রোববার, ২২ এপ্রিল ২০১৮
Sun, 25 Mar, 2018 12:28:52 AM
নতুন বার্তা ডেস্ক

ঢাকা: জাতির ইতিহাসে বিশেষ স্থানে ‘মার্চ’। মার্চেই বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতার ডাক, মার্চেই স্বাধীনতার ঘোষণা। আবার মার্চেই সেই গণহত্যা, মার্চেই প্রতিরোধে নেমে পড়ে এদেশের স্বাধীনতাকামী জনতা। শুরু হয় মুক্তিযুদ্ধ।

তাই ‘অগ্নিঝরা মার্চ’ বা ‘উত্তাল মার্চ’ বলতে আমরা একাত্তরেই ফিরে যাই। কিন্তু ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যায়, বৃটিশ আমল থেকে ১৯৭১ পর্যন্ত মার্চেই ঘটেছে অনেক উত্তাল ঘটনা। আর ১৯৪৮ সালের পর থেকে অনেকটা ধারাবাহিকভাবে মার্চেই উত্তাল ছিল আমাদের এই ভূখণ্ড।

সেই ১৯৫৭ সালের প্রসঙ্গে আসা যাক। সেসময় কুখ্যাত মীরজাফরের বিশ্বাসঘাতকতার কারণে বাংলা স্বাধীনতা হারায়। তারপর থেকে প্রায় দুইশ’ বছর আমরা থেকেছি বৃটিশদের অধীনে। এই সময়ে অনেক আন্দোলন হয়েছে। কিন্তু প্রথম সশস্ত্র আন্দোলন ১৮৫৭ সালের সিপাহি বিদ্রোহ। এটাকে বলা হয় উপমহাদেশের প্রথম স্বাধীনতা সংগ্রাম। এই সংগ্রামেরও সূচনা ঘটে ওই বছরের ৯ মার্চ, বঙ্গদেশের ব্যারাকপুরে।

আবার উপমহাদেশের প্রথম স্বতঃস্ফূর্ত বৃটিশবিরোধী আন্দোলন হলো খিলাফত আন্দোলন। এটা এমন এক আন্দোলন, যেখানে হিন্দু ও মুসলমান একই সঙ্গে আন্দোলন করে। এটা শুরু হয় ১৯১৯-এ। এ আন্দোলন যখন চলছিল, তখন ‘১৯২০ সালের ৯ মার্চ মহাত্মা গান্ধী তার প্রথম অসহযোগ ইশতেহার প্রকাশ করে খেলাফত প্রশ্নে ও পাঞ্জাব ঘটনার সুবিচার না করা হলে অসহযোগ আন্দোলন শুরু করার ডাক দেন। ১৯ মার্চ সারা ভারতে হরতাল ও খিলাফত দিবস পালনের নির্দেশ দেন। ২৩ মার্চ মিরাটে খিলাফত অধিবেশনে তিনি সরকার প্রদত্ত পদবি বর্জন, সরকারি, বেসরকারি, পুলিশ ও সেনাবাহিনী চাকরি বর্জন এবং সরকারি পাওনা বন্ধের হুমকি দেন।…এ সময় থেকে আন্দোলন চরমপন্থি রূপ নেয় এবং গান্ধী স্বয়ং মধ্যপন্থা থেকে সরে এসে খিলাফতের প্রশ্নে চরমপন্থিদের সঙ্গে একাত্ম হন।’ (তথ্যসূত্র: বাংলাদেশের ইতিহাস: ১৯০৫-৭১। লেখক- ড. আবু মোহাম্মদ দেলোয়ার হোসেন)

আবার উপমহাদেশের প্রাদেশিক সরকারের নির্বাচনও হয় ১৯৩৭ সালের মার্চে। এর তিন বছর পর, ১৯৪০ সালের ২৩ মার্চ লাহোর প্রস্তাব উত্থাপন করেন শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হক। তিনি অবিভক্ত বাংলার প্রথম মুখ্যমন্ত্রী। লাহোরে মুসলিম লীগের এক সম্মেলনে তিনি ওই প্রস্তাব দেন। ১৯৪৬ সালে বাংলাসহ সারা ভারতের সব প্রাদেশিক পরিষদের সাধারণ নির্বাচন হয়।

আবার ১৯৪৭-এ উপমহাদেশে স্বাধীনতা আসার পর পূর্ব বাংলা প্রথম উত্তাল হয়ে ওঠে মার্চে। ঘটনা স্বাধীনতার পরের বছর, ১৯৪৮-এ। পাকিস্তান গণপরিষদে সরকারি ভাষার তালিকা থেকে বাংলা ভাষাকে বাদ দেয়ার প্রতিবাদে পূর্ব বাংলায় ছাত্র্র ধর্মঘট হয় ১১ মার্চ। সেদিন পুলিশ শেখ মুজিবুর রহমান ও শামসুল আলমসহ ৬৯ জনকে গ্র্রেফতার করা হয়। আহত হয় অনেক ছাত্র। এ ঘটনার প্রতিবাদে ১৩ থেকে ১৫ মার্চ আবারো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ অন্যান্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ধর্মঘট হয়।

পরে ২১ মার্চ তৎকালীন রেসকোর্স ময়দানে (সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) পাকিস্তানের প্রথম গভর্নর জেনারেল মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ এক জনসভায় বলেন, ‘উদ্যু অ্যান্ড অনলি উর্দু শ্যাল বি দ্য স্টেট ল্যাংগুয়েজ অব পাকিস্তান।’ এর তিনদিন পর, ২৪ মার্চ আবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্জন হলের বিশেষ সমাবর্তনেও তিনি একই কথা বলেন। ছাত্ররা সঙ্গে সঙ্গে ‘নো, নো’ ধ্বনি তুলে এর কড়া প্রতিবাদ জানায়।

ভাষা আন্দোলনের চূড়ান্ত পরিণতি ঘটে ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি। কিন্তু এরও চার বছর পর পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা হিসেবে বাংলাকে স্বীকৃতি দেয়া হয়। তারিখটা ১৯৫৬ সালের ২৩ মার্চ। দিনটিতে আরো দুটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ঘটে। এদিনে পাকিস্তানের প্রথম শাসনতন্ত্র বলবৎ করা হয় এবং পূর্ব বাংলার নাম করা হয় পূর্ব পাকিস্তান। এর দু’বছর আগে ১৯৫৪ সালে সাধারণ নির্বাচন হয়, তাতে যুক্তফ্রন্ট জয়লাভ করে। সে নির্বাচনও হয় মার্চে, ১১ মার্চ।

নানা ঘটনাচক্রে ১৯৫৮-তে মার্শাল ল’ জারি করেন পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট ইস্কান্দার মির্জা। জেনারেল আইয়ুব খান হন প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক। তখন রাজনীতি নিষিদ্ধ ছিল। তবু তার বিরুদ্ধে প্রবল ছাত্রআন্দোলন হয় ১৯৬২ সালে। ওই বছরের সংবিধান ছিল এমন একটা সংবিধান যা স্বৈরতন্ত্রের দলিল ছাড়া আর কিছু নয়। ছাত্ররা এ সংবিধান ও তৎকালীন শিক্ষা কমিশনের বিরুদ্ধে দুর্বার আন্দোলন করে। সংবিধানের বিরুদ্ধে ধর্মঘট ডাকে ১৫ মার্চ। সেদিন ঢাকা মেডিকেল কলেজের সামনে ছাত্রদের সভায় সংবিধানের কপি পোড়ানো হয়। ২৪ মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অনির্দিষ্টকালের জন্য ধর্মঘট ডাকা হয়। ধর্মঘট চলে ১২ দিন।

পরে ১৯৬৪-তে পূর্ব বাংলার রাজনীতিতে উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য যোগ হয়। রাজনৈতিক দলগুলোর ভিন্ন ভিন্ন আন্দোলনকে ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনে রূপ দিতে পূর্ব বাংলা ছাত্রলীগ সমন্বিত কর্মসূচির উদ্যোগ নেয়। ১৫-২২ মার্চ টানা আন্দোলন হয়। ২২ মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্জন হলে সমাবর্তন অনুষ্ঠানে গভর্নর মোনায়েম খানের আগমনকে কেন্দ্র করে ছাত্রবিক্ষোভ প্রবল রূপ ধারণ করে। তবু পুলিশ ও এনএসএফ’র সহযোগিতায় মোনায়েম খান সমাবর্তনে আসেন। এ সময় ১৫০ জন ছাত্রকে গ্রেফতার ছাড়াও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ ঘোষণা করা হয়। এতে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেলে ৭৪টি কলেজ, ১৪০০টি উচ্চ বিদ্যালয় বন্ধ করে দেয়। সারা দেশে গ্রেফতার ১৪০০ ছাত্র। অনেকের ডিগ্রি বাতিল করা হয়, বিভিন্ন মেয়াদে অনেক ছাত্রকে বহিষ্কার করা হয়। ফলে সর্বদলীয় সংগ্রাম পরিষদ ২৯ মার্চ প্রতিবাদ দিবস ও ৩০ মার্চ হরতাল আহ্বান করে।

১৯৬৬ সালের ২৩ মার্চ আনুষ্ঠানিকভাবে ছয়দফা পেশ করেন শেখ মুজিবুর রহমান। পরে ১৯৬৯-এ গণঅভ্যুত্থানের কারণে আইয়ুব খান সরে যেতে বাধ্য হন ২৫ মার্চ। সেদিনই ক্ষমতায় আসেন আগা মোহাম্মদ ইয়াহিয়া খান।

ঘটনাক্রমে আসে ১৯৭১। সে বছরের মার্চে উত্তাল হয়ে ওঠে পুরো দেশ। বঙ্গবন্ধু ৭ই মার্চ সেই ঐতিহাসিক ভাষণ দেন। ২৫ মার্চ আসে গণহত্যার সেই কালরাত। সেদিন রাতের দ্বিপ্রহরে (রাত ১২টার পর) বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান স্বাধীনতার ঘোষণা দেন। শুরু হয় মুক্তিযুদ্ধ। দীর্ঘ নয়মাস রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধের পর ১৬ ডিসেম্বর আসে বিজয়। বিশ্বের মানচিত্রে ঠাঁই করে নেয় স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশ।

নতুন বার্তা/কেকে
 


Print
আরো খবর
    সর্বশেষ সংবাদ


    শিরোনাম
    Top