আজকের পত্রিকায় আলোচিত সংবাদচলতি হাওয়াজাতীয়

ওদের অসম্মান করবেন না প্লিজ!

ড. সৌমিত্র শেখর: সম্প্রতি দ্য ডেইলি স্টারে একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। শিরোনাম ‘গ্রন্থাগারের বইয়ে ধুলো, শিক্ষার্থীরা পড়ছেন বিসিএস গাইড’। সেখানে উল্লেখ্য করা হয়, ভোরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারের সামনে শিক্ষার্থীরা লাইনে দাঁড়ায়। গ্রন্থাগারে গিয়ে তারা অ্যাকাডেমিক নয়, সঙ্গে করে নিয়ে আসা বিসিএস কিংবা চাকরি সংক্রান্ত নোট-গাইড বই পড়েন। অর্থাৎ গ্রন্থাগারকে তারা ব্যবহার করছেন চাকরির প্রস্তুতি নেওয়ার কাজে। এই প্রতিবেদন প্রসঙ্গে কিছু কথা না বলে পারছি না।

বইয়ে ধুলোই ভালো নাকি ওরা লেখাপড়া করে চাকরি খুঁজছে সেটা? মনে হচ্ছে, চাকরিপ্রার্থীরা পকেটে ধুলো নিয়ে লাইব্রেরিতে প্রবেশ করে আর ছিটিয়ে দেয়। আসলে, তরুণসমাজের লেখাপড়ার বিরুদ্ধে উঠ পড়ে লেগেছে কতিপয় ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান। ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান দুটোরই সুতো এক জায়গায়। গবির মানুষের ছেলেমেয়েরা লেখাপড়া করে চাকরি পাক, প্রতিষ্ঠিত হোক, পরিবারকে দিক, সমাজকে দিক- অনেকেই চান না। এই ছাত্রছাত্রীদের উৎকোচ দেবার মতো অর্থ নেই, প্রভাবশালী মামা-চাচা নেই, এমন কি হলে বসে ঠিকঠাক পড়বে সেই স্থানটুকুও নেই নিজের।

তাই তারা বাধ্য হয়ে লাইব্রেরির ভেতরে একটু লেখাপড়ার সন্ধানে যায়। সেখানেও প্রবেশ করতে ভোর পাঁচটা থেকে লাইন দিতে হয় তাদের, সেখানেও প্রতিযোগিতা। তারপর, জায়গাটুকু পেলেই হলো না, লোকাল ট্রেনের থার্ডক্লাস বগির ভাঙা আসনের মতো চেয়ার বা বেঞ্চে ঠাসাঠাসি করে বসে পড়তে হয় তাদের। ওদের বাবার যদি টাকা থাকতো কিংবা প্রভাবশালী মামা-চাচা থাকতো তাহলে এই ইঁদুরদৌড় না দিলেও হতো। কিন্তু ওরা বড় অসহায়। লেখাপড়া শেষে যদি চাকরি তারা না পায়, তাহলে হয়তো কারো বোনের বিয়ে আটকে যাবে, বাবার অবসরজনিত কারণে কারো সংসারে হয়তো স্থবিরতা আসবে, কারো অসুস্থ মা হয়তো মৃত্যুশয্যায় পতিত হবেন। তাই তারা পত্রিকার তীর্য়ক লেখা, অধ্যাপকদের ভ্রূকুটি, কথিত মেধাবীদের শ্লেষ উপেক্ষা করে চাকরির বই নিয়ে লাইব্রেরিতে যায়। কিন্তু সেখানে তারা পড়ে, অন্য কিছু করে না।

লাইব্রেরিতে গিয়ে তো তারা– ১. মাস্তানি করে না, ২. গালাগাল করে না, ৩. টেন্ডারবাজি করে না, ৪. পকেট মারে না, ৫. প্রত্যুষ থেকে রাত-অবধি ঘুমায় না, ৬. হোটেলের মতো আয়েশ করে খাদ্যগ্রহণ করে না, ৭. রাজনৈতিক লবিং করে না।তাহলে ক্ষতি কী? তাদের জন্য কি কোনো কথিত মেধাবী ছাত্র আসন বা বই পায় নি? না। তেমন নয়। কারণ, সংবাদেই উল্লেখ আছে, বইয়ে ধুলো জমে। তাহলে বইয়ে ধুলো জমলো কেন? কারণ, সমালোচক কথিত মেধাবী ঐ ছাত্র-শিক্ষকেরা নিজেরাই লাইব্রেরিতে যান না! চাকরিপ্রার্থীরা গিয়ে বই পড়ছে, এটিতে গাত্রদাহতো হবার কথা নয়। উন্নত বিশ্বের লাইব্রেরিগুলোতে নিজের বই নিয়ে প্রবেশের অনুমতি আছে। কে কোন বই পড়বে, সেটি পাঠক নিজেই ঠিক করে।

আমাদের মতো ‘সুশিক্ষিত’ দেশে যেখানে লাইব্রেরিতে ‘পাতাকাটা’, ‘বইচুরি’ ইত্যাদি হামেশাই হয়ে থাকে সেখানে লাইব্রেরিতে নিজের বই নিয়ে ঢুকতে দেয়া হয় না। দেয়া হয় না কারণ, নিজেরটির সঙ্গে যদি পাঠক লাইব্রেরিরটিও ‘মেরে’ দেন, এই ভয়। আমাদের শিক্ষিত ছাত্রছাত্রীরা যদি বইয়ের পাতা না কেটে লাইব্রেরিতে চাকরির বই পড়ে তাহলে দোষ কী? আমি বলবো, লাইব্রেরির আসন সংখ্যা বাড়াতে এবং যে কোনো ধরনের বই পড়ার পরিবেশ সুনিশ্চিত করতে। এবার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন নিয়ে আলাপ করা যাক এবং সেটি হলো: তারা নাকি ‘গাইড’ বই পড়ে। আমার প্রশ্ন: চাকরির প্রশ্ন কারা করেন? আপনারা কেন এখনো চাকরির প্রশ্নের ধরন পাল্টাতে পারলেন না? দোষতো আপনাদের। আপনারা যেমন প্রশ্ন করবেন প্রস্তুতিও হবে তেমনি। শিক্ষা শেষে দরকার হলো সৎ পথে একটি ভালো চাকরি। গাইড বই পড়ে সহজে চাকরি পাওয়া গেলে কেন অন্য বই পড়বে ছাত্রছাত্রীরা?

আপনারা নিজেদের জ্ঞান ও কর্মের সীমাবদ্ধতার দায় গরিব ও সাধারণ শিক্ষার্থীদের ওপর চাপাতে চান? আপনারা প্রশ্নের ধরন পাল্টান, দেখবেন প্রস্তুতির ধরনও পাল্টেছে। নিজেরা পদ-পদবি অধিকার করে থাকবেন, রাজনীতি করবেন, পদের লোভে সময় নষ্ট করবেন, পত্রিকায় কলাম লিখে ছবক দেবেন, টিভিতে টকমিষ্টি কথা বলবেন কিন্তু পরীক্ষার ধরন ও প্রশ্নকাঠামো পাল্টাবেন না (নাকি পাল্টানোর বিদ্যে ও দক্ষতা নেই)

তাহলে তো চাকরিপ্রার্থীদের এধরনের প্রস্তুতি থেকে ফেরানো যাবে না। অতএব, আগে আপনি ও আপনারা পাল্টান ‘মহাশয়’। যারা লাইব্রেরিতে প্রবেশের জন্য ভোরে লাইন দেয়, তাদের মতো আপনি একদিন আসুন। দেখবেন, দিনটা খিটখিটে যাচ্ছে। আপনার সুখনিদ্রায় ব্যাঘাত ঘটবে, কোষ্ঠ পরিষ্কার হবে না, নাস্তা করতে বুকটা জ্বালা-জ্বালা করবে, চোখে ঘুম-ঘুম ভাব থাকবে আর সারা দিন মাথাটা কেমন যেন করবে। এত্তোসব ওদেরও হয়। এগুলো নিয়েই ওরা লাইব্রেরিতে একটু লেখাপড়ার জায়গার জন্য চোখ বুজে আপনার ‘ছবক’ সহ্য করে। ভাববেন না, ওরা মেধাবী নয়। মেধার স্বাক্ষর রেখেই কিন্তু ওরা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েছিল।

লেখক: অধ্যাপক, বাংলা বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

Related Articles

Adblock Detected

Please consider supporting us by disabling your ad blocker