জাতীয়হোমপেজ স্লাইড ছবি

নিরুদ্দেশ যাত্রা

মাহমুদুর রহমান: আমাদের সবারই কোন গন্তব্য থাকে, থাকে কোন ঠিকানা। নাকি যার ঠিকানা থাকে, তারই গন্তব্য থাকে? গল্পের শুরু সজীবকে দিয়ে। সজীব এবং তার পরিবারকে আবর্তন করেই এগিয়েছে গল্প। এমন একটি পরিবারের গল্প যার পূর্বপুরুষ এই ভূমিতে এসেছিল দেশভাগের সময়। তারপর বহুদিন এখানে বসবাস। সজীবের বাবা ভূমি অফিসে কাজ করেছেন আজীবন, কিন্তু নিজের ভূমির ব্যবস্থা করতে পারেননি। তার পুত্র হাসিব এই দেশের জন্য মুক্তিযুদ্ধে গিয়েছিল। অথচ রাজীবের কখনও কখনও মনে হয়, এই দেশটা আসলে তাদের না। তাহলে কি রাজীব এই ভূমিকে আপন করে নিতে পারেনি, নাকি এই ভূখণ্ড আর তার মানুষেরা একটু ‘উদ্বাস্তু’ পরিবারকে আপন করে নেয় নি?

এই প্রশ্নের উত্তর পেতে হলে বেশ কিছু জটিল সমীকরণের সমাধান করতে হবে। আমাদের গল্প সেদিক দিয়ে যায়নি। কিছু কিছু গল্প একটা সময়ের কথা বলে, সেই সময়ের মানুষদের কথা বলে। ‘নিরুদ্দেশ যাত্রা’-র গল্পটাও তেমনই।

সজীব যখন কেবল ক্লাস নাইনের ছাত্র, তখন এই দেশে ‘সামরিক শাসন’ জারি হয়। জেনারেল এরশাদ ক্ষমতা দখল করেন। এ খবর সজীব জানতে পারে রেডিওতে। কিন্তু মানিকগঞ্জের মতো এক মহকুমা শহরে এ নিয়ে খুব বেশি হইচই হওয়ার কথা না। হয়ও নি। কিন্তু সজীব এবং তার পরিবার একদিন বুঝেছিল সামরিক শাসন কি? সময়ের সাথে গিয়ে তারা পড়েছিল এর কেন্দ্রে।

‘নিরুদ্দেশ যাত্রা’ সজীবের কৈশোরের গল্প থেকে শুরু হয়। যে সময়ে একটা ছেলে বাস করে ভাঙা গড়ার মাঝে। শৈশব সীমান্তে তখন সে পৃথিবীকে আবিষ্কার করতে শুরু করে। কঠোরতা আসতে শুরু করলেও কোমল একটা ছাপ থেকে যায়। আর সজীবের মতো স্বাপ্নিকের থাকে অন্য এক জগত। যেখানে তার ভাবনারা বিকশিত হয়। তারপর কৈশোর উৎরে যখন সে যৌবনে পা রাখে, এই দেশে সেটা এক উত্তাল সময়।

‘স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলন’-এই উপন্যাসের সময়কাল। সজীবরা যখন যুবক তখন এই আন্দোলন বেগবান হয়। উপন্যাসে উঠে এসেছে সেই আন্দোলনের কথা। গল্পের মাঝেই এসেছে সে সময়ের রাজনৈতিক পরিস্থিতি আর মানুষের সামাজিক পরিবর্তন। সজীব, অপু, অমিত, নীলু, মামুনরা সেই সময়ের প্রতিনিধি। সময়টা বাংলাদেশের এক ভাঙনকাল, কিংবা গঠনকাল। আর সেই সময়ের মানুষেরা যেন যুগ সন্ধিক্ষণের মানুষ।

নব্বইয়ের শুরুতে যারা যুবক, যেমন সজীব অমিত অপু নিলু, তারা সামরিক শাসনের কথা জেনেছিল রেডিও থেকে। তারপর নব্বইয়ের পর সময় গড়ানোর সাথে সাথে তারা রঙিন টেলিভিশনের যুগে প্রবেশ করে প্রৌঢ়ত্বে এসে ফেসবুকের নীল জগতেরও সাক্ষী।

লেখক আহমাদ মোস্তফা কামাল সেই পুরো সময়ের গল্প বলেছেন ‘নিরুদ্দেশ যাত্রা’ উপন্যাসে। এখানে যেমন আছে একটি সাধারণ সুখী পরিবারের গল্প, তেমনি আছে উত্তাল সময়ে ছাত্রদের ফুঁসে ওঠার গল্প। একটা আশ্রয়হীন পরিবারের মানুষগুলোর ধীরে ধীরে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার গল্প। অতীতের রক্তক্ষরণের গল্প। মামুন আর মুন্নির প্রেমের গল্প, হয়ত নাটকীয়, কিন্তু সেই জেনারেলের আমলে এমন ঘটনা ছিল রুঢ় বাস্তব। লেখক সেই বাস্তবের কাল্পনিক রুপায়ন করেছেন। শেষে নিয়ে গেছেন একটা পরিণতির দিকে।

কিন্তু সব গল্প কি পরিণতি পায়? কিংবা সব মানুষ কি গন্তব্যে ফেরে? সজীব তার গন্তব্য খুঁজে পায়নি। আজন্ম স্বাপ্নিক মানুষটা হয়ত জীবনভর বুঝতেই পারেনি সে কি খুঁজছে। তাই শেষ বেলায় বন্ধুকে কবরে শুইয়ে সে নিজের গন্তব্যের খোঁজে বের হয়, যে গন্তব্য তার অজানা।

Related Articles

Adblock Detected

Please consider supporting us by disabling your ad blocker