শুক্রবার, ১৮ আগস্ট ২০১৭
webmail
Tue, 14 Mar, 2017 08:02:30 PM
সিরাজুল ইসলাম

সাংবাদিকতার সূত্রে ইরানের রাজধানী তেহরানে আছি প্রায় সাত বছর। বলে রাখি এ নিয়ে দ্বিতীয় দফায় ইরানে সাংবাদিকতা করতে আসা। যাই হোক, দ্বিতীয় দফার সাত বছরে ইরানে সামান্য কিছু জায়গায় গিয়েছি বেড়াতে। কাজের ভিড়ে এবং নানা কারণে খুব একটা কোথাও যাওয়া হয়ে ওঠে না।

সম্প্রতি আমার দুই ছেলে খুব করে ধরলো, ইরানে এতদিন থাকছি কিন্তু ইসলামি বিপ্লবের রূপকার ইমাম খোমেনীর মাজারে যাওয়া হলো না। এটা কী মানানসই? কথাগুলো শুনে হাসলাম এবং ভাবলাম খুবই সত্যি কথা। এটা আসলেই বেমানান!

কথা না বাড়িয়ে বললাম- কবে যেতে চাও? ওরা বললো- তোমার সুবিধা। দিন-তারিখ ঠিক করলাম এবং ১১ মার্চ শনিবার যাওয়ার জন্য ধার্য করলাম। আমার এক সহকর্মীকে বললে তিনিও পরিবার নিয়ে যাওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করলেন। অবশেষে শনিবার সকালে দুই পরিবার মিলে রওয়ানা দিলাম মহান নেতার মাজার জিয়ারতের উদ্দেশে।

বাসা থেকেই ট্যাক্সি নিলাম। সোজা রওয়ানা দিলাম তেহরানের মেট্রো স্টেশনে। পাতাল  রেলে করে গেলে একদম সহজ জার্নি। কারণ ইমাম খোমেনীর মাজার কম্পাউন্ডেই রয়েছে  মেট্রো স্টেশন। ফলে মেট্রোতে গেলে আমরা নারী-শিশু নিয়ে একেবারে মাজারে গিয়ে  পৌঁছাবো। অতএব, সিদ্ধান্ত অনুযায়ী  মেট্রোতে চেপে বসলাম। মাঝে একটি স্টেশন  থেকে ট্রেন বদলে প্রায় এক ঘণ্টার জার্নি শেষে  পৌঁছে গেলাম পরম প্রত্যাশিত গন্তব্য- ইমাম  খোমেনীর মাজারে।

মেট্রো থেকে নেমেই দেখি মাজার কমপ্লেক্স। কী অপরূপ দৃশ্য তার! বিরাট বিশাল এলাকা জুড়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে মাজার ভবন। ওপরে সুউচ্চ চারটি মিনার। সোনা দিয়ে মোড়ানো বিরাট গম্বুজ। সামনে ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানের লাল, সাদা, সবুজ রঙের জাতীয় পতাকা পত্‌ পত্‌ করে উড়ছে। সুনসান নীরবতায় নিবিষ্ট মনে যেন ইসলামি বিপ্লবের বিজয় ঘোষণা করে চলেছে কালেমাখচিত বিশাল পতাকা।

মাজার ভবনে যাওয়ার পথে প্রথমেই পড়লো বিশাল পানির ফোয়ারা, যেন আগত অতিথিকে অভ্যর্থনার জন্য তার সবটুকু প্রচেষ্টা নিবেদন করে যায়। গ্রীষ্মে আগন্তুক অতিথি নিশ্চয় অমন নান্দনিক ফোয়ারার আন্তরিক ছোঁয়ায় খানিকটা চাঙ্গা হয়ে ওঠেন বটে! মাজার কমপ্লেক্সের সামগ্রিক বিস্ময়কর দৃশ্যে মুহূর্তে অভিভূত হলাম।  

১৯৮৯ সালের ৩ জুন ইমাম খোমেনী ইন্তেকাল করেন। তাকে সমাহিত করা হয় রাজধানী তেহরানের দক্ষিণ উপকণ্ঠে বিখ্যাত ‘বেহশতি জাহরায়’। ওই বছরই তার কবরকে ঘিরে শুরু হয় মাজার কমপ্লেক্স নির্মাণের কাজ। ২০ বর্গ কিলোমিটার এলাকা জুড়ে তৈরি হয়েছে মাজার কমপ্লেক্স। তবে এর নির্মাণ ও সংস্কারকাজ এখনো শেষ হয়নি। নানা ধরনের পরিবর্তন, পরিবর্ধন এবং সংস্কারের কাজ চলছে। পুরো মাজার ভবনের দেয়াল ও মেঝে মার্বেল পাথরে মোড়া। মাজার কমপ্লেক্স নির্মাণের যিনি কারিগর তিনি হলেন আর্কিটেক্ট মোহাম্মাদ তেহরানি।

ইমাম খোমেনীর কবরকে রূপার তৈরি জালি দিয়ে ঘিরে রাখা হয়েছে। এই জালির ভেতরেই ইমামের পাশে রয়েছে তার দ্বিতীয়  ছেলে আহমদ খোমেনীর কবর। তার পেছনে (জালির মধ্যেই) কবর দেয়া হয়েছে সদ্য পরলোকে গমন করা ইরানের সাবেক  প্রেসিডেন্ট আয়াতুল্লাহ আলী আকবর হাশেমি রাফসানজানিকে।

জালির বাইরে আরো কয়েকটি কবর রয়েছে। তার মধ্যে রয়েছে ইমাম খোমেনীর স্ত্রী খাদিজা সাকাফির কবর। রয়েছে সাবেক ভাইস প্রেসিডেন্ট হাসান হাবিবির কবর। শুয়ে আছেন সেনা কর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট জেনারেল আলী সাইয়্যেদ শিরাজি, বিপ্লবের অন্যতম প্রাণপুরুষ আয়াতুল্লাহ সাদেক তাবাতাবায়ি এবং সাবেক এমপি মারজিয়ে হাদিদচি।

মাজার কমপ্লেক্সে রয়েছে বিশাল সাংস্কৃতিক ও পর্যটন কেন্দ্র। ইউনিভারসিটি ফর ইসলামি স্টাডিজ, একটি মাদরাসা, বিরাট কবরস্থান, শপিং মল এবং ২০ হাজার গাড়ি রাখার জন্য পার্কিং লট।

খাবার-দাবারের জন্য রয়েছে বেশ কিছু হোটেল-রেস্টুরেন্ট এবং অত্যন্ত সুন্দর ব্যবস্থা। পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন বাথ-টয়লেটেরও সুব্যবস্থা রয়েছে। জনগণের দানের অর্থেই গড়ে উঠছে বিশাল এ মাজার কমপ্লেক্স। তবে কোনো কোনো সূত্র দাবি করে সরকারি অনুদানও নাকি রয়েছে।  

ভেতরে রয়েছে দারুণ সব কারুকার্যময় শিল্পকর্ম। মাজারের ভেতরেই বিশাল এলাকা জুড়ে রয়েছে নামাজের স্থান; সেখানে নিয়মিত জামাত হয়। মাজারের ভেতরটা নয়নাভিরাম বিখ্যাত ইরানি কার্পেট দিয়ে আবৃত। ভেতরে গেলে চোখে পড়বে কেউ পবিত্র কোরআন তেলাওয়াত করছেন, কেউ তাসবিহ-তাহলিলে রত আবার কেউবা নামাজ পড়ছেন। আবার কেউ বসে কথা বলছেন, কেউ কেউ মাজার জিয়ারত করছেন, হৃদয়ের সমস্ত শ্রদ্ধা-ভালোবাসা নিংড়ে দিয়ে দোয়া করছেন; মহান রবের কাছে মনের কথা খুলে বলছেন।

মাঝেমধ্যেই চোখে পড়বে দেশ-বিদেশ থেকে আসা ইমাম খোমেনীর ভক্ত পর্যটক কিংবা রাষ্ট্রীয় কোনো অতিথি। তবে, মাজারকে ঘিরে নেই কোনো উটকো ঝামেলা, নেই আতর-লুবান বিক্রির হৈ-হুল্লোড়, নেই কোনো গাঁজাখোরের আনাগোনা, নেই কোনো ফটকাবাজের আড্ডা।

চমৎকার তথ্য হচ্ছে- অমুসলিমরাও মাজার ভবনের ভেতরে প্রবেশ করতে পারেন। নারী-পুরুষ সবার জন্য আলাদা প্রবেশ পথ। ভেতরে ঢুকতে সামান্য সিকিউরিটি চেক হবে।

জিয়ারত, নামাজ ও দুপুরের খাওয়া-দাওয়া  শেষে আরো কিছুক্ষণ ঘুরে ফিরে দেখে বাসার উদ্দেশে রওয়ানা দিলাম। এই অল্প সময়ে মাজার কমপ্লেক্সের সিংহভাগই দেখা হলো না; তবে মনে হলো যা পেয়েছি তার মূল্য অনেক। মনে হলো পরম প্রাপ্তিতে ভরে গেছে মনটা।

লেখক: প্রবাসী সাংবাদিক ও কলামিস্ট।

নতুন বার্তা/এইচএস


Print
আরো খবর
    সর্বশেষ সংবাদ


    শিরোনাম
    Top