জাতীয়হোমপেজ স্লাইড ছবি

ব্যাঙ্কসি : বোবা দেয়ালের রাজনৈতিক অবস্থান

মাসুম শাহরিয়ার : “কষ্টে আছে, আইজুদ্দিন”- সম্ভবত বাংলাদেশের বিভিন্ন জেলা শহরের কোন না কোন দেয়ালে টাইপোগ্রাফিতে করা এই গ্রাফিতি দেখা যায়। কিন্তু শিল্পীর নাম- পরিচয়- চেহারা অজানা, কিংবা তিনি জানাতে চান না; দুই-ই হতে পারে।

১৯৯০ সালের দিকে ইংল্যান্ড-এর ব্রিস্টল শহরের দেয়ালে দেয়ালে আঁকা হতে থাকে দেয়াল চিত্র-গ্রাফিতি, যা সমসাময়িক ঘটনাগুলোর সবচেয়ে বড় সমালোচক হিসেবে সাক্ষী দিতে শুরু করে। যুদ্ধ, শিশুশ্রম, বিশ্ব কিংবা বর্ডার রাজনীতি, পুঁজিবাদ- ভোগবাদের দিকে তাকিয়ে তাচ্ছিল্যের হাসি হাসতে শুরু করে নোংরা দেয়ালগুলো। রাতের অন্ধকারে সে কোন ফেরেশতা এসে স্প্রে কিংবা স্টেঞ্চিলের মাধ্যমে এই বোবা দেয়ালগুলোর মুখে কথা ফুটিয়ে দিয়ে গেছে, করে গেছে কালের সাক্ষী। কিশোর কুমারের গানের মতো করে বলতে হয়- দেখা হয়নি তাকে, শুধু তার নাম শুনেছি। কিন্তু গানের মতো একটু একটু নয়, বরং প্রেমিকার মতো করেই তাকে ভালবেসেছি। সেই ভালোবাসার নাম- ব্যাঙ্কসি।

কে এই ব্যাঙ্কসি, কি তার পরিচয়, দেখতে কেমন? কিছুই জানা যায়নি। কিন্তু হন্য হয়ে খুঁজতে থাকা কিছু অন্বেষক ধোঁয়াশার আকাশে আশার আলো হয়ে জানান দেন; ব্যাঙ্কসি কোন একজন ব্যক্তি নয় বরং সাতজন শিল্পীর একটা দল। আবার পাবলিক ব্রিস্টল ক্যাথেড্রাল স্কুলের ছাত্রদের দাবি ব্যাঙ্কসি আর কেউ নয়, তাদের বন্ধু রবিন গান্নিঙ্ঘহাম যে গোলকিপার ছিল এবং একবার মেক্সিকোতে খেলতে গিয়ে সেখানে কিছু গ্রাফিতি এঁকে স্থানীয় বাসিন্দাদের পানির সমস্যা সমাধানের জন্য টাকা সংগ্রহ করে দিয়েছিল।

কিন্তু সকল আগডুম-বাগডুমকে পেছনে ফেলে সবচেয়ে মূখ্য হয়ে উঠেছে ব্যাঙ্কসির গ্রাফিতির বিষয়বস্তু, যা বর্তমান সভ্যতাকে কটাক্ষ করে নিয়মমাফিক, যেখানে-সেখানে যখন তখন। এই কটাক্ষের সবচেয়ে বেশি নিদর্শন দেখা যায় ব্রিস্টল শহরেই। তাছাড়া অস্ট্রেলিয়া, আমেরিকা, ফ্রান্স এমনকি ইসরাইল- প্যালেস্টাইনের বিভাগস্থল বেথেলহাম পর্যন্ত হয়ে উঠেছে ব্যাঙ্কসির চিত্রপট।
ইঁদুর, শিম্পাঞ্জি, পুলিশম্যান এবং পথহারা শিশুরা ঘুরেফিরে চরিত্র আকারে হাজির হয় ব্যাঙ্কসির চিত্রে। ‘ডিসমাল্যান্ড’ নামক এক ইন্সটলেশনে হাজির আছেন ঐতিহাসিক চরিত্র প্রিন্সেস ডায়না পর্যন্ত। আঁকিয়েদের মধ্যে আছেন ক্লদ মনে আর পপ রাজা অ্যান্ডি ওয়ারহোল। রিফিউজিদের নিয়ে আঁকা এক গ্রাফিতিতে রিফিউজির চরিত্রে আছেন অ্যাপেলের প্রতিষ্ঠাতা খোদ স্টিভ জবস।


উড়ে যাওয়া এক হৃদয় বেলুনের দিকে তাকিয়ে দাঁড়িয়ে আছে এক পথশিশু। ভালোবাসা ক্রমশ দূরে সরে যাচ্ছে, উড়ে যাচ্ছে ধরা ছোঁয়ার বাইরে। ব্যাঙ্কসির করা এই গ্রাফিতি এক মানবতার দলিল। দুই পথশিশু কোন বল ছাড়াই খেলার অভিনয় করছে। শিশুশ্রম আর আমেরিকার পুঁজিবাদকে কটাক্ষ করে ব্যাঙ্কসি এঁকেছেন – এক শিশুশ্রমিক সেলাই মেশিনে একের পর এক আমেরিকার পতাকা সেলাই করে যাচ্ছে। পুঁজিবাদের যাঁতাকলে নিষ্পেষিত হওয়া এইসকল পথশিশুদের মুখপাত্র ব্যাঙ্কসি।

ভিয়েতনাম যুদ্ধের সবচেয়ে পরিচিত নামক ছবির চরিত্রগুলোকে পরিবর্তিত করে ব্যাঙ্কসি এঁকেছেন একই শিরোনামে এঁকেছেন নাপ্লাম গার্ল, যা বিভিন্ন দেশে চলমান আমেরিকার যুদ্ধনীতিকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। মধ্যপ্রাচ্যের দুইদেশ ইসরাইল- প্যালেস্টাইনকে বিভক্ত করা দেয়ালে ব্যাঙ্কসি এঁকেছেন “টার্গেট ডোব”। বুলেট প্রুফ জ্যাকেট পরা একটি কবুতর মুখে করে একটি গাছের ডাল নিয়ে যাচ্ছে আর স্নাইপার বন্ধুকের ভিউপয়েন্ট কবুতরটিকে অনুসরণ করছে। দেয়ালে আঁকা ঝুলন্ত সিঁড়ি বেয়ে ওপারে পার হয়ে যাচ্ছে কেউ। কিংবা এক সাধারন মেয়ে ইসরায়েলি অস্ত্রধারী সৈনিকের শরীর চেক করছে। সম্প্রতি বেথেলহামের দেয়ালে আঁকা এক গ্রাফিতিতে দেখা গেছে- দুই শিশু ফেরেশতা বিভেদকারী দেয়ালটিকে টেনে সরিয়ে ফেলছে। পৃথিবীতে শান্তির বাণী ছড়িয়ে দিতে এই স্থানেই জন্মেছেন জিসাস, যা আজ অশান্তিতে আছন্ন। তাই বেথেলহাম দেয়ালে আঁকা ব্যাঙ্কসির গ্রাফিতি বলছে – ‘পৃথিবীর উপর শান্তি বর্ষিত হোক’। তার পাশেই স্টার চিহ্ন দিয়ে লিখে ‘শর্ত প্রযোজ্য’।

পাশ্ববর্তী কুরদিশ শহরকে ধ্বংসস্তূপে পরিণত করে তুরস্কের আর্মি । এই নিয়ে পত্রিকায় ছাপানো প্রতিবেদনের ছবিকে নতুন করে জলরঙে এঁকে নিজস্ব সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছাড়েন শিল্পী জোহরা দোগান। আর এই জন্য দুই বছরের বেশি জেলের সাজা দেয়া হয় তাকে। এই প্রতিবাদে ব্যাক্সি আমেরিকার হুস্তন শহরে ৭০ ফিট দীর্ঘের এক গ্রাফিতি আঁকেন, যেখানে টালি পদ্বতিতে দিন গণনা এবং জেলের প্রতিকৃতি এঁকে; শিল্পী জোহরা দোগান জেলের ভিতরে দেখানো হয়েছে। আর উপরে জোহরার নিজের আঁকা ছবিটিতে লিখা  “এই ছবি আঁকার জন্য দুই বছর নয় মাস বাইশ দিন জেল দেয়া হয়েছে”।

গ্রাফিতিকে ভণ্ডামি আখ্যায়িত করে তার বেশিরভাগ ছবিই আঁকার পরই মুছে ফেলা হয়েছে। কিন্তু চতুর  ব্যাঙ্কসি এর প্রতিবাদে কড়া এক প্রশ্ন ছুঁড়ে দিয়েছেন। তার মতে যদি গ্রাফিতি ভণ্ডামি বলে মুছে দেয়া হয়, তাহলে গুহা চিত্রকেও মুছে দেয়া হবে না কেন? অন্য গ্রাফিতিতে তিনি ব্যঙ্গ করে বলেছেন, ‘যদি গ্রাফিতি সমাজ পরিবর্তন করে, তাহলে গ্রাফিতি অবৈধ হবে’।


রিফিউজিদের নিয়ে ব্যাঙ্কসির জ্বালা বহু উঁচু দরের। অ্যাপেলের প্রতিষ্ঠাতা স্তিব জবসের রিফিউজি পরিচয় টেনে  ব্যাঙ্কসি আমেরিকার অভিবাসননীতিকে কটাক্ষ করে বলেছেন, যদি এই বাস্তুহারাদের জায়গা নাই-ই দেয়া হয়, তাহলে আমেরিকা অর্থনীতিতে অ্যাপেলের অবদান কেন অস্বীকার করা হবে না। এই অ্যাপেলের প্রধান তো ছিলেন এক রিফিউজিই। তাই রাস্তায় লেখা পার্কিং (Park-ing) চিহ্নের শেষের তিন শব্দ –ING বাদ দিয়ে রিফিউজি শিশুদের জন্য পার্ক এঁকে দিয়েছেন।

ক্লদ মনের বিখ্যাত লেকের ছবিতে শপিং কার্ট ভাসিয়ে দিয়েছেন তিনি। আবার সেই চিরচেনা ক্রুশবিদ্ধ জিসাসের দুইহাত ভর্তি শপিং ব্যাগে। বিশ্বায়ন আর ভোগবাদকে চরম সমালোচনা করা ব্যাঙ্কসির গ্রাফিতিতে দাঙ্গার যুবক শত্রুর দিকে ফুল ছুঁড়ে মারে আবার কখনো মোনালিসা তার সরল স্বাভাবিক ভঙ্গিতে আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ে সবকিছু ধ্বংস করার জন্য তৈরি।

এক পর্যটকের মতে ব্রিস্টলে থাকা তার ৫৫টি মধ্যে বেশির ভাগই মুছে ফেলা হয়েছে,দেখা যায় খুব কম। এই সকল ছবি রয়ে গেছে মানুষের ব্যক্তিগত সংগ্রহে, যা পরে নিলামে চওড়া দামে বিক্রি হয়।

বেথেলহামের দেয়ালের পাশেই ব্যাঙ্কসি গড়ে তুলেছেন The Walled off Hotel. এই হোটেলকে তার নিজস্ব শিল্প জাদুঘরও বলা যায়। নিজের বিভিন্ন গ্রাফিতি আর ইন্সটলেশন দিয়ে সাজানো হয়েছে রুমগুলো। সিরিয়ার পর সবচেয়ে উত্তপ্ত জায়গায় হোটেল দেয়ার প্রধান উদ্দেশ্য ব্যবসা নয়, বরং নিজের শৈল্পিক পরিচিতিকে কাজে লাগিয়ে পর্যটকদের আকর্ষণ করা যাতে তারা ঐ বিধ্বস্ত স্থানের এক প্রত্যক্ষদর্শী বনে যান। শিল্পী ও শিল্পের এ যেন এক বুদ্ধিদীপ্ত রাজনৈতিক অবস্থান।
বালফোর চুক্তির একশো বছর উপলক্ষ্যে ব্যাঙ্কসি হোটেলের সামনে একটি প্যারোডি অনুষ্ঠানের আয়োজন করেন যাতে দেখা যায় ইংল্যান্ডের তৎকালীন রানীর অনুষ্ঠানিক ভাবে প্যালেস্টিনিয়ানদের কাছে ক্ষমা চাচ্ছে।

অস্কার মনোনয়ন পাওয়া তার ডকুমেন্টারি সিনেমা “Exist Through the Gift Shop”-এ মুখোশ পরা ব্যাঙ্কসি দেখা গেছে, কথা বলেছেন নিজের কাজ আর জীবনদর্শন নিয়ে। বেথেলহামে বড়দিনের উদ্ভব যেখানে; ব্যাঙ্কসির মতে সেই জায়গায় সবচেয়ে কম পালিত হয় এই ধর্মীয় উৎসব। তাই সারাক্ষণ বুলেটের ভিউপয়েন্ট বুকে নিয়ে চলা এইসকল মানুষের জন্য হোটেলের পাশেই করেছেন ‘The Alternativity’ নামের বিকল্প ধারার এক বড়দিনের উৎসব। আর এই অনুষ্ঠান পরিচালনা এবং ডকুমেন্ট করেছেন অস্কারজয়ী পরিচালক দ্যানি বয়েল।

নিপীড়িত মানুষের পক্ষে কথা বলা শিল্পী ব্যাঙ্কসি জগৎবিখ্যাত। তার প্রভাব ছড়িয়ে পড়েছে সারা বিশ্বে। বাংলাদেশও তার ব্যতিক্রম নয়।


আমাদের আইজুদ্দিন কিংবা সুবোধ সিরিজের শিল্পীর পরিচয় ব্যাঙ্কসির  মতই অজানা। ‘সুবোধ, তুই তৈরি হ’ কিংবা ‘কবে হবে ভোর?’ ‘সুবোধ, তুই পালিয়ে যা। এখানে মানুষ ভালবাসতে ভুলে গেছে’। তাছাড়া সম্প্রতি প্রকাশিত এক গ্রাফিতিতে দেখা লিখাঃ ‘বাংলাদেশ রিমান্ডে’ – এই সকল গ্রাফিতির বক্তব্যগুলোকে বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক ও সামাজিক অবস্থানের সমান্তরালে চিন্তা করা যায়। আর তখন এই সব নাম না-জানা শিল্পীরা যেন হয়ে উঠেন এক একজন ব্যাঙ্কসি।

Related Articles

Adblock Detected

Please consider supporting us by disabling your ad blocker