জাতীয়হেলথ টিপসহোমপেজ স্লাইড ছবি

মৃত্যু নয় চলুক জীবনের জয়গান

সংবাদপত্রের পাতা অথবা ফেসবুকের নিউজফিডে চোখ রাখলে প্রায় প্রতিদিন চোখে পড়ে কোন না কোন আত্মহত্যার খবর।মানুষ সবচেয়ে ভালোবাসে নিজের জীবন। এত ভালোবাসার জীবন কেন শেষ করে দেয় মানুষ ? এই প্রশ্ন কম বেশি  আমাদের সবার! আসুন জেনে আসি আত্মহত্যা করার কারণ এবং আত্মহত্যা প্রতিরোধে আমাদের কি করণীয়?

কেন আত্মহত্যা করে মানুষ?
কেন মানুষ নিজের জীবন নিজে নেয়? তার কি তখন মাথার ঠিক থাকে? সুস্থ মাথায় কি এটা করা সম্ভব? নানা ধরনের ব্যাখ্যা দেখা যায়।
— মানসিক অস্বস্তির মধ্যে থাকা মানুষের মধ্যে আত্মহত্যার হার বেশি থাকে। যেমন—বিষণ্ণতা, বাইপোলার মুড ডিজঅর্ডার, সিজোফ্রেনিয়া, পার্সোনালিটি ডিজঅর্ডার, মাদকাসক্ত, উদ্বেগে আক্রান্ত ইত্যাদি রোগীদের মধ্যে আত্মহত্যার হার উচ্চ।
— অর্থনীতিতে মন্দা দেখা দিলে আত্মহত্যার হার বেড়ে যায়। সমাজে যখন বিশৃঙ্খলা তৈরি হয়, যখন মানুষ বিচ্ছিন্নতায় ভোগে, তখন আত্মহত্যার হারও যায় বেড়ে।
— দুরারোগ্য ব্যাধিতে আক্রান্ত রোগীরা অনেক সময় আত্মহত্যা করে। অসুখের তীব্র যন্ত্রণা সইতে না পেরে অনেকে এই পথ বেছে নেয়।
— বাংলাদেশে পরিচালিত এক গবেষণা থেকে দেখা যায় পারিবারিক সমস্যা (৪১.২%), পরীক্ষায় অকৃতকার্য হওয়া (১১.২%), বৈবাহিক সমস্যা (১১.৬%), ভালোবাসায় কষ্ট পাওয়া (১২.৪%), বিবাহবহির্ভূত গর্ভধারণ ও যৌন সম্পর্ক (১১.৮%), স্বামীর নির্যাতন (৫.৯%) এবং অর্থকষ্ট (৫.৯%) থেকে রেহাই পেতে মানুষ আত্মহত্যার চেষ্টা করে।
— কোনো কোনো পেশার মানুষের মধ্যে আত্মহত্যার হার বেশি দেখা যায়। যেমন—ডাক্তার, ডেন্টিস্ট বা দন্ত বিশেষজ্ঞ, পুলিশ বা সশস্ত্র বাহিনীর লোক ইত্যাদি।
— যাদের ঘরবাড়িতে আত্মহত্যা করার উপাদান বেশি থাকে, তারাও কিছুটা ঝুঁকিতে থাকে। যেমন—আমাদের দেশের কৃষকদের বাড়িতে কীটনাশক সহজলভ্য থাকতে দেখা যায়।
— খারাপ মানুষের দ্বারা উত্ত্যক্ত হয়ে অমুক নামের নিরীহ একটি মেয়ে নিরুপায় হয়ে আত্মহত্যা করেছে এমন খবর দিনের পর দিন প্রচার পাওয়ার পর একইভাবে উত্ত্যক্ত আরেকটি মেয়ে আত্মহননের পথ বেছে নিতে পারে।
— কিছু কিছু গবেষণায় আত্মহত্যার পেছনে জিনগত ভিত্তি পাওয়া গেছে। পরিবারের মধ্যে আত্মহত্যার ইতিহাস থাকলেও এই ঝুঁকি বাড়ে। পরিবারের কেউ আত্মহত্যার চেষ্টা করলে বা আত্মহত্যা করলে তার সন্তানদের মধ্যে আত্মহত্যার চেষ্টা করার আশঙ্কা বেশি থাকে।

বাংলাদেশে আত্মহত্যার হার
বাংলাদেশ সেন্টার ফর ইনজুরি প্রিভেনশন অ্যান্ড রিচার্স বাংলাদেশ ২০১৩ সালে এক জরিপ চালিয়ে দেখে যে, প্রতিবছর দেশে গড়ে ১০ হাজার লোক আত্মহত্যা করে৷ প্রতি এক লাখে করেন ৭ দশমিক ৩ জন৷ বিভিন্ন বয়স, লিঙ্গ, পেশা এবং ভৌগলিক অবস্থানের নিরিখে ৮ লাখ ১৯ হাজার ৪২৯ জনের ওপর সরাসরি জরিপ চালিয়ে তারা এই তথ্য প্রকাশ করে৷ আর শহরের চেয়ে গ্রামে আত্মহত্যার হার ১৭ গুণ বেশি৷ গ্রামে যাঁরা আত্মহত্যা করেন, তাঁদের বড় অংশ অশিক্ষিত এবং দরিদ্র৷

জরিপে বলা হয়, নারীদের মধ্যে আত্মহত্যার প্রবণতা সবচেয়ে বেশি৷ এদের মধ্যে ১০ থেকে ১৯ বছর বয়সি নারীরা সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ৷ এছাড়া ২০১৪ সালে জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইন্সটিটিউটের এক গবেষণায় বলা হয়, বাংলাদেশে গড়ে প্রতিদিন ২৮ জন মানুষ আত্মহত্যা করেন৷

তাদের হিসেবে, ঐ বছর ফাঁসিতে ঝুলে ও বিষ খেয়ে আত্মহত্যা করেন ১০ হাজার ১২৯ জন৷ এঁদের মধ্যে একটা বড় অংশের বয়স ২১ থেকে ৩০ বছরের মধ্যে৷

জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইন্সটিটিউটের গবেষণায় দেখা গেছে, বাংলাদেশে অধিকাংশ ক্ষেত্রে আত্মহত্যা করছেন ২১-৩০ বছর বয়সিরা৷ এর মধ্যেও নারীর সংখ্যা বেশি৷

বাংলাদেশ পুলিশের হিসাবে, প্রতিবছর ফাঁসিতে ঝুলে ও বিষ খেয়ে গড়ে ১০ হাজার মানুষ আত্মহত্যা করছেন৷ এর বাইরে আছে ঘুমের ওষুধ খাওয়া, ছাদ থেকে লাফ দিয়ে পড়া, রেললাইনে ঝাঁপ দেয়া৷

তাদের হিসাবে, এর বাইরে দেশের বড় বড় হাসপাতালগুলোর জরুরি বিভাগে যত রোগী ভর্তি হয়, তার সর্বোচ্চ ২০ ভাগ আত্মহত্যার চেষ্টা করে ব্যর্থ হওয়া লোকজন৷

বিশেষজ্ঞদের অভিমত
চিকিৎসকেরা বলছেন, যাঁরা আত্মহত্যা করেন তাঁদের ৯৫ ভাগই কোনো না-কোনো মানসিক রোগে ভোগেন৷ তাজুল ইসলামের কথায়, ‘‘এই মানসিক রোগের সঠিক চিকিৎসা করা গেলে আত্মহত্যা কমবে৷ মাদকাসক্তি আত্মহত্যা প্রবণতার জন্য একটি বড় কারণ৷ তাই মাদকাসক্তদের চিকিৎসা এবং মাদকের বিরুদ্ধে শক্ত অবস্থান নেয়া দরকার৷”

বাংলাদেশে মানসিক রোগের চিকিৎসকের সংখ্যা মাত্র ২০০৷ জেলা পর্যায়েই মানসিক রোগের চিকিৎসার ব্যবস্থা নেই৷ শুধু ২২টি মেডিকেল কলেজ, জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইন্সটিটিউট ও পাবনার হাসপাতালে মানসিক রোগের চিকিৎসা হয়৷ ডা. তাজুল ইসলাম জানান, ‘‘যত লোক আত্মহত্যা করেন, তার অন্তত ১০ গুণ লোক আত্মহত্যার চেষ্টা করে বেঁচে যান৷ কিন্তু তাঁরা সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় থাকেন৷ সঠিক মানসিক চিকিৎসা না হলে তাঁদের বড় একটি অংশ আবারো আত্মহত্যার চেষ্টা করতে পারেন৷”

আত্মহত্যা প্রতিরোধে কি করণীয়?
সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধি- বিভিন্ন ধর্মে ও সংস্কৃতিতে আত্মহত্যাকারী বা আত্মহত্যার চেষ্টাকারীর পরিবার সামাজিকভাবে হেয় হন। এ কারণে যাঁদের মধ্যে আত্মহত্যার ইচ্ছা আছে, তাঁরা কোনো সাহায্য নিতে এগিয়ে আসতে দ্বিধাবোধ করেন, কোনো সহায়তা পান না। ফলে বাধ্য হয়ে একসময় আত্মহত্যা করে ফেলেন। যদি আত্মহত্যার বিষয়ে এই দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন ঘটিয়ে সবাইকে বিশ্বাস করানো যায় যে আত্মহত্যার ইচ্ছা একটি ভুল মানসিক প্রক্রিয়া এবং এ থেকে বাঁচার জন্য উপযুক্ত ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের সাহায্য নেওয়া প্রয়োজন তবে অনেক ক্ষেত্রেই আত্মহত্যাকে প্রতিরোধ করা সম্ভব।

আত্মহত্যার উপকরণের সহজলভ্যতা রোধ করা : বাংলাদেশসহ পৃথিবীর অনেক দেশে আত্মহত্যার উপকরণ হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে কীটনাশক ও স্লিপিং পিল। লাইসেন্সের মাধ্যমে কীটনাশকের বিক্রি নিয়ন্ত্রণ করতে হবে এবং কৃষকের বাড়িতেও তা এমন জায়গায় রাখতে হবে যাতে সহজে কেউ তার নাগাল না পায়। সেই সঙ্গে প্রেসক্রিপশন ছাড়া সব ধরনের ওষুধ বিক্রি বন্ধ করার কার্যকরী উদ্যোগ নিতে হবে।

ঝুঁকিপূর্ণ শ্রেণির প্রতি বিশেষ সহায়তা : মাদকাসক্ত ব্যক্তি, মানসিক রোগী, অভিবাসী, বেকার ও সাংস্কৃতিকভাবে শ্রেণীচ্যুতদের মধ্যে আত্মহত্যার হার বেশি। এ কারণে তাদের প্রতি বিশেষ সহায়তা কার্যক্রম চালানো প্রয়োজন।

মানসিক রোগ শনাক্ত ও চিকিৎসা : গবেষণায় দেখা যায় আত্মহত্যাকালীন ৯৫ শতাংশ মানুষের মধ্যে মানসিক অসুস্থতা বিরাজ করে। বিষণ্ণতা, মাদকাসক্তি, ব্যক্তিত্বের বিকার, সিজোফ্রেনিয়াসহ নানাবিধ মানসিক রোগের দ্রুত শনাক্তকরণ ও সুচিকিৎসার ব্যবস্থা করতে পারলে বহু আত্মহত্যা কমানো যাবে। মানসিক রোগের অপচিকিৎসা বন্ধেও পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন।

নারীর ক্ষমতায়ন : আমাদের দেশে যৌতুক, পারিবারিক নির্যাতন এবং উত্ত্যক্তকরণের ফলে আত্মহত্যার ঘটনা ঘটছে। এসব কারণ দূর করার জন্য প্রয়োজন নারীশিক্ষা ও নারীর ক্ষমতায়ন। নারীর প্রতি নারী-পুরুষ সবার দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন করাও আত্মহত্যা প্রতিরোধের অন্যতম উপায় হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।

বিশেষ পরামর্শ সেবা : যাঁরা আত্মহত্যার ঝুঁকির মধ্যে রয়েছেন (ছাত্রী, নববিবাহিত বা বিবাহযোগ্য বয়সের তরুণী, দরিদ্র জনগোষ্ঠী, মাদকসেবী, মানসিক রোগী, পারিবারিক নির্যাতনের শিকার যাঁরা) তাঁদের জন্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বা এলাকাভিত্তিক বিশেষ পরামর্শ সেবাপ্রাপ্তির সুযোগ থাকতে হবে। যেখানে আত্মহত্যা প্রতিরোধে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত চিকিৎসক বা কাউন্সিলররা সবাইকে সাধারণভাবে আত্মহত্যা প্রতিরোধের বিষয়াদি সম্পর্কে পরামর্শ দেবেন, পাশাপাশি কারো মধ্যে আত্মহত্যার চেষ্টা বা ইচ্ছা দেখা দিলে তা রোধ করার উদ্যোগ নেবেন।

সার্বক্ষণিক টেলিফোন সহায়তা : জাতীয় পর্যায়ে সার্বক্ষণিক টেলিফোনে সাহায্য পাওয়ার সুযোগ থাকতে হবে। কারো মধ্যে আত্মহত্যা করার ইচ্ছা জন্মালে বা জীবনে বড় ধরনের বিপর্যয় ঘটলে তিনি যেন এই বিশেষ নম্বরগুলোতে ফোন করে সুপরামর্শ পান। এই টেলিফোনগুলোর সাহায্যকারী প্রান্তে সব সময় থাকবেন মনোচিকিৎসক-কাউন্সিলর।

Related Articles

Adblock Detected

Please consider supporting us by disabling your ad blocker