শুক্রবার, ২০ অক্টোবর ২০১৭
webmail
Fri, 16 Sep, 2016 04:59:31 PM
তসলিমা নাসরিন

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক আকতার জাহান কিছুদিন আগে আত্মহত্যা করেছেন। শুনেছি আকতার জাহানের পারিবারিক জীবন সুখময় ছিল না। স্বামীর সঙ্গে ডিভোর্স হয়েছিল। শিশু সন্তানের নিরাপত্তা নিয়ে দুশ্চিন্তা করতেন আকতার জাহান। স্বামী ওদিকে দ্বিতীয় বিয়ে করে নিয়েছেন। এবং আকতারের চরিত্র খারাপ ছিল এ কথাও বলে বেরিয়েছেন চারদিকে। আত্মহত্যার কারণ খুঁজতে গিয়ে অশান্তি দুশ্চিন্তা একাকীত্ব অস্বচ্ছলতা ইত্যাদির উল্লেখ করছে অনেকে।

আমার মনে পড়ছে তিরিশ বছর আগের কথা। তিরিশ বছর আগে আমি ডিভোর্স দিয়েছিলাম একটি লোককে যাকে নোটারি পাবলিকের কাগজে সই করে বিয়ে করেছিলাম। আইনের চোখে নোটারির বিয়ে হয়তো বিয়ে নয়। কিন্তু সেইসময় বিয়ে করেছি বলে মানুষকে যে জানিয়েছিলাম, সেটাই বিয়ে ঘটিয়ে দিয়েছিল।

যখন দেখলাম লোকটি বহুগামি, তাকে নির্দ্বিধায় ত্যাগ করলাম। তিরিশ বছর আগে একা বাসা ভাড়া নিয়েছি, একা থেকেছি, লোকে মন্দ কথা বলেছে, লোকের মন্দ কথায় বিরক্ত হয়েছি, কিন্তু ভেঙে পড়িনি।

কদিন পর পরই পত্র পত্রিকায় আমাকে নিয়ে নানা মিথ্যে কথা লেখা হতো, মেয়েদের নিয়ে যেসব কথা লিখলে লোকে তাদের ঘৃণা করে, সেসব কথা। অসভ্য সমাজে মেয়ে হয়ে জন্মালে যা হয়। ব্যস্ত ছিলাম হাসপাতালের রোগিদের চিকিৎসা আর নিজের লেখাপড়া নিয়ে। বদ আর বদমাশেরা যা কিছুই বলুক, পরোয়া করিনি।

শুধু ধার্মিক আর মৌলবাদী নয়, আহমদ ছফা আর হুমায়ুন আজাদের মতো নামকরা নাস্তিকরাও হিংসে করতো। প্রথম গদ্যের বই এর জন্যই আনন্দ পুরস্কার পেয়ে গেছি, এ নিয়ে কত ক্ষুদ্র কুৎসিত মনের লেখক যে জ্বলেছে পুড়েছে! লক্ষ লক্ষ মৌলবাদী জোট বেঁধেছে, দেশ জুড়ে মিছিল মিটিং করে আমার ফাঁসি চেয়েছে, মাথার মূল্য ধার্য করেছে। পরোয়া করিনি। আমার যা করতে ইচ্ছে করে করেছি। যখন ধর্মের নিন্দে করতে ইচ্ছে করেছে, নিন্দে করেছি, কারও সঙ্গে শুতে ইচ্ছে করলে শুয়েছি, শুতে না ইচ্ছে করলে জগৎ উল্টে গেলেও শুইনি।

মেয়েরা কেন যে ভুলে যায় তারা একটা অসভ্য অশিক্ষিত নারীবিদ্বেষী সমাজে বাস করছে। ভালো মেয়েদের, বুদ্ধিমতী মেয়েদের, মেরুদণ্ড সোজা করে চলা মেয়েদের এই নষ্ট সমাজ নানাভাবে নানা কায়দায় অপমান করে, অপদস্থ করে, গালি দেয়, চরিত্র নিয়ে কুকথা বলে। যে মেয়েদের এসব করা হয় না, যে মেয়েদের ‘ভালো মেয়ে’ বলা হয়, তারা আসলে মাথামোটা, গবেট, নির্বেোধ, মানসম্মানের ছিটোফোঁটা নেই এমন মেয়ে।

যে মেয়েরা বাধা পায়, গালি খায়, তারাই সত্যিকার হীরে। তারা বিচলিত হলে চলবে কেন! আত্মহত্যা করলে চলবে কেন! নারীবিদ্বেষী সমাজটাকে তুমুল অবজ্ঞা করা শিখতে হবে। কাউকে পরোয়া না করে নিন্দুকের মুখে থুতু দিয়ে যা ইচ্ছে তাই করা শিখতে হবে। তিরিশ বছর আগে আমি যা পেরেছি, তা কেন পারবে না এখনকার মেয়েরা?

আমারও অর্থনৈতিক অস্বচ্ছলতা ছিল, অশান্তি, দুশ্চিন্তা, একাকীত্ব ছিল, কিন্তু তাই বলে দমে যাইনি। এসব অভিজ্ঞতা অর্জন করেছি বলেই যে কোনও পরিস্থিতিতে পথ চলতে পারি। আমি তো সাধারণ একটি মেয়ে। যে কোনও মেয়ে চাইলেই পারবে আমি যা পেরেছি। কোনও মেয়ের আত্মহত্যার খবর আর শুনতে চাই না। পুরুষেরা তো মেয়েদের ধর্ষণ করে করে, নির্যাতন করে করে মেরেই ফেলছে। প্রতিদিন মারছে। মেয়েরা নিজেদের মারবে কেন? মেয়েরা যখন আত্মহত্যা করে, নিজের অজান্তে তারা তখন পুরুষ হয়ে যায়। পুরুষ যেমন করে মেয়েদের ঘৃণা করে, তেমন করে মেয়েরা নিজেদের ঘৃণা করে, পুরুষ যেভাবে মেয়েদের হত্যা করে, সেভাবে মেয়েরাও নিজেদের হত্যা করে।

(লেখক: ভারতে নির্বাসিত। এখানে প্রকাশিত সব মতামত লেখকের ব্যক্তিগত, নতুন বার্তা ডটকম’র সম্পাদকীয় নীতির আওতাভুক্ত নয়।)


Print
আরো খবর
    সর্বশেষ সংবাদ


    শিরোনাম
    Top