মঙ্গলবার, ১৯ জুন ২০১৮
Sun, 25 Mar, 2018 12:44:43 AM
নিজস্ব প্রতিবেদক
নতুন বার্তা ডটকম

ঢাকা:  আজকের এই দিনটি (২৫ মার্চ) বাঙালি জাতির জন্য ছিল একেবারের অন্যরকম। বিশেষ করে এদিন রাত সাড়ে ১১টার পরে তৎকালীন পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী পূর্ব পাকিস্তানের নিরস্ত্র বাঙালির ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে ইতিহাসের জঘন্যতম গণহত্যার খেলায় মেতে ওঠে; যার নজির ইতিহাসে বিরল।

কোন পরিস্থিতিতে পাক বাহিনী বাঙালির ওপর আক্রমণ চালিয়েছিল, সেই ইতিহাস সকলের জানা। তবে ২৫শে মার্চ রাত্রের হামলাটি ছিল আকস্মিক। যখন সত্তরের নির্বাচনে জয়ী বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সঙ্গে প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়ার যখন বৈঠক চলছিল, সেই মুহূর্তে এরকম অতর্কিত হামলার ঘটনা এটিই প্রমাণ করে যে, ওই আলোচনা ছিল নিতান্তই ভেলকিবাজ এবং সামরিক প্রস্তুতির জন্য কালক্ষেপণ মাত্র।

এর প্রমাণ মেলে ১৯৭১ সালের ৫ আগস্ট পাকিস্তান সরকারের তরফে ‘ইস্ট পাকিস্তান ক্রাইসিস: হোয়াট হ্যাপেন্ড’ শীর্ষক একটি পুস্তকে। যেখানে বলা হয়, ‘২৫/২৬ মার্চের মধ্যরাত্রির পরে আওয়ামী লীগ সশস্ত্র বিপ্লবের মাধ্যমে স্বাধীন বাংলাদেশ ঘোষণা করবার জন্য দিন-ক্ষণ (জিরো আওয়ার) ঠিক করেছে।’ তার মানে ২৫ মার্চের মধ্যরাত্রের আগেই সামরিক হামলার যুক্তিযুক্ততার সমর্থনে পাকিস্তান সরকার এই ষড়যন্ত্রের অভিযোগ উত্থাপন করে। ওই পুস্তকে দাবি করা হয়, ‘মুজিব-ইয়াহিয়া আলোচনা চলাকালীনই পাকিস্তান সরকার আওয়ামী লীগের ওই ষড়যন্ত্রের কথা জানতে পেরেছিল।’ অর্থাৎ পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর যুক্তি ছিল এই যে, ‘ওরাই (আওয়ামী লীগ) আক্রমণ করতে চেয়েছিল। কিন্তু আমরা (পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী) আগে হামলা করে তাদের অসদুদ্দেশ্য নস্যাৎ করে দিয়েছি।’

এই পুস্তকে পাকিস্তান সরকার ‘ওরা’ শব্দটি দিয়ে আওয়ামী লীগকে প্রতিপক্ষ বানিয়ে মূলত ২৫ মার্চের কালরাত্রিতে নিরীহ বাঙালির ওপর তাদের আক্রমণকে জায়েজ করবার চেষ্টা করে। যদিও পাকিস্তান সরকারের ওই ষড়যন্ত্র তত্ত্ব যে ছিল আরেক ধাপ্পাবাজি তার বিবরণ দিয়েছেন আবুল মনসুর আহমদ তার ‘আমার দেখা রাজনীতির পঞ্চাশ বছর’ বইতে।

তিনি লিখছেন, ‘আওয়ামী লীগ পার্টি সাম্প্রতিক নির্বাচনে নির্বাচিত জন-প্রতিনিধিদল। আর সরকার মিলিটারি বুরোক্রাসি সমর্থিত বিপুল ও অসাধারণ শক্তিশালী গবর্নমেন্ট। এই দুই পক্ষের মধ্যে সামরিক কায়দায় অফেনসিভ-ডিপেনসিভ স্ট্র্যাটিজির কথা সরকারের মাথায় ঢুকাটা নিতান্তই অদ্ভুত ও অসাধারণ।’

পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর ওই হোয়াইট পেপারের অসারতা প্রমাণ করতে গিয়ে আবুল মনসুর আহমদের যুক্তি হলো, পাকিস্তান সরকারের সবোচ্চ কর্মকর্তা প্রেসিডেন্ট। আর গভর্নর হচ্ছেন তার অধীনস্থ ও হুকুমদার। গভর্নরের হুকুমেই চিফ সেক্রেটারি, হোম  সেক্রেটারি, আইজি, ডিসি, এসপি ইত্যাদি সরকারি অঙ্গ প্রত্যঙ্গ মজুদ ছিল ঘটনার দিন। প্রশ্ন হলো, আওয়ামী লীগ নেতারা যদি মুজিব-ইয়াহিয়া আলোচনার আড়ালে সশস্ত্র বিপ্লবের জন্য সত্যিই আয়োজন করে থাকতেন এবং ২৫/২৬ মার্চেই যদি তাদের সেই সশস্ত্র বিপ্লব আরম্ভ হবে বলে সরকার যদি নিশ্চিত হত, তাহলে ২৫ মার্চ রাত্রে তারা কেন নিরীহ বাঙালির ওপর গণহত্যায় মেতে উঠলো? কেন তারা ষড়যন্ত্রকারী আওয়ামী লীগ নেতা-কর্মীদের ধরে জেলে পুরল না। শাসনযন্ত্রের মেশিনারি তো এতেই অভ্যস্ত ছিল। কিন্তু কেন তারা সেটি করল না। এই প্রশ্নের জবাব পাকিস্তানী শাসকগোষ্ঠী কোনোদিন দেয়নি। কেননা তারা নিজেরাও জানে যে, ২৫ মার্চের আক্রমণ ছিল একেবারের পূর্বপরিকল্পিত এবং মুজিবের সঙ্গে আলোচনা ছিল নিতান্তই লোকদেখানো।

এর আরো প্রমাণ মেলে, পরদিন ২৬ মার্চ পাকিস্তান রেডিওতে মুজিব সম্পর্কে তার বিষোদগারে। ইয়াহিয়া খান তার বেতার ভাষণে মুজিবকে গালি দিয়ে আওয়ামী লীগকে বেআইনি ঘোষণা করেন। অথচ বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে তিনি যখন ঢাকায় তথাকথিত আলোচনা করেন, তখন আওয়ামী লীগকে বেআইনি বলা বা এরকম কোনো শব্দ উচ্চারণ করেননি। অর্থাৎ মানুষ খুনের যে ভয়ংকর নীলকনশা তিনি মনে মনে ঠিক করেন, তা ক্ষুণাক্ষরেও প্রকাশ পেতে দেননি ঠাণ্ডা মাথার এই ভয়ংকর জেনারেল।

নতুন বার্তা/কেকে


Print
আরো খবর
    সর্বশেষ সংবাদ


    শিরোনাম
    Top