জাতীয়হোমপেজ স্লাইড ছবি

ডাকসু বৃত্তান্ত

মিজানুর রহমান টিপু:

     যেভাবে প্রতিষ্ঠিত হয় ডাকসু

১৯২২ সালের ১লা ডিসেম্বর কার্জন হলে অনুষ্ঠিত শিক্ষকদের একটি সভায় ১৯২৩-২৪ শিক্ষাবর্ষে ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র সংসদ’ নামে একটি ছাত্র সংসদ গঠনের সিদ্ধান্ত হয়। ১৯২৩ সালের ১৯শে জানুয়ারি বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন নির্বাহী পরিষদ পূর্বোল্লিখিত শিক্ষক সভার সিদ্ধান্তকে অনুমোদন দেয়। ১৯২৫ সালের ৩০ অক্টোবর সংসদের সাধারণ সভায় খসড়া গঠনতন্ত্র অনুমোদন করা হয়। পরবর্তীতে বিশ্ববিদ্যালয়ের নির্বাহী পরিষদ অনুমোদন করলে তা কার্যকর হয়। প্রথমবার ১৯২৪-২৫ সালে সম্পাদক ছিলেন যোগেন্দ্রনাথ সেনগুপ্ত।

পরবর্তীতে ১৯৫৩-৫৪ শিক্ষাবর্ষে গঠনতন্ত্র সংশোধনের মাধ্যমে পূর্বনাম পরিবর্তন করে বর্তমান নাম ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ’ গ্রহণ করা হয়। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর ১৯৭২ সালের ডাকসুর সহসভাপতি হিসেবে নির্বাচিত হন বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়ন থেকে মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম এবং সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন মাহবুবুর জামান। সর্বশেষ ১৯৯০-৯১ সেশনের জন্য সহসভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক পদে যথাক্রমে নির্বাচিত হন ছাত্রদলের আমানউল্লাহ আমান ও খায়রুল কবির খোকন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের ১৯৯০ পর্যন্ত ৩৬ বার নির্বাচন হয়েছে। দীর্ঘ ২৮ বছর পরে ২০১৯ সালে অনুষ্ঠিত হলো ৩৭ তম ডাকসু নির্বাচন। এবারের নির্বাচনে নুরুল হক নুর বাংলাদেশ সাধারণ ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদের প্যানেলে ভিপি এবং গোলাম রাব্বানী বাংলাদেশ ছাত্রলীগের প্যানেলে জিএস নির্বাচিত হন।

জাতীয় রাজনীতিতে ডাকসুর ভূমিকা

শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ছাত্র সংসদকে বলা হয় নেতৃত্ব তৈরির কারখানা। এসব ছাত্র সংসদে যারা নেতৃত্ব দিয়েছেন, পরবর্তী সময়ে দেশ ও জাতিরও নেতৃত্ব দিয়েছেন তাদের অনেকেই। রাজনীতির উজ্জ্বল তারকা হিসেবে গড়ে ওঠার প্রথম সোপানও ছিল এসব ছাত্র সংসদ। এ ক্ষেত্রে দেশের সবচেয়ে প্রাচীন ও ঐতিহ্যবাহী ছাত্র সংসদ হিসেবে বিবেচিত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) ভূমিকা অগ্রগণ্য। ডাকসুর নির্বাচিত নেতাদের অনেকেই পরে ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে বাঙালির স্বাধিকার আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধ এবং জাতীয় নেতৃত্বে অসামান্য অবদান রেখেছেন। অনেকে গণতন্ত্র ও জনগণের অধিকার রক্ষার আন্দোলনসহ স্বৈরশাসনবিরোধী আন্দোলনের নেতৃত্বেও ছিলেন। তাদের অনেকেই এখনও জাতীয় রাজনীতিতে নিজ নিজ পরিচয়ে উজ্জ্বল তারকা হয়ে ভূমিকা রেখে চলেছেন দেশ ও জাতির কল্যাণে।

ডাকসুর ইতিহাসের যত ডাকসাইটে নেতা

তোফায়েল আহমেদ: ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানের মহানায়ক হিসেবে খ্যাত ১৯৬৮-৬৯ মেয়াদে ডাকসুর সহ-সভাপতি (ভিপি) তোফায়েল আহমেদ আজকের রাজনীতির অন্যতম উজ্জ্বল এক তারকা।

তোফায়েল আহমেদ ১৯৬৬-৬৭ মেয়াদে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইকবাল হলের (বর্তমানে সার্জেন্ট জহুরুল হক হল) নির্বাচিত ভিপি ছিলেন। এরপর ডাকসুর ভিপি নির্বাচিত হয়ে সর্বদলীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের আহ্বায়কের দায়িত্ব পালন করেন। সে সময় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাঙালির মুক্তির সনদ হিসেবে বিবেচিত ঐতিহাসিক ছয় দফা দাবিতে আন্দোলন গড়ে তুললে পাকিস্তানি সামরিক জান্তা আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা দিয়ে ক্যান্টনমেন্টে বন্দি করে রেখেছিল তাকে। অন্যদিকে বঙ্গবন্ধুর মুক্তিসহ ছয় দফা এবং ছাত্রদের ১১ দফা দাবিতে পাকিস্তানি সামরিক শাসক আইয়ুব খানবিরোধী গণজাগরণ ও ছাত্র আন্দোলন গড়ে উঠলে তোফায়েল আহমেদ এই আন্দোলনের নেতৃত্ব দেন। সেই ছাত্র ও গণআন্দোলনই ১৯৬৯ সালের ২৪ জানুয়ারি গণঅভ্যুত্থানে রূপ নেয়। যার ফলে বঙ্গবন্ধুর মুক্তি এবং আইয়ুব খানের পতন ঘটে। স্বৈরশাসনবিরোধী গণঅভ্যুত্থানসহ দেশের সব গণতান্ত্রিক ও অধিকার আদায়ের আন্দোলনেও ভূমিকা রেখেছেন তিনি।

মতিয়া চৌধুরী: দেশের আরেক বিশিষ্ট রাজনীতিবিদ মতিয়া চৌধুরী ডাকসুর সাধারণ সম্পাদক (জিএস) হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন ১৯৬৩-৬৪ মেয়াদে। গত কয়েক মেয়াদ ধরেই আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করে আসছেন তিনি। ‘অগ্নিকন্যা’ নামে খ্যাত মতিয়া চৌধুরীর রাজনৈতিক জীবন শুরু হয় বামপন্থি রাজনীতি দিয়ে।

১৯৬৫ সালে ছাত্র ইউনিয়নের সভাপতি নির্বাচিত হন তিনি। ১৯৬৭ সালে পূর্ব পাকিস্তান ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টিতে (ন্যাপ) যোগ দিয়ে দলটির কার্যকরী কমিটির সদস্য হন। ১৯৭০ ও ১৯৭১-এ তিনি দেশের স্বাধীনতা সংগ্রাম, প্রচারণা, তদবির এবং আহতদের শুশ্রূষায় সক্রিয় অংশগ্রহণকারী ছিলেন। পরে আওয়ামী লীগে যোগ দিয়ে সাংগঠনিক সম্পাদকও হয়েছিলেন ৭৭ বছর বয়সী এই প্রবীণ রাজনীতিবিদ।

রাশেদ খান মেনন: বামপন্থি রাজনীতিবিদ রাশেদ খান মেনন ডাকসুর ভিপি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন ১৯৬৩-৬৪ মেয়াদে। বর্তমানে বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি মেনন।

ছাত্রজীবন থেকেই রাজনীতিতে সক্রিয়ভাবে অংশ নিয়ে ছাত্র ইউনিয়নের সভাপতি ছিলেন তিনি। ষাটের দশকে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের স্বাধিকার আদায়, সামরিক আইনবিরোধী আন্দোলন, বাষট্টির শিক্ষা আন্দোলন, ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান এবং একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে সক্রিয়ভাবে অংশ নিয়েছেন। নব্বইয়ে সামরিক স্বৈরশাসকবিরোধী আন্দোলনে ৫ দলের নেতা হিসেবে নেতৃত্ব দেন। পরে ১৯৯১ সালের নির্বাচনে প্রথমবারের মতো এমপি হন। ২০০৫ সালে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের অসাম্প্রদায়িক রাজনৈতিক জোট ১৪ দল গড়ে তোলায় ভূমিকা রাখেন। ২০০৮-এর নির্বাচনে জিতে শিক্ষা মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন ৭৬ বছর বয়সী এই বর্ষীয়ান রাজনীতিবিদ।

মাহমুদুর রহমান মান্না: মাহমুদুর রহমান মান্না ১৯৭৯ সালে জাসদ ছাত্রলীগ থেকে এবং ১৯৮০ সালে বাসদ থেকে নির্বাচন করে ডাকসুর ভিপি নির্বাচিত হয়েছিলেন। এর আগে ১৯৭২ সালে জাসদ ছাত্রলীগ থেকে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র সংসদের (চাকসু) জিএসও নির্বাচিত হন। বর্তমানে নাগরিক ঐক্যের আহ্বায়ক তিনি।

 

Related Articles

Adblock Detected

Please consider supporting us by disabling your ad blocker