জাতীয়হোমপেজ স্লাইড ছবি

মঙ্গল শোভাযাত্রার ইতিহাস

মাহমুদুর রহমান: প্রবর্তিত হওয়ার পর থেকে নানা সময়ে নানা উৎসবের সাথে বাংলা নববর্ষ পালিত হয়ে আসছে। যদিও বিভিন্ন সময়ে নববর্ষ পালন নিয়ে নানা দ্বিমত এসেছে, তবু এখনও টিকে আছে বাংলা ক্যালেন্ডার এবং সেই সঙ্গে পালিত হয়ে আসছে বাংলা নববর্ষ। সংস্কৃতি, উৎসবের স্বভাব হলো এর সঙ্গে নতুনের সংযোজন। তেমনি বাংলা নববর্ষের উৎসবের সাথে সংযুক্ত হয়েছে ‘মঙ্গল শোভাযাত্রা’।

শোভাযাত্রা হলো এমন একটা আয়োজন, যেখানে কোন প্রতিপাদ্য বিষয় নিয়ে সমমনা মানুষেরা একত্রিত হয়ে মিছিল করে। সেখানে স্লোগান থাকতে পারে, থাকতে পারে গান কিংবা কবিতা। সাধারণ রাজনৈতিক মিছিলের সঙ্গে শোভাযাত্রার পার্থক্য হলো এখানে উত্তেজনার চেয়ে প্রীতি এবং সাম্য থাকে বেশি। সেই শোভাযাত্রা যখন মঙ্গলের উদ্দেশ্যে হয় তখন তার নাম হয় ‘মঙ্গল শোভাযাত্রা’।

বাংলা নববর্ষ এখন ‘পহেলা বৈশাখ’ নামেই বেশি পরিচিত। দিনটি প্রতি বছর সাড়ম্বরে পালিত হয়। হালখাতা, মেলা, গান বাদ্যের সঙ্গে এখন নববর্ষের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে মঙ্গল শোভাযাত্রা। নববর্ষের সকালে এই যাত্রা হয়ে থাকে। চারুকলা অনুষদের উদ্যোগে প্রতিবছরই পহেলা বৈশাখে ঢাকা শহরের শাহবাগ-রমনা এলকায় এই মঙ্গল শোভাযাত্রার আয়োজন করা হয়। এই শোভাযাত্রায় চারুকলা ইন্সটিটিউটের শিক্ষক শিক্ষার্থী ছাড়াও বিভিন্ন স্তরের ও বিভিন্ন বয়সের মানুষ অংশগ্রহণ করে। শোভাযাত্রায় বিভিন্ন ধরনের প্রতীকী শিল্পকর্ম বহন করা হয়। এছাড়াও বাংলা সংস্কৃতির পরিচয়বাহী নানা প্রতীকী উপকরণ, বিভিন্ন রঙ-এর মুখোশ ও বিভিন্ন প্রাণীর প্রতিকৃতি নিয়ে হাজার হাজার মানুষ জমায়েত হয়।

মঙ্গল শোভাযাত্রার একটি ইতিহাস আছে, এবং মজার ব্যপার হলো এর সূচনা নববর্ষের সঙ্গে সম্পৃক্ত নয়। ১৯৮০’র দশকে স্বৈরাচারী শাসনের বিরূদ্ধে সাধারণ মানুষের ঐক্য এবং একইসঙ্গে শান্তির বিজয় এবং অপশক্তির অবসান কামনায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের উদ্যোগে ১৯৮৯ সালে সর্বপ্রথম মঙ্গল শোভাযাত্রা প্রবর্তিত হয়। সে বছরই ঢাকাবাসীর দৃষ্টি আকর্ষণ করতে সক্ষম হয় এই আনন্দ শোভাযাত্রা। সকালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা ইন্সটিটিউটের শিক্ষক-শিক্ষার্থীগণ পহেলা বৈশাখ উপলক্ষে এই আনন্দ শোভাযাত্রা বের করার উদ্যোগ প্রতি বছর অব্যাহত রাখে।

পরবর্তীতে মঙ্গল শোভাযাত্রা হয়ে ওঠে পহেলা বৈশাখ তথা বাংলা নববর্ষের অন্যতম অনুষঙ্গ। শোভাযাত্রার অনতম আকর্ষণ হলো বিশালকায় চারুকর্ম, পুতুল, হাতি, কুমীর, লক্ষ্মীপেঁচা, ঘোড়াসহ বিচিত্র মুখোশ এবং সাজসজ্জ্বা, বাদ্যযন্ত্র ও নৃত্য। পহেলা বৈশাখ উদযাপন উপলক্ষে আনন্দ শোভাযাত্রা শুরু থেকেই জনপ্রিয়তা পেয়ে আসছে। পরের বছরও চারুকলার সামনে থেকে আনন্দ শোভাযাত্রা বের হয়। সে সময়ের সংবাদপত্রের খবর অনুযায়ী জানা যায়, ঐ বছর চারুশিল্পী সংসদ নববর্ষের সকালে চারুকলা অনুষদ থেকে বর্ণাঢ্য আনন্দ মিছিল বের করে। তবে, শুরু থেকে চারুকলার এই শোভাযাত্রাটির নাম ‘মঙ্গল শোভাযাত্রা’ ছিল না।

সূচনাকালে যারা এর সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন তারা বলেন পূর্বে এই শোভাযাত্রার নাম ছিল বর্ষবরণ আনন্দ শোভাযাত্রা। সেই সময়ের সংবাদপত্রের খবর থেকেও এমনটা নিশ্চিত হওয়া যায়। সংবাদপত্র থেকে যতোটা ধারণা পাওয়া যায়, ১৯৯৬ সাল থেকে চারুকলার এই আনন্দ শোভাযাত্রা মঙ্গল শোভাযাত্রা হিসেবে নাম লাভ করে। তবে বর্ষবরণ উপলক্ষে আনন্দ শোভাযাত্রা চারুকলায় ১৯৮৯ সালে শুরু হলেও এর ইতিহাস আরো কয়েক বছরের পুরানো।

১৯৮৬ খ্রিস্টাব্দে চারুপীঠ নামের একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান যশোরে প্রথমবারের মতো নববর্ষ উপলক্ষে আনন্দ শোভাযাত্রার আয়োজন করে বলে জানা যায়। যশোরের সেই শোভাযাত্রায় ছিল-পাপেট, বাঘের প্রতিকৃতি, পুরানো বাদ্যযন্ত্রসহ আরো অনেক শিল্পকর্ম। শুরুর বছরেই যশোরে শোভাযাত্রা আলোড়ন তৈরি করে। পরবর্তীতে যশোরের সেই শোভাযাত্রার আদলেই ঢাকার চারুকলা থেকে শুরু হয় বর্ষবরণ আনন্দ শোভাযাত্রা

মঙ্গল শোভাযাত্রা নিয়ে বিতর্ক রয়েছে। অনেকে মনে করেন শোভাযাত্রায় ব্যবহৃত মুখোশ ও নানা প্রতীক হিন্দু ধর্মের ধারক ও বাহক। কিন্তু মূলত এর সঙ্গে হিন্দু ধর্মের যোগ নেই। আসলে মঙ্গল শোভাযাত্রায় ব্যবহৃত প্রতীক, মুখোশ প্রভৃতি বাংলা এবং বাঙালীর অনেক দিনের লোক বিশ্বাসের সঙ্গে যুক্ত। ইতিহাস এবং নৃতত্ত্ব অনুসন্ধান করলে এর সত্যতা স্পষ্ট হয়ে যায়। তাই মঙ্গল শোভাযাত্রা নিয়ে বিদ্বেষ ছড়ানোর কিছু নেই। বরং খেয়াল করা উচিত যে ঐতিহ্যের স্বারক বলেই ২০১৬ খ্রিস্টাব্দের ৩০শে নভেম্বর বাংলাদেশের ‘মঙ্গল শোভাযাত্রা’ কে বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ সাংস্কৃতিক ঐতিহ‌্যের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করে ইউনেস্কো।

Related Articles

Adblock Detected

Please consider supporting us by disabling your ad blocker