জাতীয়হোমপেজ স্লাইড ছবি

পলিথিন থেকে ব্যবহারযোগ্য জ্বালানি তেল

মঞ্জুর দেওয়ান: বর্তমান পৃথিবী যতগুলো সমস্যার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে তার মধ্যে পলিথিন ও প্লাস্টিক জাতীয় পদার্থ তার মধ্যে অন্যতম। অপচনশীল এই জিনিসটি নিয়ে সমস্যার যেন অন্ত নেই। সহজে পচেও না, আবার দাহ করে ফেললেও পরিবেশের ক্ষতি হয়। দূষিত হয় স্বাভাবিক পরিবেশ। যার ভুক্তভোগী হয় মানুষ। তারপরও বলার মতো আর কোন বিকল্প না থাকায় এই পলিথিনের উপর নির্ভর করেই চলছে বর্তমান বাজারের অধিকাংশ দোকানী থেকে শুরু করে ভোক্তারা। গলায় কাটা আটকে থাকার মতো এক অবস্থার মধ্যে রয়েছে পলিথিন। ’অভিশপ্ত’ এই বস্তুটি নিয়ে যখন পরিবেশবাদীরা অতিষ্ট; এমন সময় পলিথিন দিয়ে আশ্চর্যজনক এক সফলতা দেখিয়েছেন বাংলাদেশি যুবক। পলিথিন পুড়ালে যেখানে পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট হয় সেখানে পলিথিন পুড়ানোকে আশীর্বাদ স্বরূপ জনসম্মুখে নিয়ে এসেছে। ফেলে দেয়া পলিথিন থেকে বানিয়েছেন ব্যবহারযোগ্য জ্বালানি তেল। যে তেলে দিব্যি চলছে মোটরসাইকেল ! আর এই অভাবনীয় সত্যির আবিষ্কারক জামালপুরের ছেলে তৌহিদুল ইসলাম। ফেলে দেয়া পলিথিন থেকে কিভাবে মোটর গাড়ির তেল আসলো তার নেপথ্য গল্প জানবো এই আয়োজনে।

বাংলাদেশের আনাচাকানাচে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে অনেক অসংখ্য মেধা। যাঁরা একটু সহযোগিতা কিংবা সুদৃষ্টি পেলেই এনে দিতে পারেন বড় কোনো সাফল্য। তেমনই এক মেধার নাম তৌহিদুল। যিনি পরিত্যক্ত পলিথিন থেকে জ্বালানি তেল বানিয়ে চমকে দিয়েছেন পুরো বিশ্বকে। গল্পের শুরুটা হয়েছিলো তৌহিদুলের স্কুল জীবন থেকে। ক্লাস ফোরে পড়ার সময় ফুলের বাগান ছিলো তৌহিদুলের। ফেলে দেয়া পলিথিনের কারণে গাছ নষ্ট হতো বাগানের। পলিথিন থেকে গাছ রক্ষার কথা ভাবতে থাকেন তিনি। যেহেতু পলিথিন পুড়ালে পরিবেশের ক্ষতি হবে; তাই শুধু না পুড়িয়ে কিভাবে পলিথিন কাজে লাগানো যায় সে কথা ভাবতে থাকেন তিনি। ছোট্ট বয়সে চিন্তাশক্তিকে বাস্তবে রূপ না দিতে পারলেও বড় হয়ে দিয়েছেন ঠিকই। ক্লাসে রসায়ন বিদ্যা পড়ার সময় পলিথিনকে কাজে লাগানোর চিন্তা মাথায় আসে তৌহিদের। পলিথিন থেকে হাই টেমপারেট হাইড্রোকার্বন আর জ্বালানি তেল থেকে লো টেমপারেট হাইড্রোকার্বন নামক এক পদার্থের সন্ধান পান। একটি কার্বনের চেইন আরেকটি সরল একটি গঠন জেনে এগুতে থাকেন তৌহিদ। কলেজের প্রভাষক একরামুজ্জামান তৌহিদকে দিকনির্দেশনার পাশাপাশি সমর্থন দিয়ে যেতে থাকেন।

এরপরই পরীক্ষামূলকভাবে তেল বের করার মিশন চলে। বর্তমানে তৌহিদ বের করেছেন, ফেলে দেয়া পলিথিন থেকে তিন ধরনের পদার্থ নি:সরণ হয়। জ্বালানি তেলের পাশাপাশি মিথেন গ্যাস ও ছাপাকাজের কালি তৈরি হচ্ছে। তৌহিদের মতে ১০০ কেজি পলিথিন থেকে ৭০ কেজি জ্বালানি তেল, ১০ কেজি মিথেন গ্যাস ও ২০ কেজি ছাপাকাজের জন্য ব্যবহৃত কালি তৈরি করা সম্ভব হচ্ছে। সবচেয়ে মজার ব্যাপার হলো, এই তেলের খরচ একেবারেই কম। বলতে গেলে পানির চেয়েও কম মূল্যে তৈরি করা যাবে এই তেল। এক লিটার পানির দাম যেখানে ২৫ থেকে ৩০ টাকা সেখানে মাত্র ১৭ টাকা খরচে ১ কেজি জ্বালানি তেল পাওয়া সম্ভব হচ্ছে তৌহিদের আবিষ্কারের ফলে।

অভাবনীয় এই সফলতার মূল্যও পেয়েছেন তৌহিদ। বাংলাদেশ সরকারের এটুআই প্রোগ্রামের দেশসেরা উদ্ভাবকের পুরস্কার পেয়েছেন। সরকারি অনুদানে জেলা শহরের পৌর বর্জ্য শোধনাগারে স্বল্প পরিসরে পলিথিন থেকে তেল উৎপাদনের প্ল্যান্ট বসিয়েছেন। এই প্ল্যান্ট থেকে দৈনিক ১০৫ লিটার করে তেল উৎপাদন সম্ভব হচ্ছে। পরিপূর্ণভাবে চালু হলে এ প্ল্যান্ট থেকে তিন ধাপে তরল, গ্যাস ও কার্বন সংগ্রহ করা সম্ভব হবে৷ তরুণ এই উদ্ভাবকের ইচ্ছা ৫ হাজার লিটার ধারণক্ষমতা সম্পন্ন একটি প্ল্যান্ট স্থাপন করা৷ তাপমাত্রা কমালে বাড়ালে জ্বালানি তেলের ভিন্নতা দেখা দেয়। নির্দিষ্ট একটা তাপমাত্রায় হিট করার পর বের হয় পেট্রোল। তাপ বাড়ালে ডিজেল কিংবা কেরোসিন পাওয়া যায়।

যেভাবে পলিথিন থেকে তেল হয়

প্রথমে চেম্বারে পলিথিন দিতে হয়। চেম্বারে পলিথিন ঢুকানোর পর এমন ভাবে এর মুখ আটকে দেয়া হয়, যাতে বাইরে থেকে অক্সিজেন ঢুকতে না পারে। যেন কার্বন ডাই-অক্সাইড বা কার্বন মনো-অক্সাইড তৈরি করতে না পারে। এরপর ৩৫০ থেকে ৭৫০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় উত্তপ্ত করা হয়। ৭৫০ ডিগ্রি সেলসিয়াসে যখন উত্তপ্ত করা হয়, তখন পলিথিনের যে কার্বন ডাই-অক্সাইড চেইন আছে সেটা ভেঙে গিয়ে প্রচণ্ড চাপের বাষ্প হয়ে নল দিয়ে বের হয়। এরপর ঠাণ্ডা তরল হয়ে বোতলে জমা হয়। আর এখানে যে মিথেন গাস তৈরি হয় তা আবার এই জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার হয়। তরল জ্বালানি বের করে আনার পর সেখানে অনেক মুক্ত কার্বন তৈরি হয়, যা পড়ে ছাপার কাজে কালি হিসেবে ব্যবহার করা যায়। এরই মধ্যে বেশ কয়েকজন আগ্রহ প্রকাশ করেছেন বাণিজ্যিক ভাবে এই জ্বালানি তেল উৎপন্ন করার। তবে এই তরুণ উদ্ভাবক কেবল অর্থ উপার্জনের দিকে নয়। পলিথিন ধ্বংস করে পরিবেশ রক্ষা করাকে একমাত্র উদ্দেশ্য হিসেবে নিয়েছেন। সামাজিক দায়বদ্ধতা থেকে সমাজের ভালোর জন্য কাজ করে যেতে চান তৌহিদুল। যথাযথ কর্তৃপক্ষের সুদৃষ্টি পেলে তৌহিদের আবিষ্কার হতে পারে পলিথিন থেকে মুক্তির ’হাতিয়ার’!

Related Articles

Adblock Detected

Please consider supporting us by disabling your ad blocker