জাতীয়হোমপেজ স্লাইড ছবি

‘জীবন ও মরণের সীমানা ছাড়ায়ে’

রাব্বী আহমেদ: সব মৃত্যু সমান ভাবে আন্দোলিত করে না পৃথিবীকে। কিছু কিছু মৃত্যু আছে মহান, পৃথিবীর বুকে রেখে যায় গভীর ক্ষত। কিছু কিছু মৃত্যু যেন অপূরণীয় ক্ষতি, ‘এ পৃথিবী একবার পায় তারে, পায় নাকো আর।’ ক্ষত আর ক্ষতির দিকে পৃথিবীকে ঠেলে দিয়ে খুব নীরবেই বিদায় নিলেন স্যার ফজলে হাসান আবেদ, আমাদের আবেদ ভাই। এইসব শীত মৌসুমে আবেদ ভাইয়ের মৃত্যু খবর যখন ভেসে এলো হিম হাওয়ায়, তখন অতিদূর সমুদ্রের নিকটে বসে তাঁরই প্রতিষ্ঠিত ব্র্যাকের এক গবেষণার কাজে ব্যস্ত সময় কাটছে। তাঁর মৃত্যু সংবাদ শুনে মুহূর্তেই যেন থমকে গেলাম।

কিছু কিছু শোক একদম স্তব্ধ করে দিয়ে যায়, এলোমেলো করে দিয়ে যায় সবকিছু। এই তো সেদিন, ব্র্যাক সেন্টারের নিচে চকিতে দূর থেকে দেখলাম তাঁকে। হুইল চেয়ারে বয়সের ভারে ন্যুজ হয়ে যাওয়া অথচ ভেতরে তারুণ্যের বিপুল প্রাচুর্য নিয়ে প্রগাঢ় বটবৃক্ষের মতো ছায়াঘন নিরিবিলি এক খানা মুখ। তাঁকে নিয়ে আগ্রহ ও কৌতূহল ছিলো বরাবরই। অবাক বিষ্ময়ে ভেবেছি কিভাবে লন্ডনে অ্যাকাউন্টিং পড়া একজন মানুষ পাকিস্তান শেল ওয়েল কোম্পানির উঁচু পদের বিলাসবহুল ও নিশ্চিত রাজসিক জীবন উপেক্ষা করে দেশ ও দেশের মানুষকে ভালোবেসে সব ছেড়ে চলে এসেছিলেন। ৭০ এর প্রলয়ংকারি ঘূর্ণিঝড় ও একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ তাঁকে টেনে নিয়ে গিয়েছিলো অন্য কোন পৃথিবীর দিকে। যে পৃথিবী ক্ষুধা, দারিদ্র্য অভাব মুক্ত, যে পৃথিবী কেবলই সাম্যের গান গায়, যে পৃথিবী আমাদের সবার কাম্য, তেমন একটা পৃথিবীর স্বপ্ন দেখেছিলেন তিনি।

মুক্তিযুদ্ধের সময়ে লন্ডনে অবস্থানকালে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন ‘অ্যাকশন বাংলাদেশ’ এবং ‘হেল্প বাংলাদেশ’ নামে দুটি প্রতিষ্ঠান। যুদ্ধ শেষ হলে ১৯৭২ সালে ক্ষুধা ও দারিদ্র্যমুক্ত স্বাধীন বাংলাদেশ গড়ার স্বপ্ন নিয়ে দেশে ফেরেন তিনি। তিনি হয়তো গভীরভাবে অনুভব করেছিলেন এ দেশের মানুষের অসহায়ত্বকে। যুদ্ধবিধ্বস্ত একটা দেশের সর্বত্র তখন বিবিধ অভাব। ভারত থেকে পিঁপড়ের মতো সারি বেঁধে ফিরছে শরণার্থীর দল। সেইসব ভারত-প্রত্যাগত শরণার্থীদের ত্রাণ ও পুনর্বাসনের জন্য ও তাদের আর্থসামাজিক উন্নয়নের জন্য প্রতিষ্ঠান করেন ব্র্যাক। সময়ের বিবিধ ধাপ পেরিয়ে, বহু বন্ধুর পথ পাড়ি দিয়ে, সততা ও নিষ্ঠা, সৃজনশীলতা ও উদ্ভাবনী মনোভাব, সার্বজনীনতা এবং কার্যকারিতা এই চার মূল্যবোধকে বুকে ধারণ করে কালক্রমে ব্র্যাক আজ বিশ্বের সবচেয়ে বৃহৎ বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা।

শোষণ ও বৈষম্যহীন পৃথিবী ও প্রতিটি মানুষের নিজস্ব বিকাশের সুযোগ দেয়ার লক্ষ্য নিয়ে ব্র্যাক নিরন্তর কাজ করে যাচ্ছে মানুষের জন্য। ব্র্যাক কাজ করছে পৃথিবী থেকে দারিদ্র্য, অশিক্ষা, ব্যাধি ও সামাজিক অবিচার দূরীভূত করে দরিদ্র মানুষ এবং জনগোষ্ঠীর ক্ষমতায়নের পথকে প্রশস্ত করার জন্য। যতোদিন যাচ্ছে ব্র্যাকের কর্ম পরিধি আরও প্রশস্ত হচ্ছে। নিত্য নতুন যুক্ত হচ্ছে বিবিধ কর্মপরিকল্পনা। আর তাই, পলিসি অ্যাডভোকেসি থেকে শুরু করে উন্নয়নের জন্য টেকনোলজি সবই এখন ব্র্যাকের কাজের ক্ষেত্র। সেই সঙ্গে গবেষণা তো রয়েছেই।

আবেদ ভাই ব্র্যাককে নিয়ে গিয়েছেন অন্যমাত্রায়। পেশাগত জায়গায় সমতা সৃষ্টি, আভ্যন্তরীন ভ্রাতৃত্ববোধ, লিঙ্গসমতায়ন, পরিবেশের প্রতি অনুভূতিশীল সর্বোপরি ব্র্যাক কর্মক্ষেত্রে যে নিজস্ব সংস্কৃতির জন্ম দিয়েছে তাঁর কৃতিত্ব তাঁরই। তিনি পেরেছিলেন এমন এক প্রতিষ্ঠানের স্বপ্ন দেখতে যেখানে নেই কোন বিভাজন, নেই পজিশনাল হায়ার্কির কোন জায়গা, প্রত্যেকেই তাঁর জায়গায় স্বতন্ত্র্য। কর্মক্ষেত্রে তিনি যুক্ত করেছিলেন ‘ভাই’ কিংবা ‘আপা’ ডাকার দারুণ এক সংস্কৃতি। এই ‘ভাই’ কিংবা ‘আপা’ একই পরিবারের ভাই বোনদের মাঝে ‘ভাই’, ‘আপা’ ডাকার সঙ্গে সাদৃশ্য, একই সঙ্গে সমানভাবে শ্রদ্ধাশীল। পারিবারিক সম্বোধনকে প্রোফেশনাল জায়গায় নিয়ে গিয়ে তিনি মূলত ব্র্যাককে একটি পরিবারেই রূপ দিলেন যেন। দেশের সীমানা পেরিয়ে যে পরিবার এশিয়া ও আফ্রিকার ১২ টি দেশে বিস্তৃত।

আবেদ ভাইয়ের মৃত্যুতে আমরা আমাদের ভাই, আমাদের পিতা হারানোর শোকই যেন অনুভব করলাম। যে মৃত্যুহীন প্রাণ আবেদ ভাই সঙ্গে করে নিয়ে এসেছিলেন, ব্র্যাকের মাধ্যমে সেই প্রাণই তিনি যেন দান করে দিয়ে গেলেন আমাদের। জীবনের বন্ধুর পথ হেঁটে যেতে যেতে আবেদ ভাইয়ের দেখানো পথ ধরে একটি শোষণ ও বৈষম্যহীন পৃথিবী নির্মাণের লক্ষ্যে যেন অবিরাম আমরা কাজ করে যেতে পারি, পৃথিবীর কাছে এই চাওয়া। জীবন ও মরণের সীমানা ছাড়ায়ে আবেদ ভাই বেঁচে রইবেন এই বাংলার শস্য শ্যামলিমা আর অবিরাম সবুজের মাঝে অনন্তকাল।

 

 

Related Articles

Adblock Detected

Please consider supporting us by disabling your ad blocker