আয়োজিত হয়, সাংস্কৃতিক আয়োজনও থাকে কোনো কোনো স্থানে। ব্যস এই সারাদেশের চিত্র, তবে হালখাতার আয়োজন থাকে অধিকাংশ স্থানে। অবশ্য কোথাও কোথাও হালখাতা অনুষ্ঠিত হয় নতুন ধান উৎপাদনের সঙ্গে, বাংলা বছরের প্রথম দিন নয়।

নববর্ষ উদযাপনে মিডিয়ার ভূমিকা বহুল, দুয়েকটি ছাড়া বেশিরভাগ গণমাধ্যমে নববর্ষ উদযাপনের সংবাদ ও বিশ্লেষণ প্রকাশ করা হয় গুরুত্ব দিয়ে। একই সঙ্গে প্রকাশিত হয় বিশেষ ক্রোড়পত্র, বেতার ও টেলিভিশনে বিশেষ অনুষ্ঠান- সব মিলিয়ে বৈশাখের উদযাপন নিশ্চিতই ভিন্নমাত্রা পেয়েছে। চিন্তকদের অনেকে পহেলা বৈশাখকে জাতীয় উৎসব করার কথা ভাবছেন। প্রশ্ন সেখানেই, আমরা কি সেখানে যেতে পেরেছি? বৈশাখকে কেন্দ্র করে দেশজুড়ে বর্ণাঢ্য আয়োজন থাকলেই আমরা যেতে পারব সে পথে, যে পথের ভাবনা আমরা বহন করছি।

লেখক : নাট্যকার


Print
আরো খবর
    সর্বশেষ সংবাদ


    শিরোনাম
    Top