জাতীয়

জামাল নজরুল ইসলাম : আধুনিক পৃথিবীর অন্যতম মেধাবী মানুষ

আরিফুল আলম জুয়েল: ইতিহাস নিয়ে মাঝে মধ্যেই লিখি, বিদেশ বিভুইয়ের ইতিহাস। তাদের শত বছর হাজার বছরের ইতিহাস পড়ি, লিখি, শেয়ার করি কিন্তু নিজ দেশের ই কতজন ইতিহাস সৃষ্টি করে বসে আছে তাদের নিয়ে কেন আমরা পড়ি না বা লিখি না! আজকে এমন ই একজন কে নিয়ে লেখার চেষ্টা করবো, তাকে নিয়ে যতবার জেনেছি ততবারই শ্রদ্ধায় মাথা নত হয়ে এসেছে কিন্তু তবে ঠিকই এ দেশের মাথা অনেক উঁচুতে পৌঁছেছে!

১৯৮১ সাল। লন্ডনের লাখ টাকা বেতনের চাকরি এবং উন্নত সুযোগ-সুবিধা ছেড়ে মাত্র ৩ হাজার (২৮ শত) টাকা বেতনের চাকরি নিয়ে তিনি চলে আসেন মাতৃভূমি বাংলাদেশে। বাংলার সন্তানদেরকে বিজ্ঞান শিক্ষা এবং গবেষণায় উজ্জীবিত করার মাধ্যমে দেশের সেবায় নিজেকে নিয়োজিত করেছেন সবসময় তিনি। বংশগত দিক থেকে ছিলেন অভিজাত পরিবারের সন্তান, তৎকালে ঢাকার নবাব বাড়ির পাশাপাশি যোগাযোগ ছিল জর্ডানের বাদশার পরিবারের সাথে। তবে বংশ হিসেবে অভিজাত হলেও ছিল না অভিজাত্যের অহংকার।

তার মাতা রাহাত আরা বেগম ছিলেন একজন সাহিত্য অনুরাগী লেখক, গানও গাইতেন ভালো। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘ডাকঘর’ নাটকটি উর্দুতে অনুবাদ করে বেশ প্রশংসা অর্জন করেছিলেন রাহাত আরা। তাদের বাসায় যাতায়াতও ছিল অনেক উঁচু দরের মানুষের। অনেকেই জানেন, বিজ্ঞান বিষয়ক গবেষণার জন্য লন্ডনের রয়্যাল সোসাইটি এক অনন্য নাম। রয়্যাল সোসাইটির প্রসিডিংসয়ে গবেষণাপত্র প্রকাশ করা মানে আক্ষরিক অর্থেই রাজকীয় কাজ সম্পন্ন করা। তিনি এই প্রসিডিংসয়ে ধারাবাহিকভাবে পরপর ছয়টি গবেষণাপত্র প্রকাশ করেন। এখানে গবেষণাপত্র প্রকাশ করতে গেলে আবার রয়্যাল সোসাইটির কোনো ফেলো সদস্যের রিকমেন্ডেশন লাগে। তার ক্ষেত্রে রিকমেন্ডেশন করেছিলেন কে জানেন-বিশ্ববিখ্যাত বিজ্ঞানী স্টিফেন হকিং ও ফ্রেড হয়েল।

১৯৮৫ সালে এটি ক্যামব্রিজ ইউনিভার্সিটি প্রেস থেকে প্রকাশিত হয়। উল্লেখ্য প্রসিডিংসয়ে প্রকাশিত তার এই গুরুত্বপূর্ণ ও উঁচু মানের গবেষণার জন্য ১৯৮২ সালে ক্যামব্রিজ ইউনিভার্সিটি তাকে অত্যন্ত সম্মানজনক ডিগ্রি ডক্টর অব সায়েন্স প্রদান করে। ‘দ্য আল্টিমেট ফেইট অব দ্য ইউনিভার্স’ই তার প্রথম বই, যা ১৯৮৩ সালে ক্যামব্রিজ ইউনিভার্সিটি প্রেস থেকে প্রকাশিত হয়। শিক্ষা ও মননশীল প্রকাশনা জগতে ক্যামব্রিজ ইউনিভার্সিটি প্রেস ও অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটি প্রেস অনেক বিখ্যাত। মানের দিক থেকে উন্নত বলে তাদের গ্রহণযোগ্যতাও বিশ্ববিদিত। ক্যামব্রিজ ইউনিভার্সিটি প্রেস থেকে প্রকাশিত এই বইটি তাকে বিশ্বজোড়া খ্যাতি ও গ্রহণযোগ্যতা এনে দেয়।

তিনি বাংলা ও ইংরেজি মিলিয়ে উল্লেখযোগ্য বই লিখেছেন ৬টি। তবে বই, গবেষণা ও সম্পাদনার বিস্তারিত তালিকা করলে তা অনেক দীর্ঘ হবে। এদের মাঝে ৩টি বই বিশ্ববিখ্যাত। ক্যামব্রিজ ও হার্ভার্ড সহ বেশ কয়েকটি নামীদামী বিশ্ববিদ্যালয়ে তার বই পাঠ্য হিসেবে পড়ানো হয়। তার লেখা বই ‘দ্য আল্টিমেট ফেইট অব দ্য ইউনিভার্স’ ফরাসি, জাপানী, পর্তুগিজ, ইতালিয়ান সহ বেশ কয়েকটি ভাষায় অনূদিত হয়েছে।

১৯৫৭ সালে আমি কলকাতা থেকে অনার্স শেষ করে কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের ট্রিনিটি কলেজে গণিতশাস্ত্রে ট্রাইপস করতে যান তিনি। সাধারণত এটা তিন বছরের কোর্স, তবে তিনি দুই বছরেই শেষ করেন। ওখানে তাঁর সহপাঠী ছিল পরবর্তীকালে ভারতের বিখ্যাত গণিতবিদ নারলিকার। আরেকজন সহপাঠী ছিলেন ব্রায়ান জোসেফসন, যে তার পিএইচ ডি থিসিসের জন্য মাত্র ৩৩ বছর বয়সে, ১৯৭৩ সালে, পদার্থবিদ্যায় নোবেল পুরস্কার পায়। তার এক বছরের সিনিয়র ছিলেন জেমস মার্লি, যিনি ১৯৯৬ সালে অর্থনীতিশাস্ত্রে নোবেল পুরস্কার পান। অমর্ত্য সেন যে-বছর নোবেল পুরস্কার পান সে বছর অর্থাৎ ১৯৯৮ সালে রসায়নে নোবেল পেয়েছিলেন জন পোপল। তিনি কেমব্রিজে তাঁর শিক্ষক ছিলেন। আরো আছে শুনবেন- সাধারণত ডক্টরেট সম্পন্ন হবার আগে পোস্ট ডক্টরেট গবেষণা করা যায় না। কিন্তু তিনি নির্ধারিত সময়ের আগেই পিএইচ.ডির কাজ শেষ করে ফেলেন। কাজ সম্পন্ন হয়ে গেলেও থিসিস জমা দেবার সময় না হওয়াতে পিএইচ.ডি সম্পন্ন হতে দেরি হয় তার। তাই তিনি বিশেষ বিবেচনায় পোস্ট ডক্টরাল গবেষণার সুযোগ পেয়েছিলেন।

স্টিফেন হকিংয়ের প্রথম বই A Brief History of Time প্রকাশিত হয়েছিল ১৯৮৮ সালে আর তাঁর প্রথম বই The Ultimate Fate of The Universe প্রকাশিত ১৯৮৩ সালে। অনেক কথাই বলার চেষ্টা করলাম, কিন্তু তাঁর নামটি বলা হলো না।
বলবো, অনেকেই বুঝে ফেলেছেন যে তাঁর নাম কি! আপনি কি জানেন- তাদের কলকাতার বাসায় কবি কাজী নজরুল ইসলামও যাতায়াত করতেন। কবির নামের সাথে মিল রেখেই তার বাবা-মা তার নাম রেখেছিলেন ‘জামাল নজরুল ইসলাম’।বলা হয়, আধুনিক বিশ্বের সাত জন শ্রেষ্ঠ বিজ্ঞানীর নাম নিলেও জামাল নজরুল ইসলামের নাম চলে আসবে।

তিনি সারা বিশ্বে জেএন ইসলাম নামে পরিচিত এবং বিজ্ঞানীদের কাছে বাংলাদেশ জেএন ইসলামের দেশ হিসেবে পরিচিত।জেএন ইসলাম ছিলেন ক্যামব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ে হকিংয়ের রুমমেট, বন্ধু এবং সহকর্মী। প্রায় অর্ধ ডজন নোবেল পুরস্কার বিজয়ী ব্যক্তির ঘনিষ্ঠ বন্ধু জেএন ইসলামকে বলা হতো আধুনিক পৃথিবীর অন্যতম মেধাবী মানুষ।

নিভৃতচারী ও প্রচারবিমুখ এই গুণী বিজ্ঞানী ২০১৩ সালে ৭৪ বছর বয়সে পরলোকগত হন। তার মৃত্যুতে এই দেশ তথা এই পৃথিবী আসলেই একজন আলোকিত নক্ষত্রকে হারিয়েছে। অনেকেই বলে থাকেন, বাংলাদেশের ঝিনাইদহ জেলায় জন্মগ্রহণ করা চট্রগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক জামাল নজরুল ইসলাম স্টিফেন হকিংয়ের চেয়ে ও বড় বিজ্ঞানী!

আফসোস, আমরাই চিনলাম না!

Related Articles

Adblock Detected

Please consider supporting us by disabling your ad blocker