জাতীয়

রাজনীতিক এবং আমলাদের যোগসাজশে দুর্নীতি

ঢাকা: প্রশাসনকে দুর্নীতিমুক্ত করতে সবার আগে দরকার রাজনীতিবিদের সদিচ্ছা। তারা চাইলেই দুর্নীতি দমন ও প্রতিরোধ সম্ভব বললেন, বিশিষ্টজনেরা।

রাজনীতিবিদ আর আমলাদের যোগসাজশেই দুর্নীতি হয়। রাজনীতিবিদেরা চাইলেই দুর্নীতি দমন ও প্রতিরোধ সম্ভব। দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) আয়োজিত এক সেমিনারে এমন মত দিয়েছেন বক্তারা।

দুর্নীতি প্রতিরোধ সপ্তাহের শেষ দিনে আজ রবিবার সেগুনবাগিচায় দুদক কার্যালয়ে এ সেমিনারের আয়োজন করে সংস্থাটি। ‘জবাবদিহিমূলক প্রশাসন ব্যবস্থাপনা দুর্নীতি দমন ও প্রতিরোধের প্রধান নিয়ামক’ শীর্ষক সেমিনারে মূল প্রবন্ধ পাঠ করেন বাংলাদেশ লোকপ্রশাসন প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের (বিপিএটিসি) সাবেক রেক্টর এ জেড এম শফিকুল আলম।

প্রবন্ধে শফিকুল আলম দুর্নীতির নানা ধরন তুলে ধরেন। দুর্নীতি কমাতে গেলে প্রশাসনিক জবাবদিহি বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেন। পাশাপাশি জবাবদিহিমূলক প্রশাসন, দুদক কর্মকর্তাদের জবাবদিহি এবং জবাবদিহিমূলক গণতান্ত্রিক চর্চার বিষয়ে নানা সুপারিশ তুলে ধরেন। রাজনৈতিক দলগুলোর আদর্শগত অবস্থান থেকে বিচ্যুতিকে রাজনৈতিক দুর্নীতির প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেন তিনি। বড়মাপের দুর্নীতির ক্ষেত্রে উচ্চপর্যায়ের নীতিনির্ধারক ও ক্ষমতাপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের এবং অনেক ক্ষেত্রে রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা থাকে বলে মন্তব্যও করেন তিনি।

অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ও ইউনিভার্সিটি অব এশিয়া প্যাসিফিকের উপাচার্য জামিলুর রেজা চৌধুরী বলেন, রাজনীতিবিদ ও আমলাদের অনৈতিক যোগসাজশ ভাঙতে না পারলে দুর্নীতি প্রতিরোধ সম্ভব নয়। ভারতের সুপ্রিম কোর্টের একটি রায়ের উদ্ধৃতি দিয়ে তিনি বলেন, সেখানে সংসদ নির্বাচনে প্রার্থী ও তার পোষ্যদের সম্পদের উৎসসহ বিবরণী দাখিল বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। আমাদের দেশেও সংসদ নির্বাচনে প্রার্থীরা হলফনামা দিয়ে সম্পদ বিবরণী দাখিল করেন। কিন্তু কেউ যদি মিথ্যা হলফনামা দিয়ে যাত্রা শুরু করেন, তাহলে এদের প্রতি জনগণ আস্থা রাখবে কীভাবে? জামিলুর রেজা চৌধুরী বলেন, দুদকের উচিত চিহ্নিত বড় দুর্নীতিবাজদের শুধু ডেকে শুধু জিজ্ঞাসাবাদ না করে, তাদের কঠোর শাস্তির ব্যবস্থা করা। প্রশাসনের নিয়োগ-বাণিজ্য,পদায়ন ও বদলি-বাণিজ্যের লাগাম টেনে ধরা।

উন্মুক্ত আলোচনায় অংশ নিয়ে সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা এম হাফিজ উদ্দিন খান বলেন, জবাবদিহিমূলক প্রশাসন গড়তে হলে সরকারি নিয়োগ, প্রশিক্ষণ, বদলি, পদায়ন, শৃঙ্খলা ও পদোন্নতিতে স্বচ্ছ এবং বৈষম্যহীন নীতিমালা প্রয়োজন। রাজনৈতিক জবাবদিহির ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।

নাগরিক সংগঠন সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার নির্বাচনী দুর্নীতি প্রতিরোধের ওপর গুরুত্ব দেন। তিনি বলেন, ‘অনেকেই নির্বাচনে জিতে যেন আলাদিনের চেরাগ হাতে পেয়ে যান। তাঁদের সম্পদ ফুলে ফেঁপে ওঠে।’ তিনি বলেন, ‘এবারের নির্বাচনের আগে গত দুটি নির্বাচনের সময় প্রার্থীদের দেয়া হলফনামার তথ্য তুলনা করে খতিয়ে দেখলে অনেক রাঘব-বোয়ালকে ধরা যাবে। বড় দুর্নীতির বিরুদ্ধে দুদক যদি ব্যবস্থা নিতে না পারে, তাহলে দুদক বেশি দূর এগুতে পারবে না বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

দুর্নীতিবিরোধী সংগঠন ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান বলেন, দুর্নীতি দমনে রাজনৈতিক সদিচ্ছা শুধু কাগজে-কলমে থাকলে হবে না, বাস্তবে থাকতে হবে। কারণ, রাজনৈতিক সদিচ্ছা ছাড়া দুর্নীতি দমন হবে না, কোনো দেশেই হয়নি, আমাদের দেশেও হবে না। বিচারহীনতার সংস্কৃতির কারণে দুর্নীতিবাজরা যদি বেঁচে যায়, তাহলে বাজে দৃষ্টান্ত তৈরি হবে। দুদকসহ শুদ্ধাচার কৌশল-সহায়ক প্রতিষ্ঠানগুলোকে কার্যকর করার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।

বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) সভাপতি মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম বলেন, দুর্নীতি প্রশাসনিক নয়, রাজনৈতিক ও সামাজিক। নির্বাচন সামনে রেখে প্রধান দলগুলোর মনোনয়ন-বাণিজ্যের ওপর দৃষ্টি দেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।

সরকারদলীয় সাংসদ এ কে এম রহমতউল্লাহ বলেন, রাজনীতিবিদ এবং প্রশাসনিক কর্তাদের জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। সবাই সম্মিলিতভাবে কাজ করতে না পারলে দুর্নীতি দমন সম্ভব নয়।

দুদকের কমিশনার (তদন্ত) এ এফ এম আমিনুল ইসলাম মাঠপর্যায়ের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে বলেন, তদবির ছাড়া মন্ত্রণালয় থেকে কোনো সিদ্ধান্ত পাওয়া যায় না। সিদ্ধান্তের জন্য জন্য সিন্ডিকেটের শরণাপন্ন হতে হয়। মাঠপর্যায়ের অনেক প্রকল্পকে ভুয়া উল্লেখ করে দুদক কমিশনার বলেন, অনুদান-প্রকল্পের ক্ষেত্রে সাংসদের আধা সরকারি (ডিও) পত্র প্রয়োজন। সব ক্ষেত্রেই সাংসদদের রাখার প্রয়োজন আছে কি না, সেটা ভেবে দেখা প্রয়োজন বলে মনে করেন তিনি। তিনি বলেন, রাজনীতিবিদেরা চাইলেই দুর্নীতি হবে না।

দুদক কমিশনার (অনুসন্ধান) নাসিরউদ্দীন আহমেদ বলেন, ভূমি ব্যবস্থাপনা, বিদ্যুৎ ও স্বাস্থ্যক্ষেত্রে তৃণমূল পর্যায়ে সরকারি সেবা পাওয়ার ক্ষেত্রে নাগরিকদের অবর্ণনীয় হয়রানির শিকার হতে হয়। তৃণমূল পর্যায়ের প্রকল্পের দুর্নীতি প্রতিরোধে সমন্বিত উদ্যোগের আহ্বান জানান তিনি।

সভাপতির বক্তব্যে দুদক চেয়ারম্যান ইকবাল মাহমুদ বলেন, সব দুর্নীতিই দুর্নীতি দমন কমিশনের তফসিলভুক্ত অপরাধ নয়—এটা সবাইকে অনুধাবন করতে হবে। মানি লন্ডারিং আইন ও দুদক আইন সংশোধনের মাধ্যমে বেসরকারি ব্যক্তিদের জাল-জালিয়াতি, প্রতারণা, অর্থ পাচারসংক্রান্ত অপরাধ দুদকের এখতিয়ারের বাইরে চলে গেছে। ফলে পানামা পেপার কিংবা প্যারাডাইস পেপার দুর্নীতিতে যেসব ব্যক্তির নাম এসেছে, তাদের বিষয়ে অনুসন্ধান করা কমিশনের জন্য কিছুটা জটিল। তারপরও কমিশন দেশের স্বার্থে এবং জনগণের প্রত্যাশাকে সামনে রেখে অবৈধ সম্পদ খোঁজার মাধ্যমে তাদের অবৈধ সম্পদ পাচারের বিষয়টি অনুসন্ধান করছে।

ইকবাল মাহমুদ বলেন, আমলারা যদি চেয়ারের মায়া ত্যাগ করে আইনানুগভাবে তাঁদের সব দায়িত্ব পালন করেন, তাহলে কারও পক্ষেই দুর্নীতি করা সম্ভব নয়। অনৈতিক যোগসাজশ ছাড়া কোনো দুর্নীতি সংঘটিত হতে পারে না মন্তব্য করে দুদক চেয়ারম্যান বলেন, পদ্ধতিগত সংস্কার ছাড়া আমলাতন্ত্রের দুর্নীতি নির্মূল করার খুব বেশি একটা সহজ পথ নেই।

নতুন বার্তা/কেকে

Related Articles

Adblock Detected

Please consider supporting us by disabling your ad blocker