জাতীয়

যাদের বিদায়ে ‘বিষন্ন’ বছর

ঢাকা: প্রকৃতির নিয়মেই ক্যালেন্ডারের পাতা থেকে ঝরে পড়ছে ইংরেজি ২০১৭ সাল। দরজায় কড়া নাড়ছে ২০১৮। বিদায়ী এই বছরটি নানা ঘটন-অঘটনে ছিল খুবই গুরুত্বপূর্ণ।

এ বছর বহু ভালো সংবাদের পাশাপাশি আমরা অনেককে হারিয়েছি, যা অনেকের মনে ক্ষতের সৃষ্টি করেছে। তেমনি যাদের মৃত্যুতে রাজনৈতিক অঙ্গন শোকাচ্ছন্ন করে। এর মধ্যে অন্যতম সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত, এমকে আনোয়ার, মুহাম্মদ ছায়েদুল হক, মহিউদ্দিন চৌধুরী ও আনিসুল হক।

এসব গুণী ব্যক্তির মৃত্যুতে রাজনৈতিক অঙ্গনসহ সর্বস্তরে নেমে আসে শোকের ছায়া। আর্তসামাজিক উন্নয়নের কারণে তারা জনগণের কাছে অমর হয়ে থাকবেন বলে প্রত্যাশার কথা জানিয়েছেন দেশের শীর্ষনেতারা।

সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত
আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য বর্ষীয়ান রাজনীতিক সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত। ৫ ফেব্রুয়ারি রাজধানীর ল্যাবএইড হাসপাতালে শেষনিঃশ্বাস ত্যাগ করেন আটবার নির্বাচিত এ সংসদ সদস্য।

প্রবীণ এই পার্লামেন্টারিয়ানের মৃত্যুতে রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, জাতীয় সংসদের স্পিকার ড. শিরীন শারমীন চৌধুরী, বিরোধীদলীয় নেতা রওশন এরশাদ, বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ শোক প্রকাশ করেন।

৭৮ বছর বয়সী সুরঞ্জিতের মৃত্যুর মধ্য দিয়ে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গন থেকে একটি উজ্জ্বল নক্ষত্রের পতন ঘটল বলে জানান তার সহকর্মীরা। সংবিধানের অন্যতম প্রণেতা চলতি সংসদের আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক স্থায়ী কমিটির সভাপতি সুরঞ্জিত সেনগুপ্তের অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া সম্পন্ন হয় নিজ নির্বাচনী এলাকা সুনামগঞ্জের দিরাইয়ের আনোয়ারপুরে গ্রামের বাড়ির পাশে।

১৯৪৬ সালের ৫ মে সুনামগঞ্জের দিরাইয়ের আনোয়ারপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন সুরঞ্জিত। ছাত্রজীবন থেকেই রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়েন তিনি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জগন্নাথ হল শাখা ছাত্র ইউনিয়নের সভাপতি ছিলেন। ১৯৭০-এর ঐতিহাসিক প্রাদেশিক পরিষদ নির্বাচনে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে আওয়ামী লীগের নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতার সময়ও দিরাই-শাল্লা আসন থেকে ন্যাপের মনোনয়নে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত। ১৯৭০-এর প্রাদেশিক পরিষদে তিনি ছিলেন অন্যতম কনিষ্ঠ সদস্য। ১৯৭০-এর প্রাদেশিক পরিষদ এবং ১৯৭২ সালের গণপরিষদের সদস্যসহ মোট আটবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন।

ওয়ান-ইলেভেনের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় দলে ‘সংস্কারপন্থি’ নেতা হিসেবে পরিচিত হন সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত । ২০০৮ সালের নির্বাচনের পর প্রথম মন্ত্রিসভায় স্থান না পেলেও পরে ২০১২ সালে রেলমন্ত্রী হন। এরপর তার সহকারীর গাড়িতে বিপুল পরিমাণ টাকা পাওয়ায় সমালোচনার মুখে পড়েন তিনি। মন্ত্রী থেকে পদত্যাগ করলেও পরে তাকে দফতরবিহীন মন্ত্রী করেন শেখ হাসিনা। তিনি ছিলেন আওয়ামী লীগের মনোনয়ন বোর্ডের সদস্য। ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি দশম জাতীয় সংসদের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ বিজয়ী হলে তিনি আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় কমিটির সভাপতি নির্বাচিত হন। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তিনি এ দায়িত্ব পালন করে গেছেন।

এমকে আনোয়ার
আমলা থেকে পুরোদস্তর রাজনীতিবিদ বনে যাওয়া এমকে আনোয়ার। কর্মজীবনের মতোই রাজনীতিতেও সফলতার মুখ দেখেছিলেন তিনি। তাই কুমিল্লার হোমনা আসন থেকে পাঁচবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন জনপ্রিয় এই রাজনীতিক। বিএনপি সরকারের আমলে এমকে আনোয়ার দুই মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পালন করেন।

বিএনপির স্থায়ী কমিটির এই সদস্য গত ২৪ অক্টোবর না ফেরার দেশে পাড়ি জমান। জনপ্রিয় এই রাজনীতিকের বিদায়ে দলের ভেতর-বাইরে নেমে আশে শোকের ছায়া। দলমত নির্বিশেষে রাজনৈতিক দলগুলোর নেতারা এমকে আনোয়ারকে শেষ শ্রদ্ধা জানান। মানুষের ভালোবাসায় সিক্ত হয়ে পারিবারিক কবরস্থানে চির নিদ্রায় শায়িত হন তিনি।

ছাত্র রাজনীতির মাধ্যমে রাজনৈতিক জীবন শুরু হলেও মাঝখানে দীর্ঘ ৩৪ বছর তিনি ছিলেন সরকারি আমলা। ছিলেন মন্ত্রিপরিষদ সচিব। তবে এসব পরিচয় ছাপিয়ে তিনি রাজনীতিবিদ হিসেবেই দেশের মানুষের মনে স্থান করে নিয়েছিলেন।

ঢাকা কলেজে পড়ার সময় ছাত্র সংসদের সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন এমকে আনোয়ার। এছাড়া ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে লেখাপড়া করার সময় ফজলুল হক হলের ছাত্র সংসদের সভাপতি নির্বাচিত হন তিনি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞান বিভাগের ছাত্র সংগঠনের প্রতিষ্ঠাতা সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। ফজলুল হক হলের ছাত্র থাকা অবস্থায় এমকে আনোয়ার ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে সম্পৃক্ত হয়েছিলেন। এমকে আনোয়ার ১ জানুয়ারি ১৯৩৩ সালে কুমিল্লার হোমনায় জন্মগ্রহণ করেন।

১৯৪৮ সালে মেট্রিকুলেশন, ঢাকা কলেজ থেকে ১৯৫০ সালে আইএসসি পরবর্তিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বিএসসি (সম্মান) এবং পরিসংখ্যাণে এমএসসি করেন তিনি।

পড়াশোনার পাঠ চুকিয়ে ১৯৫৬ সালে পাকিস্তান সিভিল সার্ভিসে যোগ দেন এমকে আনোয়ার। ফরিদপুর ও ঢাকার ডেপুটি কমিশনার, জুটমিল করপোরেশনের সভাপতি, টেক্সটাইল মিল করপোরেশনের সভাপতি, বাংলাদেশ বিমানের সভাপতি এবং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ পদে বহাল ছিলেন তিনি।

এমকে আনোয়ার ১৯৭২ থেকে ১৯৯০ পর্যন্ত প্রশাসনে বিভিন্ন উচ্চপদে পদে দায়িত্ব পালন করেছিলেন। তিনি একজন সিএসপি কর্মকর্তা। ১৯৭১ সালে ঢাকা জেলা প্রশাসক ছিলেন তিনি। তার পেশাগত জীবনের এক সময় পাকিস্তানের সাবেক রাষ্ট্রপতি লেঘারীর অধীনে চাকরি করেছেন দক্ষ এই আমলা।

দীর্ঘ ৩৪ বছরে সফল কর্মজীবন শেষ করেন ১৯৯০ সালে। নব্বইয়ের গণআন্দোলনে এরশাদ সরকারের পতনের পর এমকে আনোয়ারকে মন্ত্রিপরিষদ সচিবের পদ থেকে চাকরিচ্যুত করা হয়েছিল। এরপর ১৯৯১ সালে রাজনীতির মাঠে নামেন এমকে আনোয়ার। বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত হন। এরপর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি তাকে, কর্মজীবনে মতোই রাজনীতিতেও সফলতার মুখ দেখেছেন।

এমকে আনোয়ার ১৯৯৭ সালে বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান হন। পরবর্তীতে তিনি দলের স্থায়ী কমিটির অন্যতম সদস্য হিসেবে দলের জন্য আমৃত্যু কাজ করেছেন।

দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে এমকে আনোয়ারকে বেশ কয়েকবার কারাবরণও করতে হয়েছে। সর্বশেষ হত্যা ও বিস্ফোরক দ্রব্য আইনের দুই মামলায় জামিন আবেদন নাকচ করে তাকে কারাগারে পাঠায় কুমিল্লার একটি আদালত। এর আগে ২০১৩ সালেও তিনি কারাবরণ করেন।

এমকে আনোয়ার চলতি বছরের ২৪ অক্টোবর নিজ বাসভবনে ৮৫ বছর বয়সে ইন্তেকাল করেন।

মুহাম্মদ ছায়েদুল হক
ঢাকায় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মহান বিজয় দিবসের দিন ১৬ ডিসেম্বর সকালে মারা যান মুহাম্মদ ছায়েদুল হক (৭৫)।

ব্রাহ্মণবাড়িয়া-১ আসনে আওয়ামী লীগ থেকে পাঁচবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন ছায়েদুল হক। ২০১৪ সালে শেখ হাসিনার সরকারে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পান প্রবীণ এই নেতা।

ছায়েদুল হকের জন্ম ১৯৪২ সালের ৪ মার্চ; ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগর উপজেলাধীন পূর্বভাগ গ্রামে মেহের চান্দ বিবি ও মোহাম্মদ সুন্দর আলীর ঘরে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯৬৯ সালে অর্থনীতিতে এমএ ডিগ্রি নেওয়ার পর এলএলবি পাস করে আইন পেশায় নিজেকে যুক্ত করেছিলেন তিনি।

তার আগে ১৯৬৮ সালে ব্রাহ্মণবাড়িয়া সরকারি কলেজ ছাত্র সংসদের ভিপি নির্বাচিত হন ছায়েদুল হক। ১৯৬৬ সালে বঙ্গবন্ধুর ৬ দফা আন্দোলনে সক্রিয় হওয়ার পর ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেন তিনি।

ভারতের ত্রিপুরার লেম্বুছড়া প্রশিক্ষণ কেন্দ্র থেকে অস্ত্র ও গোলাবারুদের উপর প্রশিক্ষণ নিয়ে মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন ছায়েদুল হক।

১৯৭৩ সালে প্রথম সংসদ নির্বাচনে ব্রাহ্মণবাড়িয়া-১ (নাসিরনগর) আসন থেকে প্রথম সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন ছায়েদুল হক। এরপর তিনি আরও চারবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন তিনি।

নিজের নির্বাচিত এলাকা নাসিরনগরে গত বছর হিন্দু সম্প্রদায়ের ওপর হামলার ঘটনায় সমালোচনার মুখে পড়তে হয়েছিল ছায়েদুল হককে।

এবিএম মহিউদ্দিন চৌধুরী
চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র ও নগর আওয়ামী লীগের সভাপতি এবিএম মহিউদ্দিন চৌধুরীর মৃত্যুতে শোকের ছায়া নেমে আসে। তার মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়লে দলীয় নেতাকর্মীসহ হাজার হাজার মানুষ গভীর রাতেই হাসপাতাল ও তার বাসভবনে ভিড় জমায়। কান্নায় ভেঙে পড়েন অসংখ্য ভক্ত।

মহিউদ্দিন চৌধুরীর মৃত্যুতে রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রী শোক প্রকাশ করেছেন। এ ছাড়া তার মৃত্যুতে বিএনপি ও জাতীয় পার্টির নেতাদের পাশাপাশি সমাজের বিশিষ্টজনেরা শোক প্রকাশ করেন। তার জানাযার নামাজ লাখো মানুষ অংশ নেন।
গত ১৪ ডিসেম্বর দিনগত রাত তিনটার দিকে নগরীর বেসরকারি ম্যাক্স হাসাপাতালে মহিউদ্দিন চৌধুরী চিকিৎসাধীন অবস্থান ইন্তেকাল করেন। দু’দফা জানাজা শেষে শুক্রবার ( ১৫ ডিসেম্বর) বাদ মাগরিব নগরীর চশমাহিলে বাবার কবরের পাশে তাকে সমাহিত করা হয়।

আনিসুল হক
ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) মেয়র হিসেবে নির্বাচিত হওয়ার পর থেকেই আনিসুল হক আধুনিক ঢাকা গড়ার স্বপ্ন দেখতেন, স্বপ্ন দেখাতেন। কিন্তু, তার স্বপ্নযাত্রা শেষ হওয়ার আগেই চলে গেলেন না ফেরার দেশে।

‘আমার ঢাকা’ স্লোগান নিয়ে আনিসুল হক ২০১৫ সালে ডিএনসিসির মেয়র নির্বাচিত হন। শুরুতেই তিনি নতুন ঢাকা গড়ার প্রত্যয়ে কাজ শুরু করেন। এরই অংশ হিসেবে পরের বছরই ঘটা করে উত্তরায় বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি শুরু করেন।

গত ৩০ নভেম্বর লন্ডনের ওয়েলিংটন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান টিভি ব্যক্তিত্ব, ব্যবসায়ী ও ঢাকা সিটি করপোরেশন উত্তরের মেয়র আনিসুল হক।

২০১৬ সালের ১৮ আগস্ট উত্তরা কমিউনিটি সেন্টারে বৃক্ষরোপণ নিয়ে জনসচেতনতা তৈরি বিষয়ক এক কর্মশালায় ৩-৪ বছরর মধ্যে সবুজ ঢাকা গড়ার প্রতিশ্রুতি দেন আনিসুল হক। কিন্তু বৃক্ষরোপন কর্মসূচি শেষ হওয়ার আগেই বিদায় নিলেন মেয়র আনিসুল হক।

তার মৃত্যুতে ঢাকাবাসীসহ রাজনৈতিক অঙ্গনে নেমে আসে শোকের ছায়া। আওয়ামী লীগ ও বিএনপির শীর্ষ নেতা তার মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করেন। তার জানাজার নামাজে নামে মানুষের ঢল। বনানী কবরস্থানে ছেলে মোহাম্মদ শারাফুল হকের কবরে চিরনিদ্রায় শায়িত হন আনিসুল হক।

নতুন বার্তা/এমআর

Related Articles

Adblock Detected

Please consider supporting us by disabling your ad blocker