সোমবার, ১১ ডিসেম্বর ২০১৭
webmail
Mon, 13 Feb, 2017 12:19:12 PM
মেহেরুন্নেসা জোবাইদা

গেল বছর যখন একুশে ফেব্রুয়ারি হলো তখনও ফাল্গুন মাসেই হলো। আরবি মাস প্রতি বছর ছপাশ ছপাশ করে ইংরেজি মাস থেকে দূরে সরে গেলেও বাংলা মাস মোটামুঠি কাছে পিঠেই থাকে। আমরা তখন নতুন হাইস্কুলে। বাংলাদেশের হাই স্কুল মানেও ক্লাস সিক্স দিয়ে শুরু, এখানের মতো ক্লাস নাইন না। স্কুল থেকে বলা হলো প্রভাত ফেরি হবে। সবাইকে খুব ভোরে ঘুম থেকে উঠে আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙ্গানো.. গান গাইতে গাইতে মালা নিয়ে অস্থায়ী শহীদ মিনারে যেয়ে মালা দিতে হবে। তারপর হবে আরেক পর্ব। স্কুলের শিক্ষার্থীরা মিলে একক এবং যৌথ সংগীত গাইবে। আমাদের সে কী উত্তেজনা!

সপ্তাহ তিন ধরে শাখাওয়াত স্যার স্কুলে আমাদের গান শেখাচ্ছেন, “ওরাই মোদের মুখের ভাষা কাইরা নিতে চায়..” কী আবেগ আর মমত্ববোধ নিয়ে শেখা সেই গান।

সকালে দেরি হতে পারে ভেবে আমরা আগের দিনই ভাইট, হারগুজিকাটা এবং মান্দারের ফুল এক করে মালা বানাই। সকাল বেলা খালি পায়ে (তখন আমরা এমনিতেও বৃষ্টি-টৃষ্টি হলে খালি পায়ে স্কুলে যেতাম) সেই দুই গ্রাম মিলিয়ে রাস্তায় দলবেঁধে হাঁটছি আর গাইছি , “আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙ্গানো একুশে ফেব্রুয়ারি আমি কি ভুলিতে পারি।”

বেদীতে ফুল দেয়া হলে আমাদের নেয়া হলো স্কুলের মাঠে। সেখানে শুরু হলো গানের অনুষ্ঠান। কিছুক্ষণ আগের সেই দুঃখ দুঃখ ভাব পাল্টে জমে উঠলো উৎসব আর আমেজের অনুষ্ঠান।

গম গমিয়ে দলীয় সঙ্গীত শুরু হলো, “তীর হারা এই ঢেউয়ের সাগর পাড়ি দিব রে”। আমার বড়বোন গাইছিলেন এই দলে। পরের গানে যোগ দিলাম আমি, “ওরাই আমার মুখের ভাষা কাইড়া নিতে চায়।: দিপুর একক গান, “মাগো আটই ফাল্গুনের কথা আমরা ভুলবো না।”

আর আমার আবৃত্তি, “কুমড়ো ফুলে ফুলে নুঁয়ে পড়েছে লতাটা” । দিপু গানে অতি অত্যন্ত পারদর্শী হলেও আবৃত্তিতে কখনোই আমি পটু ছিলাম না। আমার চ/ছ’য়ের সমস্যা সেই শিশুবেলা থেকে।

তারপরও কবিতাটি পছন্দ হয় আমার। আমার আগ্রহের কারণেই হয়তো স্যারেরা আমাকে কবিতা বলাতে রাজী হন। সাংস্কৃতিতে আমাদের স্কুলটি সব সময়ই এগিয়ে ছিলো। ছিল ধর্ম-কর্মেও।

আরবি স্যারের বয়ানের কারণে কাউকে কখনো প্রেম পিরিতে মনোনিবেশ করতে দেখিনি। সেই সব দিনে ধর্ম পালন আর সংস্কৃতি কেউ কাউকে হুমকি মনে করেনি। যে ছেলে বা মেয়েটি স্কুলে গান করছে সে-ই খুব সকালে উঠে নামায পড়েছে এবং পরীক্ষায় ভালো ফল করার জন্য দোয়া করে নফল রোজা রাখছে। স্কুলের কমন রুমে আমরা মেয়েরা নামায পড়েছি আবার স্কুলের অনুষ্ঠানে গানও করেছি।

ক্লাস ফাইভে উঠেও আমি স্কুলের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে নেচেছি অন্তরা চৌধুরীর তাথৌ তাথৌ গানের সাথে। সেই সব দিনের পরে আজ এসেছে আরেক সময়। মানুষ সংস্কৃতি এবং ধর্ম দুইটা নিয়েই খুব “সচেতন”।

তারা কোনোভাবেই একটাকে আরেকটার সাথে সমান্তরালে চলতে দিতে রাজি না। দেখেছি যে মানুষটি ঘর সংসার সবই অবাঙ্গালীদের সাথে করছে, জিন্স টি পরছে, পরছে শাড়ি, সালোয়ার কামিজ ও ফতুয়াও। কখনো কালে ভদ্রে অনুষ্ঠানে সে মানুষটিই সংস্কৃতির বড় মুখ। তাকেই যেন বাতলে দিতে হবে সংস্কৃতি কী। তার অনুমতি আর অনুমোদন ছাড়া কোনোকিছু যেনো বাঙালি হবে না।

আবার যে মানুষটি রোদ না উঠলে ঘুম থেকে ওঠে না, সে হয়ে যায় ধর্মের প্রধান ত্রাণকর্তা, “ধর্মের পক্ষ শক্তি”।

তার কথায় আগুন ঝড়ে, মানুষ নড়ে চড়ে বসে। সংস্কৃতি আর ধর্মের নামে শুরু হয়ে যায় বিভাজন। ফুল নিয়ে যাওয়া হয়ে যায় ধর্ম বিরুদ্ধ কাজ।

আমি পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের মানুষদের দেখেছি মৃতদের উদ্দেশ্যে ফুল ও মোমবাতি জ্বালিয়ে ভালোবাসা প্রকাশ করতে। মুসলমানদের কম দেখিনি। কারো মনে সেটা পূজার আকারে হয়েছে বলে জানিনি। নিয়ত অনুযায়ী আমল হলে সেই শিশুবেলা থেকেই কোনো মুসলমানকে আমি পূজার উদ্দেশ্যে ফুল নিয়ে বেরুতে দেখিনি।

আমি এই ফুলের মধ্যে যেমন শহীদদের কোনো প্রাপ্তি দেখিনি তেমনি কারো শিরকের কোনো মনোভাবও দেখিনি। ফুল দেয়ার পর বরং সবসময়ই শুরু হয় নিজেদের কর্ণ তৃপ্তির অনুষ্ঠান। শহীদরা সেই অনুষ্ঠানে গান শুনতে আসেন বলে মনে হয়না। তবে আমরা বাচ্চা বেলায় বিষয়টা খুবই ঘটা করে উপভোগ করেছি এটা সত্য।

এই ঘটা করে পালনে একটা কাজ অবশ্য হয়েছে, আমরা কোনোভাবেই ভুলিনি যে এ দিনটি মাতৃভাষাদিবস এবং জাতীয় শোক দিবস, যদিও শোকের নামে আমাদের আনন্দই ছিলো বেশি।

লেখিকা: মেহেরুন্নেসা জোবাইদা, মিডিয়া ব্যক্তিত্ব, নিউইয়র্ক প্রবাসী।

(এখানে প্রকাশিত সব মতামত লেখকের ব্যক্তিগত, নতুন বার্তা ডটকম’র সম্পাদকীয় নীতির আওতাভুক্ত নয়।)

নতুন বার্তা/ওএফএস


Print
আরো খবর
    সর্বশেষ সংবাদ


    শিরোনাম
    Top
    close