শুক্রবার, ২০ অক্টোবর ২০১৭
webmail
Thu, 13 Oct, 2016 07:52:44 PM
মাইদুর রহমান রুবেল

‌‌'যে প্রেম করতে দুইদিন, ছাড়তে একদিন; এমন প্রেম আর কইরো না দরদী।' এই গান হয়তো সবারই জানা। প্রেমের জন্য কেউ তাজমহল গড়েছে, কেউ মায়ের হৃদপিণ্ড খুলে উপহার দিয়েছে প্রেয়সীকে।

লাইলি-মজনু, শিরি-ফরহাদ, চন্ডিদাশ-রজকিনীসহ অমর প্রেমের গল্পগুলো এখন আর পড়তে কিংবা জানতে চায় না আধুনিক প্রেমিক প্রেমিকারা। নিজেরাই ইহিতাস গড়তে চায়।

না জেনে না বুঝে ইহিতাস গড়তে গিয়ে নায়কের পরিবর্তে হয় খলনায়ক। যার অনন্য দৃষ্টান্ত সিলেট শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ইকনোমিক্সের স্টুডেন্ট বদরুল আলম।

প্রেমে প্রত্যাখাত হয়ে বাংলাদেশে কত প্রেমিক তারে প্রেমিকাকে নির্যাতন করেছে তার সঠিক পরিসংখ্যান হয়তো নেই। প্রেমে সাড়া না দেয়ায় প্রেমিকার মুখে এসিড মারা, সড়কে উত্ত্যক্ত করা, বাড়িতে আগুন লাগিয়ে দেয়া, তুলে নিয়ে ধর্ষণ! প্রতিনিয়তই এমন শিরোনাম হয় খবরের কাগজে। সর্বশেষ প্রেমিকাকে কুপিয়ে সেই প্রেমের প্রতিদান দিলো বদরুলও।

শুধু যে বাংলাদেশে হয় এমন ঘটনা তা কিন্তু নয়। গেলো সেপ্টেম্বরে ভারতের নয়াদিল্লিতে রাজপথে এক প্রেমিকাকে কুপিয়ে হত্যা করেছিলো সুরেন্দর সিং নামের এক প্রেমিক। তাকেও কেউ রক্ষার চেষ্টা করেনি। মোবাইলে ছবি তোলায় ব্যস্ত ছিলো পথচারীরা। আসলে ঝামেলায় ঝড়াতে চায় না কেউ। সব দেশেই শান্তিপ্রিয় লোকের সংখ্যা আছে।
 
উন্নত দেশেও এমন ঘটনা ঘটে। গত বছরের গোড়ার দিকে ইতালিতে এক প্রেমিকাকে জবাই করে তার মাংস রান্না করে খেয়ে আত্মহত্যা করেছিলো এক পাগল প্রেমিক। সুইসাইড নোটে সেও লিখেছিলো তাকে পাত্তা না দিয়ে অন্য পুরুষের সঙ্গ নিতো তার প্রেমিকা।

'কোপা সামসু' এই বাক্যের সঙ্গে পরিচয় নেই এমন মানুষ নেই দেশে। ‌আমা‌দের সামসু ভাই দীর্ঘ‌দিন নিরু‌দ্দেশ। তার কর্মকাণ্ড প‌রিচালনার দায়িত্ব প‌ড়ে‌ছে হয়তো বদ-রু‌লের ওপর। তাইতো সে কু‌পি‌য়ে‌ছে। বদরুল ভেবেছে তার চাপাতির জয় হবে। আসলেই কি তাই হবে?

উপর্যপুরি খাদিজাতে কোপানের সেই ভিডিও ভাইরাল হেয়েছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে। দেশের ২৬টি টেলিভিশন বারবার দেখিয়েছে সেই ভিডিও। সবগুলো দৈনিক আর অনলাইন ছাপিয়েছে সেই ছবি। সেই ভিডিও দেখে চোখ ছলছল করেছে কোটি মানুষের। ষোল কোটি মানুষের বত্রিশ কোটি হাত হয়তো প্রার্থণা করেছে তার জন্য। অথচ ঘাতক বদরুলকেও পাবলিক যে গণধোলাই দিলো- তার ভিডিও কেউ দেখলো না। কেউ একটু ইস বললো না।

এটা তোর কেমন প্রেম বদরুল? তোর জন্য বিন্দুমাত্র সিমপ্যাথি থাকলো না কারো কাছে। ভোগে নয় ত্যাগেই যে প্রকৃত সুখ তা বুঝলি না হতভাগা!

ইয়াস‌মিন, তনু, রিসা কতোইতো গে‌ছে। কী হ‌বে খা‌দিজা মারা গে‌লে? তবে আশার কথা হলো, খাদিজা শেষ পর্যন্ত জীবনে বেঁচে যাওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। স্কয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন খাদিজার শরীর থেকে বহস্পতিবার লাইফ সাপোর্ট খুলে দেয়া হয়েছে। ধীরে ধীরে তার অবস্থার উন্নতি হচ্ছে। চিকিৎসকরা আশাবাদী হচ্ছেন- খাদিজার বেঁচে থাকার ব্যাপারে। খাদিজা বেঁচে থাকুন, সেটা সবারই প্রত্যাশা। তবে স্বাভাবিক জীবনে আদৌ ফিরতে পারবেন কিনা তা এখনো অনিশ্চিত।  

তবে ‌কী সাজা হওয়া দরকার ঘাতক বদরুলের? ওর মাংস কু‌চি কু‌চি ক‌রে কিমা ক‌রে বিফ বার্গা‌রের ম‌তো ক‌রে কুকুরকে খাওয়া‌লে কেমন হয়?  অথবা চি‌ড়িয়াখানায় বাঘ কিংবা সিং‌হের খাচায় ঝু‌লি‌য়ে দি‌লে কেমন হয়? কোমর অবদি যা‌তে খে‌তে পা‌রে, বা‌কিটা ঝু‌লে থাক‌লো। অনেক দিন তাজা মাংস খায় না প্রাণিগু‌লো। তাতেও কি তার পর্যাপ্ত শাস্তি হবে?

আমার এই মতামত আইন সম্মত না ঠিক, কিন্তু এমন নরপশুদের মধ্যযুগীয় কায়দায় বিচার কিরলে কেউ প্রতিবাদ করবে বলেও মনে হয় না। মধ্যযুগে যেমন হাতের বদলে হাত চোখের বদলে চোখ তুলে নিতো, এসব ক্ষেত্রে কোপানোর বদলে কুপিয়ে শাস্তি দিলে, হয়তো ওই ভয়ে অপরাধ অনেকাংশ কমে আসতো!

যারা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবু‌ক, ট্যুইটারে কিংবা অন্য মাধ্যমে জ্বালাময়ী পোস্ট দিচ্ছেন- খাদিজাকে নিয়ে। আমা‌দের সাম‌নে এমন ঘটনা ঘট‌লে আমরা কি এগিয়ে যাই?

চাপাবাজি না করে সত্যিই যদি সাহস নিয়ে সবাই এগিয়ে যেতাম তবে কি সমাজে এতো অন্যায় অপরাধ থাকতো?

হয়তো থাকতো না। সাংবা‌দিক সমাজ আরো জ্বালাময়ী পোস্ট দি‌চ্ছে। আচ্ছা ২০০৬ সলের ২৮ অক্টোবর আপনা‌দের ক্যাামেরার সাম‌নে একজন‌ মানুষকে পল্ট‌নে ল‌গি বৈঠায় পি‌টি‌য়ে মারল, আপনারা তা‌কে বাঁচা‌লেন না কেন? জানি উত্তর নেই।

হতভাগী খাদিজাকে কোপানের পর টেলিভিশন টক শো'তে বেশ সরব একদল বুদ্ধিজীবী। অনেক উপদেশ দিচ্ছেন। উদ্ধার করছে হামলার স্থান থেকে চিত্রগ্রাহকের গোষ্টির।

কেন ছবি তুলছে? ছবি না তুলে বাঁচাতে কেন এগিয়ে গেলো না?

তাদেরকে বলছি- জনাব, বুকে হাত দিয়ে বলেন এমন সশস্ত্র ক্যাডারের সামনে আপনি কি যেতেন? তার ওপর বদরুল সরকারি দলের ছাত্রলীগের সহ-সম্পাদক। আপনাদের এতো বুদ্ধি, এতো বুঝেন! তাজ্জব না হয়ে পারি না। আপনাদের এতো দরদ! তো নির্যাতনের এ বিষয়ে জ্ঞান ছড়ানের অনুষ্ঠানেও আসেননি ফ্রি বক্তৃতা দিতে। অনুষ্ঠান শেষ করে তো ঠিকই দাঁড়িয়ে থাকেন খামের জন্য। এই টুকু লোভও সামলাতে পারেন না।

থাক সেসব প্রসঙ্গ। যে নারী ভিডিও চিত্র ধারণ করেছেন তাকে গালাগাল দিচ্ছেন। সে ছবি না থাকলে তো প্রমাণই করতে পারতেন না কি করে কী হলো।

পরেন তো কুমিল্লার তনুর মতো বলে দিতেন বন্যপ্রাণীর আক্রমণে ক্ষতবিক্ষত হয়েছে খাদিজার শরীর। যেভাবে তনুর বেলায় বলেছিলেন। এটা আপনাদের মানতেই হবে। ক্ষমতাসীনরা সব সময় ধরা ছোয়ার বাইরেই থাকে। তাদের বিরুদ্ধে কথা বলাও পাপ।

অন্যায় যে করুক তাকে শাস্তি পেতেই হবে। অপরাধী কোনো দলের হতে পারে না। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর এ বক্তব্য আমাদের আশাবাদী করেছে।

প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, অপরাধী যেই হোক তার সাজা হবে, দলের হলেও পার পাবে না।

কিন্তু যে ছাত্র সংগঠনের সঙ্গে জড়িত ছিলো তারা কেন সাহস পায়নি বলতে। 'বদরুল আমাদের সংগঠনের ছেলে। কিন্তু তাকেও ছাড় দেয়া হবে না। শাস্তি তাকে পেতেই হবে।' এই বক্তব্য সংগঠনের নেতারা দিলে কেউ তাদের গালাগাল দিতো না। বরং সংগঠনের শক্ত অবস্থানের কারণে মানুষের আস্থা বাড়তো। একইসঙ্গে সংগঠনের ছেলেরা অপরাধ করার আগে অন্তত ভাবতো ক'বার।

ছাত্রলীগেরর নেতৃত্বে থাকা ছেলেগুলোর বয়স কম। তাই তারা দায়িত্ব নিতে ভয় পেতে পারে। কিন্তু দলটির প্রচার ও প্রকাশশনা সম্পাদক সাবেক বন ও পরিবেশ মন্ত্রী কেন উদোর পিন্ডি বুধোর ঘাড়ে চাপানের চেষ্টা করলো ঠিক বুঝতে পারলাম না। তার বক্তব্য বদরুল ছাত্রলীগ নয়, শিবির হতে পারে। পুরো জাতি তাজ্জব হয়ে গেলো। লিডার বু্কে সাহস সঞ্চার করুন। সাদাকে সাদা, কালোকে কালো বললে শিখুন। জনগণ বাহবা দিবে। জনগণকে নিয়েই যেহেতু রাজনীতি করতে হবে, জনগণের আস্থাভাজন হোন বিরাগভাজন নয়।

রাজনী‌তি‌বিদরা এসব নি‌য়ে মি‌ছিল করে, মিটিং করে মানববন্ধন ক‌রে, সেল‌ফি তু‌লে। তা‌দের একটা উদ্দেশ্য আছে, রাজনৈতিক ফায়দা লোটা।

আমরা কী করতে পারি? মানতেই হবে জনগণের কোনো প্লাটফর্ম নেই। তাই অপরাধীকে শক্ত হাতে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে রাষ্ট্র ব্যবস্থাকেই।

কুমিল্লার তনুর হত্যাকরীর বিচার হয় না, অপরাধী নিয়ন্ত্রক শ্রেণির হওয়ায়। আর ঢাকার আফসান বিচার পায় না অপরাধী শাসক শ্রেণির। তবে কি খাদিজারাও বিচার পাবে না। প্রশ্ন জাগতেই পারে বিচারের বাণী আর কতো নিবৃত্তে কাঁদবে?

আবারো বলবো, আমরা প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যে আস্থা রাখতে চাই। খদিজার ঘাতক বদরুল নিশ্চয়ই পার পাবে না। তাকে কঠোর শাস্তি পেতেই হবে।

(লেখক: গণমাধ্যমকর্মী, maidur2007@yahoo.com এখানে প্রকাশিত সব মতামত লেখকের ব্যক্তিগত, নতুন বার্তা ডটকম’র সম্পাদকীয় নীতির আওতাভুক্ত নয়।)

নতুন বার্তা/এইচএস


Print
আরো খবর
    সর্বশেষ সংবাদ


    শিরোনাম
    Top