জাতীয়শিক্ষাঙ্গন

সহজপাঠ : একটি অন্যরকম পাঠশালার গল্প

মৃন্ময়ী মোহনা :  রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর ‘শিক্ষার হেরফের’ প্রবন্ধে বলেছেন, ‘ যতটুকু কেবলমাত্র শিক্ষা অর্থাৎ অত্যাবশ্যক তাহারই মধ্যে শিশুদিগকে একান্ত নিবদ্ধ রাখিলে কখনোই তাহাদের মন যথেষ্ট পরিমাণে  বাড়তে পারেনা। অত্যাবশ্যক শিক্ষার সহিত স্বাধীন পাঠ না মিশাইলে ছেলে ভালো করিয়া মানুষ হইতে পারেনা- বয়ঃপ্রাপ্ত হইলেও বুদ্ধিবৃত্তি সম্বন্ধে সে অনেকটা পরিমাণে বালক থাকিয়াই যায়।’

তাঁর এ বক্তব্যের  এতো বছর পরেও শিক্ষাব্যবস্থা এমন পরিস্থিতিতেই রয়েছে। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে বিষয়টি আরো বাস্তব। মোটা মোটা বই, বাড়ির কাজ,  পরীক্ষা আর ভালো রেজাল্টের চাপে শিশুর শৈশব, মানসিক বিকাশ, সৃজনশীল সত্ত্বা সবই হুমকির মুখে।এতোসব অসঙ্গতির মাঝেও আশার আলো নিয়ে পথ চলা শুরু ব্যতিক্রমধর্মী বিদ্যালয় সহজপাঠের। ‘শিশুর সামূহিক বিকাশ’ যে বিদ্যালয়ের  নীতিবাক্য।

সহজপাঠের ক্লাসরুম

ঠিক একই উদ্দেশ্য নিয়ে প্রায় ১৬ বছর আগে কয়েকজন মানুষের একান্ত প্রচেষ্টায় ঢাকায় ‘নালন্দা’ নামে একটি বিদ্যালয় চালু হয়। যেখানে শিশুরা ভর্তি হওয়ার পর তাদের মানবিক গুণসমূহের বিকাশ খুব দ্রুতই প্রত্যক্ষ হয় এবং প্রাতিষ্ঠানিক পরীক্ষায় ভালো ফলাফল দেখানোর প্রতিযোগিতায় নামার চেয়ে ভালো শিক্ষার্থী হবার প্রবণতাই দেখা যায় তাদের মধ্যে বেশি।  ওই বিদ্যালয়ের শিশুদের কিছু অভিভাবক এমন বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন বিদ্যালয়ের প্রসারের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করছিলেন অনেকদিন ধরে। এমন কয়েকজনের সাথে যুক্ত হলেন চট্টগ্রামের চল্লিশ বছরের পুরনো এমন ধারার আরও একটি বিদ্যালয় ‘ফুলকি’-র পুরোধা আবুল মোমেন। সহজপাঠ নিয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, “বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থা একটি জনবিচ্ছিন্ন ও সমাজবিচ্ছিন্ন ব্যবস্থা। সহজপাঠ একটি নিরহংকার সামাজিক প্রতিষ্ঠান। কোন ‘আলাদা’ বা সমাজবিচ্ছিন্ন তথাকথিত স্কুল নয়।”

বই মেলায় সহজপাঠের শিক্ষার্থীরা

তাঁর কথার সত্যতা পরিলক্ষিত হয় সহজপাঠ বিদ্যালয়ের প্রতিটি কাজে। প্রথমেই আসা যাক, এ বিদ্যালয়ের ছাত্র-শিক্ষক সম্পর্ক নিয়ে। না, না- ভুল বললাম! এ বিদ্যালয়ে কোন ‘শিক্ষক’ নেই! আছেন বন্ধুসুলভ কিছু ‘ভাইয়া’ আর ‘আপুমনি।’ যারা নিজেদের ‘শিক্ষক’ নয়, ‘শিক্ষাকর্মী’ নামে পরিচিত করতেই ভালোবাসে। এ সম্পর্কে জানতে চাইলে বিদ্যালয়ের অধ্যক্ষ মোমেনা বেগম বলেন,  সহজপাঠের শিক্ষক নিজেকে শিক্ষাকর্মী বলে পরিচয় দেন’ এখানে যারা কাজ করে সবাই শিক্ষার্থীদের বন্ধু। যারা শিক্ষার্থীদের জানার আগ্রহ বাড়িয়ে তোলার পরিবেশ সৃষ্টি করে। অর্থাৎ, সক্রিয়ভাবে নিষ্ক্রিয় থাকা।’

মুক্তিযুদ্ধের গল্প শুনছে সহজপাঠের শিক্ষার্থীরা

এ বিদ্যালয়ে দ্বিতীয় শ্রেণি পর্যন্ত গতানুগতিক  কোন বাড়ির কাজের চাপ নেই। শ্রেণিকক্ষের প্রাণবন্ত পরিবেশে শিশু শিখতে পারে প্রাণ খুলে। প্রতিটি শ্রেণির নামও খুব চমৎকার। অঙ্কুর, কিশলয়, মঞ্জুরি, পাঁকুড়,হিজল, শিরীষ, বটবৃক্ষ। শিশু শিক্ষাকর্মীকে নির্ভয়ে যেকোন প্রশ্ন করতে পারে, তার নিজের মত করে বিষয়টি বুঝে নেবার জন্য। ধর্ম, বর্ণ, লিঙ্গ, পারিবারিক সংস্কৃতি ও আঞ্চলিকতা, মেধা এমনকি যেকোন ধরণের শারীরিক বা মানসিক প্রতিবন্ধকতার জন্য শিশুদের মধ্যে কোনরকম বিভাজন বা বিভেদ করা হয়না। এ বিদ্যালয়ে পরীক্ষার জন্য শিশুদের প্রস্তুত করা হয়না৷ এ বিদ্যালয় মনে করে, নির্দিষ্ট বয়স পর্যন্ত শিশুর কাজ কেবল গ্রহণ ও ধারণ করা। পরীক্ষা এক ধরনের উপস্থাপনা যার উপযুক্ত বয়স আরও পরে। প্রচলিত পদ্ধতির পরীক্ষার মাধ্যমে শিশুর গ্রহণ ও ধারণ ক্ষমতা যাচাই করা হয়না। এ কারনে এ বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের কোন গৃহশিক্ষকেরও প্রয়োজন হয়না।

সহজপাঠের বার্ষিক সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান

শ্রেণিকক্ষের পাশাপাশি শিশু তার মানসিক বিকাশ ঘটাতে পারে বিদ্যালয় কর্তৃক আয়োজিত নানা উৎসব, ভ্রমণ, মাঠপর্যায়ের নানা কাজ, খেলাধূলা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান এবং দলীয় অংশগ্রহণমূলক কাজকর্মে।

সহজপাঠ বিদ্যালয়ের ব্যতিক্রমধর্মী ও চমৎকার লক্ষ্য পূরণে যুক্ত আছে দেশের নানা সংস্কৃতি অঙ্গনের মানুষও। এমনি একজন হলেন কনক আদিত্য। গানের মানুষ হয়েও বিদ্যালয়ের সাথে কিভাবে যুক্ত হলেন এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘শিশু শিক্ষা বিষয়ে জানার আগ্রহই সহজপাঠে যুক্ত হওয়ার মূল কারণ। পুঁথিগত পরীক্ষানির্ভর পড়াশোনা কখনোই আমাকে টানেনি। স্কুলের কাজ হওয়া উচিৎ শিশুর জ্ঞানকাণ্ডের বৃদ্ধি করা, সবধরনের জ্ঞানের সাথে যোগাযোগ করিয়ে দেওয়া। দেশে এমন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের অভাব দৃশ্যমান। এমন চিন্তা থেকেই সহজপাঠের সাথে যুক্ত হওয়া।’

সহজপাঠের উদ্দেশ্য কী, এ প্রশ্নের জবাবে সংগঠন সহজ পাঠের সদস্য সচিব ও শিক্ষাকর্মী জনাব বেলাল সিদ্দিকী বলেন, ‘সহজপাঠ প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্য শিশু শিক্ষার প্রসার, শিশু শিক্ষার দৃষ্টান্ত তৈরি করা।’

আসলেই তাই, ঘুণেধরা এ শিক্ষাব্যবস্থায় সহজপাঠ এক অনন্য দৃষ্টান্ত বটে। নইলে, স্কুল কেমন লাগে প্রশ্নে সহজপাঠের প্রতিটি শিক্ষার্থী চোখ মুখে আনন্দের ঝলকানি নিয়ে বলতে পারে কি, ‘সহজপাঠ খুব ভালো লাগে, সহজপাঠ খুব ভালোবাসি।’

বিদ্যালয়ের প্রাত্যহিক সমাবেশ থেকে শুরু করে পাঠদান, উপাহার (বিদ্যালয় কর্তৃক সরবরাহকৃত খাবার খাওয়ার সময়), দলীয় কাজ সবকিছুতেই আনন্দ আর সৃজনশীলতার ছোঁয়া। সহজপাঠ সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হলে বিদ্যালয়ের পরামর্শক স্বেচ্ছাসেবী সুব্রত শুভ্র বলেন, ‘‘শিশুদের প্রতি ভালোবাসা থেকেই এমন উদ্যোগের সাথে যুক্ত হওয়া। এখানে সবাই শিশুদের যেকোন ধরনের ‘মানসিক সমর্থন’ দিতে সদাপ্রস্তুত। এখানে শিশুদের ওপর কোনকিছুই চাপিয়ে দেওয়া হয়না। শিশুর ও শিক্ষাকর্মীর পারস্পরিক সম্পর্ক ও সম্মানবোধের মধ্য দিয়ে শিশুর মানবিকতা ও মূল্যবোধ অক্ষুণ্ণ রেখে শিশুর সামূহিক বিকাশের পরিবেশ তৈরির কাজটা আমরা তথা সহজপাঠ করে যাচ্ছে।’’

গল্পের বই পড়ছে সহজপাঠের শিক্ষার্থীরা

সহজপাঠ বিদ্যালয়ের অভিভাবকরাও সহজপাঠ নিয়ে খুশি। অভিভাবক শিরীন আক্তার বিনুকে সহজপাঠ সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি বলেন, ‘এ বিদ্যালয়ে দুই বাচ্চাকে পড়ানোর মূল কারন, নির্ভার থাকা। বিদ্যালয়ের প্রতি সম্পুর্ণরূপে আস্থা রাখা যায়’

বর্তমানে বিদ্যালয়ে প্রাক-প্রাথমিক শ্রেণী থেকে দশম শ্রেণী পর্যন্ত পাঠদান করা হয়। বিদ্যালয়ে ২০০ জন শিক্ষার্থী এবং ২১ জন শিক্ষাকর্মী রয়েছে। ৭/১৭, ব্লক-বি, লালমাটিয়া,ঢাকায় অবস্থিত এ বিদ্যালয়টি।

‘আজকের শিশু আগামী দিনের ভবিষ্যত।’ তাই শিশুদের তাদের মতো বাড়তে দেওয়াই আমাদের কর্তব্য। কোনোকিছু চাপিয়ে দেওয়া নয়, তাদের বন্ধু হয়ে পাশে থাকাই সবচেয়ে বেশি জরুরি। বিদ্যালয় আর পরিবারের সম্মিলিত প্রয়াসই পারে শিশুর বিকাশকে আনন্দময় করতে। এক্ষেত্রে সহজপাঠ বিদ্যালয় হতে পারে সকলের জন্য আদর্শ। শিশুর শিক্ষাজীবন হোক আনন্দময়, পাঠ হোক সহজ। তাদের বিকাশ ঘটুক সামগ্রিকভাবে।

Related Articles

Adblock Detected

Please consider supporting us by disabling your ad blocker