জাতীয়হোমপেজ স্লাইড ছবি

নক্ষত্রের বিদায়

মাহমুদুর রহমান: বেশীদিন আগের কথা নয়। ঈদের নাটক হিসেবে খুঁজতাম একটা চরিত্রকে। চরিত্রের নাম জব্বার আলী। হুমায়ূন আহমেদের জনপ্রিয় নাটকের মাঝে জব্বার আলী জায়গা করে নিয়েছিল। সমসাময়িক বিষয় নিয়ে ছিল জব্বার আলীর নাটক। বিশেষত দুর্নীতি, ঋণ খেলাপি ইত্যাদি নানা বিষয় স্যাটায়ারের মাধ্যমে ফুটিয়ে তোলা হয়েছিল। কে ছিল জব্বার আলী? আর কেউ নয়। আমজাদ হোসেন।

চলচ্চিত্র জগতে আমজাদ হোসেন পরিচিত নাম। এক সময়ে কাঁপিয়েছেন বাংলাদেশের চলচ্চিত্র জগত। তারপর আড়ালে চলে গিয়েছিলেন। জব্বার আলীর সময়ে কিছুটা সামনে এগিয়ে এলেও তারপর আবার পড়ে যান পাদপ্রদীপের আড়ালে।
১৯৪২ সালে জামালপুর জেলায় জন্ম আমজাদ হোসেনের। আজকে আমরা তাঁকে চলচ্চিত্র নির্মাতা এবং অভিনেতা হিসেবে জানলেও তাঁর প্রতিভার প্রথম বিকাশ দেখা যায় সাহিত্যে। বিখ্যাত বাংলা সাহিত্য পত্রিকা ‘দেশ’-এ তাঁর প্রথম কবিতা ছাপা হয়। এরপর তিনি আরও গল্প, উপন্যাস রচনা করেন।

চলচ্চিত্রে তাঁর আগমন ১৯৬৩ সালে, ‘তোমার আমার’ চলচ্চিত্রের মধ্য দিয়ে। দুই বছর পর পরিচালক হিসেবে প্রথম সিনেমা করেন। নাম আগুন নিয়ে খেলা। এরপর তিনি নির্মাণ করেন আরও ১৪ টি চলচ্চিত্র। এর মাঝে ‘ভাত দে’, ‘নয়নমণি’, ‘দুই ভাই’, ‘গোলাপি এখন ট্রেনে’ উল্লেখ্য। চলচ্চিত্র নির্মাণের পাশাপাশি তিনি চলচ্চিত্রে অভিনয়ও করেন।
১৯৮৪ সালে শাবানা, আলমগির অভিনিত, আমজাদ হোসেন নির্মিত ‘ভাত দে’ সিনেমাটি বহুল প্রশংসিত হয়। সিনেমার চিত্রনাট্য, সংলাপ এবং পরিচালনা আমজাদ হোসেনের। প্রান্তিক বাংলার মানুষের নির্মম বাস্তবতা তুলে ধরা হয়েছে এ চলচ্চিত্রে। ‘ভাত দে’ সিনেমার জন্য আমজাদ হোসেন জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার লাভ করেন।

চলচ্চিত্র নির্মাণে তিনি প্রশংসিত হয়েছেন তাঁর চলচ্চিত্রের বিষয়বস্তুর জন্য। মূলধারা থেকে বেরিয়ে তিনি নির্মাণ করেছেন অসাধারণ কিছু সিনেমা যা বাংলা সিনেমার ইতিহাসে আজও জ্বলজ্বল করে। কেবল নির্মাণ এবং অভিনয়ই নয়। সেই সঙ্গে তিনি পেশাদার চিত্রনাট্য রচয়িতা হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন। জহির রায়হানের ‘বেহুলা’, ‘আনোয়ারা’ চলচ্চিত্রের সংলাপ, নিজের পরিচালিত অনেক সিনেমার চিত্রনাট্য তাঁর নিজের লেখা।

আমজাদ হোসেন ছিলেন একজন প্রতিবাদী শিল্পী। শিল্পের মাধ্যমে তিনি সমাজের নানা ভুলভ্রান্তির বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করেছেন। ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান, মুক্তিযুদ্ধে তাঁর সক্রিয় অংশগ্রহণ ছিল। পরবর্তীতে তিনি শিল্পকে হাতিয়ার করেছিলেন। চলচ্চিত্রের পাশাপাশি গল্প, উপন্যাস লিখেছেন। মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে তাঁর বেশকিছু লেখা রয়েছে। তাঁর লেখা গল্প থেকেই তৌকির আহমেদ নির্মাণ করেন ‘জয়যাত্রা’। চলচ্চিত্র পরবর্তী সময়ে টেলিভিশন নাটকেও তিনি কৃতিত্বের পরিচয় দেন।

কর্মের স্বীকৃতি হিসেবে তিনি নানা পুরস্কার ও সম্মানে ভূষিত হয়েছেন। জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন ১২ বার, বাচসাস পেয়েছেন ৬ বার। শিল্পকলায় অবদানের জন্য ১৯৯৩ সালে তিনি লাভ করেন একুশে পদক।
এই কিংবদন্তী শিল্পী  ১৪ ডিসেম্বর ২০১৮, ব্যাংককে বামরুনগ্রাদ হাসপাতালে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। মস্তিষ্কের রক্তক্ষরণে আক্রান্ত হয়ে তিনি ১৮ নভেম্বর থেকে চিকিৎসাধীন ছিলেন।  স্বাধীনতার ৪৭ বছরে বুদ্ধিজীবী দিবসে আমরা আরেকজন নক্ষত্রকে হারালাম।

Related Articles

Adblock Detected

Please consider supporting us by disabling your ad blocker