জাতীয়

এফডিসির ইতিহাস

মাহমুদুর রহমান: এফডিসি বললে বা শুনতেই আমাদের মনে পড়ে বাংলা সিনেমার কথা। কোন নাচের দৃশ্য কিংবা শুটিং। মূলত একটা সময় ছিল যখন বেশীরভাগ বাংলা সিনেমার সিংহভাগ চিত্রায়িত হতো এফডিসি-তে। এফডিসি আর সিনেমা যেন সমার্থক। এখন পাশ্চাত্যের সিনেমার প্রভাবে বাংলা সিনেমা যখন পিছিয়ে, তখন আমারা অনেক সময়েই এফডিসি কথাটা ব্যঙ্গ করে ব্যবহার করি। কিন্তু এফডিসি-র একটা নিজস্ব ইতিহাস আছে। সেটি জানা প্রয়োজন।

FDC এর পূর্ণরূপ হলো Bangladesh film Development Corporation. পঞ্চাশের দশকের শেষার্ধে বাঙালী জাতি ধীরে ধীরে বুঝতে পারছে পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর শোষণের পরিমাণ। সকলে ক্ষেত্রের মতো সিনেমা শিল্পেও পশ্চিম পাকিস্তানীরা বাঙালীদের এই ক্ষেত্রেও দমন করে, কিংবা সুবিধা-বঞ্চিত করে রেখেছিল। পূর্ব পাকিস্তানের কেউ সিনেমা তৈরি করতে চাইলে তাদের ফিল্ম নিয়ে যেতে হতো লাহোরে। সিনেমার কাজ সেখানেই করতো হতো। আর লাহোরে কোটি টাকা ব্যয়ে গড়ে তোলা হয়েছিল ফিল্ম স্টুডিও। সেই সময়ে শিল্প বানিজ্য ও শ্রম মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে ছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। তখন তিনি সাইত্রিশ বছরের যুবক। তিনি খেয়াল করেছিলেন যে সম্ভাবনাময় চলচ্চিত্র শিল্পে পিছিয়ে পড়ছে বাঙালীরা। তাদের জন্য কিছু করা প্রয়োজন।

বঙ্গবন্ধুকে সাহায্য করলেন বাংলাদেশের প্রথম সবাক চলচ্চিত্র নির্মাতা আব্দুল জব্বার খান, প্রাদেশিক ফিল্ম বিভাগের প্রধান নাজির আহমেদ, চলচ্চিত্র সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মধ্যে নুরুজ্জামান, ড. আব্দুস সাদেক, আব্দুল কালাম শামসুদ্দিন এবং বাণিজ্য বিষয়ক উপসচিব আবুল খায়ের প্রমুখ। ১৯৫৭ সালের ২৭ মার্চ প্রথম প্রাদেশিক পরিষদ অধিবেশনে “The East Pakistan Film Development Corporation Bill, 1957” পেশ করা হয়। ঢাকা, ৩ এপ্রিল, ১৯৫৭, বুধবার পূর্ব পাকিস্তান প্রাদেশিক পরিষদের স্পীকার জনাব আব্দুল হাকিম এর সভাপতিত্বে ১৯৫৭ সালে প্রথম অধিবেশনের শেষ কার্য্যদিবসের কার্যক্রম শুরু হয়। তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী আতাউর রহমান খান কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিল সম্পর্কে স্পিকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন যার মধ্যে বাংলা একাডেমী এবং চলচ্চিত্র উন্নয়ন কর্পোরেশন বিল অন্তর্ভুক্ত। এরপর বিরোধিদলীয় নেতা জনাব আবু হোসেইন সরকার ফ্লোর পেলে তিনিও বলেন যে চলচ্চিত্র উন্নয়ন কর্পোরেশন বিল সম্পর্কে কোন দ্বিমত থাকা উচিত নয়। বিলটি উত্থাপনের পর বিরোধী দলীয় সদস্য জনাব মো: আব্দুল মতিনও এটি সমর্থন করেন এবং কিছু সংশোধনী প্রস্তাব করেন। এরপর পরিষদের সদস্য জনাব মো: এমদাদ আলী ও জনাব মুনিন্দ্র নাথ ভট্টাচার্য্যও আরো কয়েকটি সংশোধনী প্রস্তাব পেশ করেন। বিল উত্থাপনকারী মন্ত্রী শেখ মুজিবুর রহমান এই সংশোধনী প্রস্তাবগুলো গ্রহণ করেন এবং পরিষদে বিলটি চূড়ান্তভাবে উত্থাপিত হলে সর্বসম্মতি ক্রমে পাশ হয়।

১৯ জুন ১৯৫৭ সাল থেকে আইনটি কার্যকর হয় এবং বঙ্গবন্ধুর হাত ধরে আসে এফডিসি। বর্তমানে বাংলাদেশ চলচ্চিত্র উন্নয়ন কর্পোরেশনের অবস্থান তেজগাঁও শিল্প এলাকায়। উল্লেখ্য, প্রতিষ্ঠার সূচনালগ্ন হতেই এই প্রতিষ্ঠানটি বাংলা চলচ্চিত্রের অভিভাবকের দায়িত্ব পালন করে আসছে। নানা সময়ে প্রতিষ্ঠানটির দায়িত্বে ভিন্ন ভিন্ন মানুষেরা ছিলেন। তাদের অনেকেই বাংলা চলচ্চিত্র এবং এফডিসি-র উন্নয়নে বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়েছেন। কিন্তু অভ্যন্তরীণ অব্যবস্থাপনা ও বিভিন্ন কারনে এফডিসি তার সুনাম খুইয়ে বসেছে। তবু সবকিছুর পরও এই প্রতিষ্ঠানটিই বাংলা চলচ্চিত্রের ঘর। আমাদের চলচ্চিত্রের ইতিহাস ততোটা খারাপও নয়। কিন্তু চলচ্চিত্র এবং এফডিসি কে ফিরিয়ে আনতে হলে দায়িত্বশীল হতে হবে আমাদের। তাহলেই ফিরে আসবে বাংলা সিনেমার হারানো গৌরব।

Related Articles

Adblock Detected

Please consider supporting us by disabling your ad blocker