জাতীয়

মানুষের জন্য উৎসর্গিত যে নারীর জীবন

মাহমুদুর রহমান: চিকিৎসা, মানুষের একটি মৌলিক অধিকার। কিন্তু তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোর জন্য সে অধিকার বাস্তবায়ন করা সহজ নয়। তবে প্রতিবেশী দেশগুলোর চেয়ে বাংলাদেশে সে কাজটি অনেক ক্ষেত্রেই বেশি সম্পন্ন হয়েছে। এবং এর পেছনে কাজ করছে কিছু মানুষের মানবিক অবদান। তেমনই একজন হলেন জহিরন।

জহিরন বেওয়া নামের এই নারীর বয়স বার্ধক্যে পৌঁছেছে বহুদিন আগে। তবুও একটি সাইকেল নিয়ে তিনি ঘুরে বেড়ান গ্রাম থেকে গ্রামে। বাংলাদেশের প্রত্যন্ত গ্রামে চিকিৎসার যথাযথ ব্যবস্থা এখনও নেই। বেশীরভাগ চিকিৎসক এবং চিকিৎসা সংশ্লিষ্ট মানুষেরা শহরেই বাস করেন। তাই মোট জনসংখ্যার ৭০ ভাগ যেখানে বাস করে, সেই গ্রামগুলোয় চিকিৎসা সেবা পৌঁছে দেন জহিরনের মতো মানুষেরা।

গত ৪৬ বছর ধরে মানুষের ঘরের দরজায় চিকিৎসা নিয়ে যাচ্ছেন জহিরন। ১৯৭৩ সালে নার্সিং এর ট্রেনিং নিয়ে তিনি তাঁর কাজ শুরু করেন। নারী হিসেবে স্বাভাবিক ভাবেই তাঁর কাজ ছিল নারী, শিশু, প্রসূতি সম্পর্কিত। নারীরা অনেকাংশেই অবহেলিত। সেক্ষেত্রে তাদের ঘোরে গিয়ে প্রসূতি পরিচর্যা, শিশুরোগ সম্পর্কে ভালোমন্দ বলা ছিল জহিরনের কাজ। চিকিৎসার প্রাথমিক প্রয়োজন, সহজ কিছু ঔষধ সঙ্গে নিয়ে ছিল তাঁর প্রতিদিনের পথ চলা।

জহিরনের সে পথ চলা চলছে আজও। এখন তিনি বৃদ্ধা। আগের মতো পায়ে হাঁটা তাঁর পক্ষে সম্ভব না। এবং অদ্ভুত হলো, যে দেশে শহরের মেয়েরা স্কুটি চালালে এখনও ‘লোকে কি ভাববে?’ বলে চিন্তায় ভোগে, জহিরন সে দেশের গ্রামে সাইকেল চেপে বেড়ান। একটি সাইকেল নিয়ে তাঁর প্রতিদিনের যাত্রা। প্রতিদিন তিন চারটি গ্রামে গিয়ে রোগী দেখেন তিনি। জহিরন বলেন, ‘পায়ে হেঁটে চার পাঁচটা গ্রামে ঘোরা পরিশ্রমের, সময়ও বেশি লাগে। তাই ’৯২ সালে ১২০০ টাকায় একটা সাইকেল কিনেছিলাম। সে সাইকেল আজও আমার সঙ্গী”।

জহিরন তাঁর সাইকেল নিয়ে এই বয়সেও ১৫ থেকে বিশ কিলোমিটার পথ পাড়ি দেন। সকাল থেকে তাঁর এই যাত্রা শুরু হয়। তিনি সাধারণ ঠাণ্ডা, জ্বর, উদরাময়ের ওষুধ দিয়ে থাকেন। প্রতিদিন প্রায় ১৫/২০ জন রোগী দেখেন। বহুদিনের কাজে তিনি সব গ্রামের সকলের কাছেই পরিচিত। পথে তাঁকে দেখলে সবাই কুশল প্রশ্ন করে। সাইকেল চেপে সেবা দেওয়া নারী জহিরনের নাম হয়েছে ‘বাংলা নানী’। সকলের ভালোবাসার নানী সে।

এই হলো আমার বাংলাদেশ। এখানে অনেক সোনার মানুষ পাওয়া যায়, একটু খুঁজলেই দেখা মেলে তাদের। জহিরন কোন বড় ডিগ্রিধারী ডাক্তার নন, কিন্তু তাঁর ওইটুকু সেবা অনেকের জন্য অনেক বড় অবদান। মানসিক বল সৃষ্টি করে। মানুষের মাঝে সচেতনতা আর শক্তি জাগিয়ে তুলছেন জহিরন। কাজ করে চলেছেন অক্লান্তভাবে। বয়সের ভারে এখন ক্লান্ত হলেও তিনি কাজ করে চলেছেন। জহিরন বলেন, “আমার ছেলে, ছেলে-বউ আমাকে ঘোরে বিশ্রাম নিতে বলে। কিন্তু আমি জানি আমি সুস্থ আছি আমার কাজের মধ্য দিয়ে। আমি মানুষের সেবা করি, আরও করতে চাই। আমি ওদের ‘নানী’ হয়ে থাকতে চাই”।

Related Articles

Adblock Detected

Please consider supporting us by disabling your ad blocker