বুধবার, ১৩ ডিসেম্বর ২০১৭
webmail
Tue, 07 Mar, 2017 04:47:25 PM
মো: নুর নবী

জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ঐতিহাসিক ৭ মার্চের ভাষণ ইতিহাসের এক অনন্য দলিল। বিশ্বের শ্রেষ্ঠ ভাষণগুলোর মধ্যে এ ভাষণটিও শ্রেষ্ঠতম হিসেবে বিবেচিত। বঙ্গবন্ধুকে বিবিসির শ্রোতাদের ভোটে শতাব্দীর শ্রেষ্ঠ বাঙালি হিসেবে বিজয়ী করতে ৭ মার্চের ভাষণ অসাধারণ ভূমিকা পালন করেছে। মাত্র উনিশ মিনিটের ভাষণে তিনি বাঙালির হৃদয়ে জমে থাকা দীর্ঘদিনের অনুভুতির বহিঃপ্রকাশ ঘটিয়েছেন। বাংলার নির্যাতিত মানুষের প্রিয় নেতা হিসেবে বঙ্গবন্ধু পাকিস্তানের স্বৈরাচার সামরিক শাসকগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে অত্যন্ত সহজ ও সরল বাংলা ভাষায় যে কঠোর ও যুক্তিসম্মত বক্তব্য তুলে ধরেন তা ছিল বাংলার মানুষের হাজার বছরের বঞ্চনা-লাঞ্ছনা এবং সংগ্রামের ইতিহাস। এক হাজার একশত সাতটি শব্দে তিনি তাঁর ভাষণ শেষ করেন এবং এতে অধিকার বঞ্চিত বাঙালির হাজার বছরের লুকায়িত আশা-আকাঙ্খা ও স্বপ্নের প্রতিফলন উন্মোচিত হয়। বাংলাদেশের স্বাধীনতার মূলমন্ত্র ও মূলসূত্র ৭ মার্চের এ বক্তৃতা। মুক্তিযুদ্ধের নয়মাস এ বক্তৃতা ছিল আমাদের যুদ্ধস্লোগান। গবেষকদের মতে, এ ভাষণই ছিল বস্তুত স্বাধীনতার ঘোষণা।

বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণের বহুমাত্রিক গুরুত্ব লক্ষ্যণীয়। কেউ কেউ এ ভাষণকে মার্কিন গণতন্ত্রের পথ নির্দেশক আব্রাহাম লিঙ্কনের ’গেটিসবার্গ এ্যাড্রেস’ (১৮৬৩) বা মার্টিন লুথার কিং (জুনিয়র) ’আই হ্যাভ এ ড্রিম’ (১৯৬৩) ভাষণের সঙ্গে তুলনা করেন। তবে রেসকোর্স ময়দানের ভাষণটি ছিল আমার মতে আরো অনেক বেশি সুদূর প্রসারী, অধিক গতিময় ও অনেক তাৎপর্যপূর্ণ। লিঙ্কন তাঁর ভাষণটি দিয়েছিলেন গৃহযুদ্ধ বিধ্বস্ত আমেরিকানদের জাতি গঠনে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আবেদন জানিয়ে, আর লুথার কিং সাদা-কালো সব মানুষের সমান অধিকারের স্বপ্ন দেখেছিলেন। আবার কেউ কেউ মনে করেন, দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের সময়ে উইনস্টোন চার্চিলের (১৯৪০) একটি ভাষণের সঙ্গে বঙ্গবন্ধুর ভাষণের কিছুটা তুলনা করা যেতে পারে। চার্চিল বৃটিশদের জার্মান ফ্যাসিস্ট শক্তিকে প্রতিহত করতে উদ্দীপ্ত করেছিলেন আর বাঙালি জাতির জনক স্বাধীনতার ডাক দিয়েছিলেন পাকিস্তানি ঔপনিবেশিক শক্তির শৃঙখল থেকে মুক্তির জন্য। আমাদের বিবেচনায় বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ উপরিউক্ত ভাষণগুলোর চেয়ে অনেকাংশেই বেশি গুরুত্বের দাবি রাখে। কারণ, এর সঙ্গে একটি জাতি গঠন প্রক্রিয়ার পূর্ণতা এবং একটা জাতিগোষ্ঠীর হাজার বছরের রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার ইচ্ছা-আকাঙ্খা, স্বপ্ন ও বিপুল আত্মত্যাগের ইতিহাস যুক্ত রয়েছে। এই ভাষণেই স্বাধীনতা সংগ্রামকে মুক্তিযুদ্ধে রূপান্তরিত করার কৌশল এবং তাতে সাফল্য লাভের সুষ্ঠু দিক নির্দেশনা দেয়া আছে।

বঙ্গবন্ধুর অসমাপ্ত আত্মজীবনী থেকে জানা যায়, কিশোর বয়সে তিনি সুভাষ বসুর বিপ্লবী রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে আকৃষ্ট হয়েছিলেন। বহু রাজনৈতিক মনীষীর জীবন ও কর্মের তিনি ছিলেন অনুরাগী পাঠক। তাই তাঁর চার্চিল চর্চাও স্বাভাবিক ঘটনা। ফলে ৭ মার্চের ভাষণ যখন তিনি মনে মনে তৈরি করেন তখন লিঙ্কন, চার্চিল ও নেতাজী’র প্রাসঙ্গিক ভাষণকে অবশ্যই তিনি স্মরণ করে থাকতে পারেন। তবে ৭ মার্চের অনন্যসাধারণ ভাষণ শুধু তাঁরই এক অবিস্মরণীয় বিস্ময়। ভাষণের মূল কথা যদি খুঁজি তাহলে দেখা যায়, পূর্ব বাংলার মানুষের বঞ্চনার ইতিহাস ও অধিকারহীনতার বিষয় এতে দীপÍ হয়ে উঠেছে; এবং পাকিস্তানি ঔপনিবেশিক শাসন থেকে স্বাধীনতা লাভের মাধ্যমেই এ অবস্থা থেকে বাঙালির সার্বিক মুক্তি সম্ভবÑ এই বক্তব্যই বঙ্গবন্ধু তাঁর বক্তৃতায় অতুলনীয় ভঙ্গিতে শ্রোতার সম্মুখে তুলে ধরেছেন। তাঁর বক্তব্যের মূল বিষয় ছিল ৪টি; যথাÑ (ক) চলমান সামরিক আইন প্রত্যাহার (খ) সৈন্যদের ব্যারাকে ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়া (গ) গণহত্যার তদন্ত করা এবং (ঘ) নির্বাচিত প্রতিনিধিদের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর করা।

মানবিক বোধের শ্রেষ্ঠত্ব, গণতান্ত্রিক চেতনার উজ্জ¦লতা এবং নিপীড়িত মানুষের স¦াধীকার অর্জন ও আর্থ-সামাজিক মুক্তির অনন্য দলিলÑ এ ভাষণটির গঠনে যেমন কৌশলময়তা আছে, তেমনি কূটনৈতিক প্রজ্ঞা, ইতিহাস থেকে নেয়া শিক্ষা, সময়-জ্ঞান ও শব্দ চয়নের কৌশলময়তা লক্ষণীয়। জাতিয় অধ্যাপক কবির চৌধুরী বলেছেন, “এই ভাষনেই স্বাধীনতা ঘোষিত হয়ে গেছে, তবে বঙ্গবন্ধু শব্দচয়নের কৌশল হিসেবে বলেছেন, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম। যদি বলতেন, আজ থেকে বাংলাদেশ স্বাধীন, সেটা হতো হঠকারিতা এবং তাতে মহা বিপর্যয় ঘটতো।” ৮ মার্চ পাকিস্তানপন্থী পত্রিকা মর্নিং নিউজ বঙ্গবন্ধুর ভাষণ সম্পর্কিত প্রতিবেদনের শেষ অংশটি ছিল এরূপ- Sheikh Mujibur Rahman described the present struggle ‘as the struggle for emancipation (mukti) and struggle for freedom (Swadhinata)’ He referred to this point twice in his speech. (Morning News, 8th March, 1971).ভাষাগত চাতুর্যের কারণে পাকিস্তান সরকার তাঁর বিরুদ্ধে  রাষ্ট্রদ্রোহিতার অভিযোগ আনতে পারেনি।

মার্চের প্রথম থেকেই আন্দোলন চাঙ্গা হতে থাকে। ৭ মার্চ বঙ্গবন্ধুর আহ্বানে সাড়া দিয়ে পরদিন থেকে দেশে ব্যাপক আন্দোলন শুরু হয়ে যায়। বঙ্গবন্ধুর নির্দেশ অনুযায়ী দেশের সকল স্কুল-কলেজ, অফিস আদালত বন্ধ হয়ে যায়। বস্তুত বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ঘোষণার পর থেকে বাংলাদেশে অসহযোগ ও প্রতিরোধ আন্দোলন জোরদার হয়। এভাবে বঙ্গবন্ধুর আদেশ জারির মাধ্যমে পূর্ব পাকিস্তান সরকারের প্রত্যক্ষ নিয়ন্ত্রণ অকেজো হয়ে পড়ে। কেবল সৈন্যবাহিনী ব্যতীত সর্বত্র আওয়ামী লীগের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত হয়। আর বঙ্গবন্ধু এতে হয়ে ওঠেন পূর্ব-বাংলার প্রধান নেতা। পাকিস্তান সরকারকে বিষয়টি ব্যপকভাবে নাড়া দেয়।
 
মুক্তিযুদ্ধের নয় মাস বঙ্গবন্ধুর এই ভাষণ স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে ’বজ্রকণ্ঠ’ নামে প্রচারিত হয় যা বাঙালিকে স্বাধীনতার জন্য অনুপ্রাণিত করেছিল। ৭ মার্চের ভাষণ বঙ্গবন্ধুর অমর রচনা, বাঙালির মহাকাব্য। তাইতো মার্কিন সাময়িকী নিউজ উইকস (৫ এপ্রিল,১৯৭১) তাঁকে রাজনীতির কবি (Poet of Politics) হিসেবে আখ্যা দিয়েছে। বাংলা ভাষায় আঁকা রেসকোর্সের জনসমুদ্রে বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ভাষণের সর্বসেরা কাব্যচিত্র ফুটে উঠেছে কবি নির্মলেন্দু গুণের অনন্য কবিতায়-

একটি কবিতা লেখা হবে তার জন্য অপেক্ষার উত্তেজনা নিয়ে
লক্ষ লক্ষ উন্মত্ত অধীর ব্যাকুল বিদ্রোহী শ্রোতা বসে আছে

ভোর থেকে জন সমুদ্রের উদ্যান সৈকতে: ’কখন আসবে কবি’?

বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের বক্তৃতা আমাদের অমূল্য উত্তরাধিকার, যার গৌরব অনুভূত হবে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে।

লেখক: মো: নুর নবী, বিতার্কিক ও সংগঠক; এমফিল গবেষক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। ই-মেইল: nurnabi.ihc@gmail.com

এখানে প্রকাশিত সব মতামত লেখকের ব্যক্তিগত, নতুন বার্তা ডটকম’র সম্পাদকীয় নীতির আওতাভুক্ত নয়।


Print
আরো খবর
    সর্বশেষ সংবাদ


    শিরোনাম
    Top
    close