জাতীয়স্বাস্থ্যহেলথ টিপসহোমপেজ স্লাইড ছবি

করোনা থেকে বাঁচতে করণীয়

আজকে আমি খুব করে ভাবছি আমাদের প্রবীণদের কথা, আমাদের অগ্রজদের কথা। করোনা ভাইরাসের গত তিনমাসের সদম্ভ পদচারণায় আমরা তার নানা গতি-প্রকৃতি সম্পর্কেই জেনেছি। করোনা ভাইরাস প্রতিনিয়ত পরিবর্তিত হচ্ছে, অথবা তার নানা বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে আমরা নতুন করে জানছি, যা আগে জানতাম না। যেমন গত দুদিনে জানা গেল, করোনা ভাইরাস মেঝেতে বা লোহাতে বা এমন মাধ্যমগুলোতে কেবল ১০-১২ ঘন্টা থাকবে এমন কোন নিশ্চয়তা নেই। একটি বিলাসবহুল জাহাজে যাত্রীদের নামিয়ে দেবার ২৭ দিন পরেও একটি বিছানায় করোনা ভাইরাস পাওয়া গিয়েছে। করোনা ভাইরাস বায়ুতেও বেশ কিছুক্ষণ থাকতে পারে, এমনকি প্রস্রাব, পায়খানার মাধ্যমেও এটি ছড়াতে পারে, এমনটিও বিজ্ঞানীরা এখন বলছেন।

অন্যদিকে এখন এটা অনেকেই নিশ্চিত হচ্ছেন যে, আমরা যত চেষ্টাই করি না কেন, হয়ত এই ভাইরাসের সংক্রমণ থেকে মুক্তি পাবে না বেশীরভাগ মানুষ। কিন্তু আশার কথা হচ্ছে, যারা করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হবেন, তাদের বেশীরভাগই সুস্থ হয়ে যাবেন প্রায় সাধারণ ঠান্ডা-জ্বরে ভোগার মতো করেই। আক্রান্তদের বেশীরভাগ টেরই পাবেন না যে তাদের করোনা ভাইরাস হয়েছিল। এভাবে পৃথিবীর ৭০-৮০ ভাগ মানুষ করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে গেলে আমরা জনস্বাস্থ্যের ভাষায় “হার্ড ইমুউনিটি” অর্জন করলে তখন এই ভাইরাসের প্রকোপ হয়ত কমে আসবে। ঠিক এই কথাগুলি ইতিমধ্যে তাদের ভাষণে বলেছেন জার্মানীর চ্যান্সেলর এবং ইজরায়েলের প্রতিরক্ষামন্ত্রী। এখানে জরুরী সংক্রমণ ও আক্রান্তের পার্থক্যটা মাথায় রাখা।

তবে করোনাভাইরাস নিয়ে নানা তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করলে যে জিনিসটি পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে তা হচ্ছে করোনা ভাইরাসে আক্রান্তদের মধ্যে বেশী ঝুঁকিতে আছেন ৬০ বছরের বেশী বয়সী মানুষেরা। সবচেয়ে ঝুঁকিতে আছেন ৮০ বছরের বেশী বয়সী মানুষেরা। এখন পর্যন্ত প্রাপ্ত পরিসংখ্যান থেকে দেখা যাচ্ছে করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত মানুষদের মধ্যে যাদের বয়স ৮০ বছরের বেশী তারা সবচেয়ে বেশী মারা গেছেন। ৮০ বছরের বেশী বয়সী আক্রান্তদের প্রতি ৫ জনের মধ্যে ১ জন মারা গিয়েছেন এখন পর্যন্ত। আশার কথা হচ্ছে, ৮০ বছরের বেশী বয়সীদের মধ্যে প্রতি ৫ জনের ৪ জন সুস্থ হয়ে ঘরে ফিরছেন। এদিকে, ৭০ বছর থেকে ৭৯ বছর বয়সীদের মধ্যে সুস্থতার হার আরেকটু বেশী, এই বয়সের প্রতি ১০ জন আক্রান্ত হলে তার ৯ জনই সুস্থ হয়ে বাসায় যাচ্ছেন। ৬০ থেকে ৬৯ বছর বয়সীদের মধ্যে করোনা ভাইরাসে আক্রান্তদের মধ্যে প্রতি ৩০ জনে ২৯ জনই সুস্থ হয়েছেন।

খেয়াল রাখবেন শুধু যে বয়স বেশী হলেই তারা মারা গেছেন এমনটি নয়, যারা করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন, তাদের বেশীরভাগেরই খুবই জটিল হৃদরোগ, ডায়াবেটিস, ক্রনিক শ্বাসযন্ত্র কিংবা শ্বাসনালীর প্রদাহজনিত অসুস্থতা, উচ্চরক্তচাপ কিংবা ক্যানসারে ভুগছিলেন। আবার এগুলোর কিছুই ছিল না এমন প্রবীণ যে মৃত্যুবরণ করেননি তা নয়, প্রতি ১০০ জন মারা গেলে তার মধ্যে ১ জন মারা গিয়েছেন যার এসব কোন রোগই ছিল না। আবার যারা ৬০ বছরের নিচে তাদের মধ্যে যারা মারা গেছেন তাদের মধ্যে উপরে উল্লিখিত রোগগুলো খুব প্রকটভাবেই উপস্থিত ছিল বেশীরভাগ ক্ষেত্রে। কিন্তু ৬০ বছরের কম বয়সী মানুষ করোনা ভাইরাসে খুব কমই মারা গেছেন। দুইদিন আগের যে তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করা গেছে, তা দেখলে বোঝা যায় ৫০ থেকে ৫৯ বছর বয়সী আক্রান্তদের মধ্যে মারা যাবার সম্ভাবনা প্রতি ১০০ জনে ১ জনের মতো। ৪০ থেকে ৪৯ বছর বয়সীদের ক্ষেত্রে মৃত্যুর হার প্রতি ২০০ জনে ১ জন। অন্যদিকে এর নিচের ৩০ থেকে ৩৯ বছর, ২০ থেকে ২৯ বছর কিংবা ১০ থেকে ১৯ বছর বয়সী করোনা ভাইরাসে আক্রান্তদের প্রতি ৪০০ জনে এখন পর্যন্ত ১ জন করে মারা গিয়েছেন, তাও জটিল কোন শারীরিক রোগ থাকলে কেবল (এটি বৈশ্বিক হিসাব, প্রতিটি দেশে, বা অঞ্চলে হার আলাদা হতে পারে। কিন্তু সব কেইস একসাথে করলে এটিই মোটামুটি গড় হার)।

এইসব তথ্য-উপাত্ত আমি এইজন্য উত্থাপন করিনি যে এর থেকে আমি কোন গবেষণাপত্রে প্রবন্ধ উত্থাপন করব কিংবা উচ্চ বুদ্ধিবৃত্তির কোন বিতর্কে যাব। এখানে উত্থাপন করা সব তথ্যই বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ওয়েবসাইটে আছে। আমি শুধু জনস্বাস্থ্যে উচ্চতর গবেষণা করেন না, এমন সাধারণ মানুষদের জন্য সহজ ভাষায় এইসব তথ্য বিশ্লেষণ করেছি, কারণ আমার লেখাও সাধারণ মানুষদের জন্যই, বিশেষজ্ঞদের মানের লেখার যোগ্যতা আমার নেই।

আমার আজকের এই লিখার মূল বক্তব্য কয়েকটি,

১) করোনা ভাইরাস আমাদের জন্য ভীষণ চিন্তার বিষয়। এখন পর্যন্ত করোনা ভাইরাসে আক্রান্তের সংখ্যা ৪ লক্ষের কিছু বেশী, মারা গিয়েছেন প্রায় ১৭ হাজার মানুষ। অর্থাৎ প্রতি ১০০ জনে ৪ জন করে মারা গিয়েছেন। এই সংখ্যা প্রতি ঘন্টায় পরিবর্তিত হচ্ছে, সেটি আমার আলোচনার বিষয় নয়। এখানে খেয়াল করা দরকার শুধুমাত্র যাদের টেস্ট করা হয়েছে তাদের মধ্যে ৪ লক্ষ আক্রান্ত হয়েছেন, এর বাইরে আরও অসংখ্য মানুষ হয়ত ইতিমধ্যে করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন, কিন্তু টেস্ট করা হয়নি বলে আমরা জানি না। অন্যদিকে আশার কথা হচ্ছে, টেস্ট না করা অসংখ্য মানুষ হয়ত নিরবেই সুস্থ হয়ে যাচ্ছেন, যার মানে হচ্ছে প্রকৃত মৃত্যুর হার হয়ত ১০০ জনে ৪ জনের চাইতেও কম। আবার উদ্বেগের বিষয় হচ্ছে, যাদের টেস্ট হচ্ছে না কিন্তু আক্রান্ত হয়ে আবার সুস্থ হয়ে যাচ্ছেন, তারা নিজের অজান্তেই আরও অনেক মানুষকে আক্রান্ত করছেন।

২) করোনা ভাইরাস নিয়ে আমরা পরিসংখ্যানের ভাষায় একটি কথা বার বার বলছি যে করোনা ভাইরাসে আক্রান্তদের মধ্যে ৬০ বছরের নিচে মৃত্যুর হার নগণ্য, এবং এই তথ্যটি সঠিক। এখানে কোন ভুল নেই। কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে পৃথিবীতে প্রতিটি মানুষের জীবন সমানভাবে জরুরী, এবং আমাকে যদি জিজ্ঞেস করেন, তবে ৬০ বছরের বেশী বয়সী মানুষদের জীবন অমূল্য। মানুষের জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে তার মানবিকতা। সেই মানবিকতাকে জনস্বাস্থ্যের মানুষেরা সামাজিক এবং আচরণগত বিজ্ঞান দিয়ে কীভাবে বিশ্লেষণ করে তার উপর নির্ধারণ করে এই ভাইরাস থেকে মুক্তির পর মানুষ হিসেবে আমরা নিজেদের কীভাবে মূল্যায়িত করব।

৩) আমরা চাই কিংবা না চাই, পৃথিবীর বেশীরভাগ মানুষ করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হবেন। তাই সারা পৃথিবীতে যে সতর্কতা জারি হয়েছে, তা আমাদের মানতে হবে। আমাদের ঘরে থাকতে হবে। নিয়মিত হাত ধুতে হবে। কিন্তু এরপরও সবার পক্ষে সেটি সম্ভব হবে না। আমাদের রিকশাওয়ালা, দিনমজুর ভাইয়েরা ঘরে বসে থাকতে পারবেন কিনা আমি জানি না। বাংলাদেশ দূর্বল অর্থনীতির দেশ, আমরা ক্যানাডার মতো অর্থনৈতিক প্যাকেজ আমাদের মানুষের জন্য ঘোষণা করতে পারব বলেও আমি মনে করি না। তাই কিছু মানুষ কাজে যাবেন, এটা আমি আপনি ঠেকাতে পারব না। এছাড়াও সচেতনতা, কিংবা শিক্ষার অভাব অথবা প্রশাসনের ব্যর্থতা, যে কারণেই হোক না কেন, বাংলাদেশে সামাজিক দূরত্ব মানা হচ্ছে না, এটি সামনেও হবে আমি মনে করি না। তাহলে আমাদের কী করতে হবে? আমাদের লক্ষ্য রাখতে হবে এই অদ্ভুত অনিয়ন্ত্রিত সমাজ ব্যবস্থার মধ্যেও আমরা যদি একটা কাজ করতে পারি, সেটা হবে আমাদের প্রবীণদের, আমাদের অগ্রজদের দিকে খেয়াল রাখা, তাদের বাড়ির ভেতর, ঘরের ভেতর যতটা সম্ভব আদরের সাথে, যত্নের সাথে রাখা।

৪) আমাদের যদি একমাস ঘরে বন্দি থাকার সামর্থ্য নাও থাকে, তিনবেলা পেটপুরে খাবার সামর্থ্য নাও থাকে, সেটা আমরা মানিয়ে নেব। কিন্তু সবার ঘরে যে প্রবীণ মানুষটি আছেন, তাদের প্রতি আমাদের বিশেষ নজর রাখতে হবে। যাদের বয়স ৬০ এর বেশী, তাদের আলাদা রাখার সর্বাত্মক চেষ্টা করুন, তাদের মানসিকভাবে চাঙ্গা রাখুন, ভালো খাবার দেয়ার চেষ্টা করুন। বাংলাদেশের সামাজিক অবস্থায় তাদের সাথে ১৪ দিন কারও দেখা না করে থাকা সম্ভব হবে বলে মনে করি না, তাই তাদের সাথে দেখা করার সময় পারলে ২ ফিট দূরত্ব বজায় রাখুন। তাদের কাছে যাবার আগে হাত ধুয়ে নিন, মুখে মাস্ক লাগান। কেউ দেখা করতে আসলে অনুৎসাহিত করুন, একান্তই না পারলে, পুরো পরিষ্কার করিয়ে অল্প সময়ের জন্য দেখা করান।

আসলে চাইলেও আমরা তো পশ্চিমা দেশগুলোর মতো সবকিছু করতে পারি না। বাংলাদেশে লাখ লাখ প্রবীণ একই ছোট বাড়িতে একই ঘরে আরও ৫-৭ জন মানুষের সাথে থাকেন। আমেরিকা, কানাডার বিলাসবহুল কন্ডো বা বাড়িতে থেকে দেশের সমালোচনা করা সহজ, কিন্তু বাস্তবতার বিবেচনা জরুরী। আমি বুঝি আমাদের দেশে অনেক কিছুই আমরা নির্ধারণ করে দিতে পারব না, বাংলাদেশের মধ্যবিত্ত পরিবারগুলোও দুইদিন কাজ না করে থাকতে পারবে না, বেশীরভাগ মানুষের কাজ ইনফরমাল সেক্টরে, সেখানে খুবই অল্প পয়সায় তাদের জীবন যাপন করতে হয়, বিশ্বাস করেন আপনাদের অবস্থা আমি বুঝি, তাই আমি আশা করছি না, ঘরের মধ্যে বসে আপনি গরম ধোঁয়া ওঠা কফির মাগে চুমু দিতে দিতে বড় বড় কথা বলতে পারবেন অনেকের মতো।

তাই আমি আমাদের মতো দেশের মানুষের কাছে তাদের ক্ষমতার মধ্যে যা সম্ভব তা করার অনুরোধ করি। দেশে যদি বড় বিপর্যয় হয়, তখন যাতে আপনার মনে হয়, আপনার সামর্থ্যে যেটুকু ছিল, তার সবটুকু আপনি করেছেন। আপনাকে যাতে ভাবতে না হয় যে আপনি ঠিক মতো হাত না ধোবার জন্য, বার বার গালে মুখে চোখে হাত দেবার জন্য, অকারণে বাইরে ঘুরে বেড়ানোর জন্য, জনপরিবহনে ভ্রমণ করার জন্য, মসজিদে, জনসভায় হাজারো মানুষের সাথে ঘনিষ্ঠভাবে মিলেমিশে থাকার জন্য, রুমাল বা টিসুতে মুখ ঢেকে কাশি হাঁচি না দেবার জন্য, অসুস্থ হলে নিজেকে আলাদা করে না রাখার জন্য, কিংবা সঠিক জায়গায় না জানানো কিংবা না চিকিৎসা নেয়ার জন্য আপনার অতি প্রিয় কোন মুরুব্বী, গুরুজন, প্রবীণ কিংবা অগ্রজ পৃথিবী থেকে বিদায় নিয়েছেন! এই দায় যাতে আপনাকে না নিতে হয় অন্তত ততটুকু চেষ্টা করুন প্রিয় দেশবাসী।

প্রবীণরা আমাদের সমাজের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তাদের অভিজ্ঞতা, তাদের জ্ঞান, তাদের দিকনির্দেশনা একজন ব্যক্তি মানুষ, কিংবা একটি জাতির ভবিষ্যত কেমন হবে সেটি নির্ধারণ করে। আমরা শিশুদের জন্য স্কুল বন্ধ করব, প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য অফিস বন্ধ করব, কিন্তু প্রবীণদের জন্য চিন্তাভাবনা করব না এমনটি যেন না হয়। আমাদের অবহেলার জন্য করোনা ভাইরাসে সবচেয়ে ঝুঁকিতে থাকা প্রবীণদের মধ্যে যদি একজনও মারা যান, তাহলে সেই দায় জাতি হিসেবে সারাজীবন আমাদের বহন করতে হবে। নানা ব্যর্থতার দায় নিয়ে বেঁচে থাকা জাতি হিসেবে অন্তত আমাদের খুব প্রিয় কোন মুরুব্বীর কষ্টের দায় আমাদের কাউকেই যাতে না নিতে হয়, এই অনুরোধ আপনাদের সবার কাছে থাকল।

লেখক: শামীম আহমেদ
সোশাল এন্ড বিহেভিয়ারাল হেলথ সায়েন্টিস্ট,
ইউনিভার্সিটি অফ টরোন্টো।

Related Articles

Adblock Detected

Please consider supporting us by disabling your ad blocker