জাতীয়হোমপেজ স্লাইড ছবি

তারেক মাসুদ কিংবা ‘মাটির ময়না’র আনুর গল্প

ষাটের দশকের উত্তাল সময়ের প্রেক্ষাপট হতে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ঠিক আগের সময়ের একটি পরিবার কিভাবে যুদ্ধ ও ধর্মের কারণে ভেঙে চুরমার হয়ে যায় তার গল্প নিয়ে তৈরি ‘মাটির ময়না’। জনশ্রুতি আছে নির্মাতা তারেক মাসুদের নিজের ছোটবেলার কাহিনীর জীবনের উপর ভিত্তি করে এ ছবির কাহিনী গড়ে উঠেছে। অত্যন্ত ধার্মিক বাবা কাজী সাহেব তাঁর ছোট্ট ছেলে আনুকে পড়াশোনার জন্য মাদ্রাসায় পাঠিয়ে দেন। দেশের রাজনীতিতে পরিবর্তনের পাশাপাশি আনুর মাদ্রাসাতেও চরম ও মধ্যপন্থী মতবাদের বিকাশ ঘটতে থাকে। বিভক্তির এই একই চিত্র দেখা যায় গোঁড়া ধার্মিক কাজী ও তাঁর স্বাধীনচেতা স্ত্রী আয়েশার মধ্যে। ধর্মীয় উদারতা, সাংস্কৃতিক বৈচিত্র এবং ইসলামের দুর্বোধ্যতা এ সব কিছু মিলিয়ে মাটির ময়না হয়ে উঠে জাগতিক দ্বন্দ্বের একটি দৃশ্যমান প্রতিকৃতি।

মাটির ময়না চলচ্চিত্র হিসেবে একটি ‘পাঠযোগ্য বয়ান’। এই বয়ানের কথক তারেক মাসুদ স্বয়ং তাঁর কৈশোরের সংগৃহীত ব্যক্তিক, পারিবারিক ও রাষ্ট্রীয় পর্যায়ের বাস্তব অবস্থার স্মৃতিকে পুনর্গঠন করেছেন তিনি। এই পুনর্গঠনের কাজে শুধু স্মৃতি নয়, কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহার করেছেন ওই সময়কার কালচারাল কোড, ভাবাদর্শ, নানামুখী সামাজিক চিন্তা ও রাজনৈতিক শক্তিসমূহ। শুরু যদিও নির্মাতার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা দিয়ে, ক্রমে তা সমষ্টিগত অভিজ্ঞতার বয়ানে পরিণত হয়। নির্মাতার আপন আত্মচরিত ধীরে ধীরে একটি রাষ্ট্রের আত্মকথা হয়ে ওঠে। মাটির ময়নায় কেন্দ্রীয় চরিত্র আনুর চোখ দিয়ে আমরা চারপাশ দেখি, যেমনটি আনু নিজে দেখে। রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত অস্থির ও উত্তাল একটা সময়কে এক ধরনের নির্মোহ নির্লিপ্ত শিশু-কিশোরের চোখ দিয়ে দেখার চেষ্টা। ফলে ওই সরলতা এক ধরনের নির্বিকার চোখে দেখা আনু যেন  সময়ের সাক্ষী ।

‘মাটির ময়না’য় তিনটি কাহিনীতে তিনজোড়া পরস্পরবিরোধী দ্বন্দ্বমূলক ধারণার সম্প্রসারণ ঘটিয়েছেন নির্মাতা। প্রথম কাহিনীতে নারী-পুরষ বা ঘর-বাহির দ্বন্দ্বটি উন্মোচন করা হয়েছে। এখানে আয়েশাকে ঘিরেই দ্বন্দ্বটি দানা বাঁধে এবং পরিণতি পায়। ঘর ছাড়ে আয়েশা। দ্বিতীয় কাহিনীতে মাদ্রাসাছাত্র রোকনকে ঘিরে ঘনবব্ধ হয় আবদ্ধ মাদ্রাসা বনাম মুক্ত প্রকৃতি তথা প্রতিষ্ঠান-প্রকৃতির দ্বন্দ্বটি। এই দ্বন্দ্বের সমাপ্তি ঘটে রোকনের পাগল হওয়ার মধ্য দিয়ে। তৃতীয় দ্বন্দ্ব বাঙালি জাতিগঠন প্রক্রিয়ার সঙ্গে জড়িত। পাকিস্তানের কাঠামো থেকে বাঙালিরা আলাদা হতে চায়। তাই এই পর্যায়ে যে দ্বন্দ্বটি প্রকট হয়ে ওঠে তা হলো ধর্মভিত্তিক রাষ্ট্র বনাম ভাষাভিত্তিক রাষ্ট্রের মধ্যকার দ্বন্দ্ব। এর সাময়িক অবসান ঘটে ধর্মনিরপেক্ষ ও ভাষাভিত্তিক বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের ইঙ্গিত দিয়ে। কিন্তু আমরা দেখি অনেকেই ‘মাটির ময়না’কে শুধু মাদ্রাসা নির্ভর ছবি হিসেবে চিহ্নিত করে থাকেন, যা মাটির ময়নার একটি অংশমাত্র। মাটির ময়না শুধু মাদ্রাসা নিয়ে ছবি কিনা এ বিষয়ে নির্মাতা তারেক মাসুদ বলেন, ‘সাধারণ অনেক দর্শক মনে করেন ছবিটা শুধু মাদ্রাসা নিয়ে? কিন্তু রোকন যেভাবে তার প্রতিপার্শ্বকে মোকাবেলা করছে তাতে কি মনে হয় না পৃথিবীটাই একটা মাদ্রাসা? মানুষ যেভাবে এখানে ক্ষুধার বিরুদ্ধে, দারিদ্র্যের বিরুদ্ধে, জরার বিরুদ্ধে লড়াই করছে। রোকনও তেমনি মাদ্রাসায় লড়াই করেছে।

মাটির ময়না (ইংরেজি: The Clay bird) ২০০২ সালের বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ সম্পর্কিত একটি বাংলাদেশী ফিচার চলচ্চিত্র। এটি ২০০২ সালের বাংলাদেশে এবং আন্তর্জাতিকভাবে মুক্তি পায়। এই চলচ্চিত্রের কাহিনী ও চিত্রনাট্য রচনা এবং পরিচালনা করেছেন তারেক মাসুদ। প্রযোজনা করেছেন ক্যাথরিন মাসুদ। অভিনয়ে ছিলেন, নুরুল ইসলাম বাবলু, রাসেল ফরাজী, রোকেয়া প্রাচী, শোয়েব ইসলাম, জয়ন্ত চট্টোপাধ্যায়, লামিসা রিমঝিম প্রমুখ।

প্রাথমিক পর্যায়ে বাংলাদেশে চলচ্চিত্রটি নিষিদ্ধ করা হয়। পরবর্তীতে বহিষ্কারাদেশ বাতিল হবার পর এপ্রিল ১৬, ২০০৫ সালে লেজার ভিশন কর্তৃক চলচ্চিত্রটির ভিসিডি এবং ডিভিডি সংস্করণ মুক্তি পায়। চলচ্চিত্রটি প্রথম চলচ্চিত্র হিসেবে “শ্রেষ্ঠ বিদেশী ভাষার চলচ্চিত্র” বিভাগে একাডেমি পুরস্কার প্রতিদ্বন্দ্বিতার জন্য বাংলাদেশের মনোনয়ন লাভ করে।

Related Articles

Adblock Detected

Please consider supporting us by disabling your ad blocker