জাতীয়হোমপেজ স্লাইড ছবি

স্বপ্নজয়ী পাঁচ নারীর গল্প

বাশার আল আসাদ:

“বিশ্বে যা কিছু মহান সৃষ্টি চিরকল্যাণকর, অর্ধেক তার করিয়াছে নারী, অর্ধেক তার নর।”

সাম্যের কবি নজরুল ঠিকই বলেছেন। বিশ্বের অর্ধেক জনসংখা যেখানে নারী সেখানে নারীকে বাদ দিয়ে এই পৃথিবীর সামগ্রিক উন্নয়ন কখনোই সম্ভব নয়। আমাদের দেশের ক্ষেত্রেও কথাটি পুরোপুরি সত্য। তবে অপ্রিয় সত্য হচ্ছে, বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক উন্নতিতে পুরুষের তুলনায় নারীর অংশগ্রহণ সবসময়েই কম। তবে আশার কথা এই যে, নানা প্রতিকূলতা পেরিয়ে অতীতের যেকোনো সময়ের তুলনায় কর্ম ক্ষেত্রে নারীর অংশগ্রহণ এবং অবদান দিন দিন বাড়ছে। আজ নারী ঘরের বাইরে বেরোচ্ছে, নানা প্রতিযোগিতামূলক কাজে অংশ নিচ্ছে পুরুষের পাশাপাশি সমান তালেই। নারী আজ শুধু চাকরিই নয়, উদ্যোগী হচ্ছে নানা স্বাধীন ব্যবসায়। নারীদের লড়াই প্রতিদিনের। লড়াইয়ে হেরে না গিয়ে জয়ী হন যাঁরা, তাঁরাই অনুপ্রেরণা জোগান অন্যদের। নারী দিবসের প্রাক্কালে আজ হাজির হয়েছি বাংলাদেশের পাঁচ জন ভিন্ন পেশার স্বনামধন্য এবং সফল নারীর গল্প নিয়ে। তারা শত বাঁধাকে জয় করে আজ নিজের জায়গায় প্রতিষ্ঠিত হয়ে হাজারো নারীদের প্রেরণা হয়ে কাজ করছেন প্রতিনিয়ত।

ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী

ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী তিনি বাংলাদেশের ইতিহাসের প্রথম সংসদের নারী স্পিকার। নবম জাতীয় সংসদের প্রথম নারী স্পিকার হিসেবে ৩০ এপ্রিল, ২০১৩ তারিখে নির্বাচিত হন। ৪৬ বছর বয়সে তিনি সর্বকনিষ্ঠ স্পিকাররূপে সাবেক স্পিকার ও বর্তমান রাষ্ট্রপতি এডভোকেট আব্দুল হামিদের স্থলাভিষিক্ত হন। এর পূর্বে তিনি বাংলাদেশ সরকারের মহিলা ও শিশু বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ছিলেন। ২০১৮ সালের ৩০ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন, ২০১৮ এ তিনি সংসদ সদস্য নির্বাচিত হোন এবং ২০১৯ সালের ৩ জানুয়ারী পুনরায় জাতীয়সংসদের স্পিকার হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। শিরীন শারমিন চৌধুরী ১৯৬৬ সালের ৬ অক্টোবর ঢাকায় জন্মগ্রহণ করেন। নোয়াখালী জেলার চাটখিলের সিএসপি অফিসার ও বাংলাদেশ সরকারের সাবেক সচিব রফিকুল্লাহ চৌধুরীর কন্যা তিনি। আর মা ছিলেন ঢাকা কলেজের অধ্যক্ষ ও বাংলাদেশ পাবলিক সার্ভিস কমিশনের সদস্য প্রফেসর নাইয়ার সুলতানা। ১৯৮৯ সালে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এলএলবি ও ১৯৯০ সালে একই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এলএলএম-এ ফার্স্ট ক্লাস ফার্স্ট হন। শিরীন শারমিন চৌধুরী একজন কমনওয়েলথ স্কলার। ২০০০ সালে তিনি যুক্তরাজ্যের এসেক্স বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আইনে পিএইচডি লাভ করেন। এলএলএম পাশ করার পর তিনি ১৯৯২ সালেই বাংলাদেশ বার কাউন্সিলে তালিকাভুক্ত আইনজীবী হিসেবে যোগদান করেন। বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টে তাঁর ১৫ বছর এডভোকেট হিসেবে কাজ করার অভিজ্ঞতা রয়েছে।

রুবাইয়াত হোসেন

বাংলাদেশি চলচ্চিত্রের বর্তমান সময়ের একজন মেধাবী নারী চলচ্চিত্র নির্মাতা রুবাইয়াত হোসেন। মুক্তিযুদ্ধকেন্দ্রিক চলচ্চিত্র মেহেরজান নির্মানের মাধ্যমে তিনি চলচ্চিত্র নির্মাতা হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন। এই চলচ্চিত্র তার জন্য একই সাথে দেশের মাটিতে প্রচন্ড সমালোচনা এবং বিদেশের মাটিতে প্রভূত সম্মাননা বয়ে আনে। ‘মেহেরজান’ ও ‘আন্ডার কনস্ট্রাকশন’ খ্যাত চলচ্চিত্র নির্মাতা রুবাইয়াত হোসেনের নতুন চমক ‘মেড ইন বাংলাদেশ’। সত্যজিৎ রায় এবং ঋত্বিক ঘটকের  রচনায় অনুপ্রাণিত হয়ে রুবাইয়াত হোসেন ২০০২ সালে নিউইয়র্ক ফিল্ম অ্যাকাডেমিতে চলচ্চিত্রের দিক নির্দেশনায় ডিপ্লোমা সম্পন্ন করেন। রুবাইয়াত হোসেন বাংলাদেশে আইনী নারীর অধিকার এনজিও  আইন ও সালিশ কেন্দ্র ও নারী পক্ষের জন্য কাজ করেছেন। রুবাইয়াত হোসেন আন্তর্জাতিকভাবে প্রশংসিত বাংলাদেশী পরিচালক, লেখক, প্রযোজক এবং গবেষক।

ফারজানা চৌধুরী

বাংলাদেশের নারীরা আজ পুরুষদের সকল কিছুর পাশাপাশি ব্যবসার ক্ষেত্রেও সমান তালে এগিয়ে চলেছে। এমনই একজন সফল নারী উদ্যোক্তা ফারজানা চেীধুরী। গ্রীন ডেল্টা ইনস্যুরেন্স কোম্পানি লিমিটেডের নতুন ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) হিসেবে একজন সফল নারী হিসাবে কাজ করছেন ফারজানা চৌধুরী। তিনি বিমা পেশায় ১৫ বছরেরও বেশি সময় কাজের অভিজ্ঞতাসম্পন্ন।  ফারজানা আগে একই প্রতিষ্ঠানের অতিরিক্ত এমডি ও গ্রুপ সিএফও হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন। এ ছাড়া তিনি কোম্পানির পর্ষদ সদস্য এবং পর্ষদের ভাইস চেয়ারম্যান হিসেবেও কাজ করেছেন।  ফারজানা চৌধুরী অস্ট্রেলিয়ার মনাশ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ব্যবসা প্রশাসনে মাস্টার ডিগ্রি অর্জন করেছেন। কর্মজীবনে তিনি ব্র্যাক ব্যাংকে সাত বছরেরও বেশি সময় ধরে এসএমই ব্যাংকিংয়ের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। এ ছাড়া তিনি ব্র্যাকের গ্রামীণ উন্নয়ন কার্যক্রমে পাঁচ বছর আঞ্চলিক ব্যবস্থাপকের দায়িত্ব পালন করেন। ফারজানা চৌধুরী যুক্তরাজ্যের চার্টার্ড ইনস্যুরেন্স ইনস্টিটিউটের (সিআইআই) শুভেচ্ছা দূত নির্বাচিত হয়েছেন।

সুবর্ণা মুস্তাফা

সুবর্ণা মুস্তাফা একজন সফল বাংলাদেশী অভিনেত্রী ও প্রযোজক। তিনি প্রখ্যাত অভিনেতা গোলাম মুস্তাফার কন্যা এবং ক্যামেলিয়া মোস্তফার বোন। সুবর্ণা অভিনেতা হুমায়ুন ফরীদির সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। দীর্ঘ ২২ বছর সংসার করার পর ২০০৮ সালে ফরীদির সাথে তার বিবাহ বিচ্ছেদ হয়। পরবর্তীতে তিনি বদরুল আনাম সৌদকে বিয়েকরেন। ১৯৮০-এর দশকে তিনি বাংলাদেশের সবচেয়ে জনপ্রিয়টিভি অভিনেত্রী হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন। বিশেষ করে আফজাল হোসেন এবং হুমায়ুন ফরীদির সাথে তার জুটি ব্যাপক দর্শক সমাদর লাভ করে। এছাড়া তিনি হুমায়ূন আহমেদের লেখা কোথাও কেউ নেই ও আজ রবিবার টেলিভিশন ধারাবাহিকে অভিনয় করে খ্যাতি অর্জন করেন। টেলিভিশন নাটকের পাশাপাশি তিনি ২২ বছর মঞ্চে অভিনয় করেন। সুবর্ণা ১৯৮৩ সালে নতুন বউ চলচ্চিত্রে অভিনয়ের জন্য শ্রেষ্ঠ পার্শ্ব অভিনেত্রী বিভাগে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার অর্জন করেন। অভিনয়ের স্বীকৃতি হিসেবে বাংলাদেশ সরকার তাকে দেশের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মাননা একুশে পদকে ভূষিত করে। এছাড়া তিনি একাদশ সংসদে সংরক্ষিত নারী আসন থেকে সংসদ সদস্য হয়েছেন।

রুমানা আহমেদ

রুমানা আহমেদ বাংলাদেশ প্রমিলা ক্রিকেট দলের একজন জনপ্রিয় অন্যতম সেরা খেলোয়ার। তিনি ১৯৯১ খুলনা জেলায় জন্মগ্রহণ করেন। ডানহাতি ব্যাটসম্যান এবং ডানহাতি লেগ ব্রেক বোলার তিনি। রুমানা বাংলাদেশের সেরা মহিলা অল-রাউন্ডারদের মধ্যে অন্যতম। রুমানার একদিনের আন্তর্জাতিকে অভিষেক ঘটে ২০১২ সালের ২৫ আগস্টে আয়ারল্যান্ড মহিলা ক্রিকেট দলের বিরুদ্ধে। বাংলাদেশের মহিলা ক্রিকেটের ইতিহাসে প্রথম ওডিআই হ্যাট্রিক করার বিরল কীর্তিগাথার রচিয়তা তিনি। তার সেরা বোলিং পরিসংখ্যান হচ্ছে ভারতের বিপক্ষে ২০ রান দিয়ে ৪ উইকেট লাভ। তিনি বাংলাদেশ প্রমিলা ক্রিকেট দলের অধিনায়কত্ব করেছেন। রুমানা ব্যাট এবং বলে উভয়ই ভাল দক্ষতার সাথে বাংলাদেশ প্রমিলা ক্রিকেট টিমকে তার খেলা উপহার দিয়ে যাচ্ছেন।

Related Articles

Adblock Detected

Please consider supporting us by disabling your ad blocker