বুধবার, ২৮ জুন ২০১৭
webmail
Fri, 07 Apr, 2017 03:19:03 PM
হুমায়ুন সাদেক চৌধুরী

কাশ্মীরকে একসময় বলা হতো ভূস্বর্গ অর্থাৎ পৃথিবীর বেহেশত। সেই 'স্বর্গে' এখন নরকের আগুন জ্বলছে। যখন-তখন এনকাউন্টার, হত্যা, রাজপথে বিক্ষোভ, অঘোষিত কারফিউ - সবই কাশ্মীরে খুবই চেনা দৃশ্য এখন।
এরকম একটা গোলযোগপূর্ণ পরিস্থিতিতে বসবাস কঠিন, সাংবাদিকতা কঠিনতর। তারপরও সেখানে মানুষ বাস করছে, সাংবাদিকতাও হচ্ছে। আর সাংবাদিকতার অঙ্গণে পুরুষদের পাশাপাশি, সংখ্যায় কম হলেও, এগিয়ে আছে কাশ্মীরী নারীরা।

আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির কারণে কাশ্মীরে সাংবাদিকতা করা সবার জন্য কঠিন হলেও সামাজিক পরিস্থিতির কারণে নারীদের জন্য তা আরো কঠিন। কারণ, কাশ্মীর হলো রক্ষণশীল মুসলিম এলাকা।

কাশ্মীরের সংবাদপত্রগুলোও একজন নারী সাংবাদিককে নিয়োগ দেয়ার আগে ১০ বার ভাবে আর ১০ রকম প্রশ্ন করে : একজন নারী রিপোর্টারের নিরাপত্তা দেবে কে এবং কীভাবে। পুরুষ সহকর্মীর তুলনায় তার জন্য কাজটা কী বেশি ঝুঁকিপূর্ণ নয়? বিপজ্জনক এলাকায় তাকে অ্যাসাইনমেন্টে পাঠানো কি ঠিক হবে? ইত্যাদি।

এসব প্রশ্ন ও উদ্বেগের বেড়াজালকে তুচ্ছ করে যেসব কাশ্মীরী নারী পুরুষদের পাশাপাশি সাংবাদিকতায় প্রবেশ করছেন, গাজী মারুফ তাদের একজন। ২৩ বছর বয়সী এ তরুণী রাইজিং কাশ্মীর পত্রিকার নগর প্রতিবেদক হিসেবে যোগ দিয়েছেন বছরখানেক আগে। তিনি বলেন, আমি সাংবাদিক হতে চেয়েছিলাম, সাংবাদিক হয়েছি। এর মধ্যে ‘নিউজ’ হওয়ার কিছু নেই।

মারুফ একা নন, সাংবাদিকতা অঙ্গণের দিকে ক্রমবর্ধমান হারে ছুটে আসা কাশ্মীরী তরুণীদের দল নিজেদের পেশাকে ভালোবাসেন। যেমন, সৈয়দ আসমা (২৬)। ২০১১ সাল থেকে এই পেশায় আছেন তিনি। কাজ করেন ইংরেজি সাপ্তাহিক ম্যাগাজিন কাশ্মীর লাইফ-এ। তার কথা, মনের ভেতর গুমরে ওঠা অনেক অনুভূতিই আমি এই পেশার সাহায্যে প্রকাশ করতে পারি।

আসমা মনে করেন, রিপোর্টিং করার ক্ষেত্রে মেয়েদের আলাদা একটা ‘ধার’ আছে।

গোলযোগপূর্ণ এই অঞ্চলটির নারীদের সাংবাদিকতায় আসার পেছেনে অনেক সময় অনেক গল্পও থাকে। যেমন, তেহরানের প্রেসটিভির কাশ্মীর প্রতিবেদক শাহানা বাট (২৩)। তিনি এ পেশায় আসেন ২০০৮ সালে। তখন চলছিল অমরনাথ ভূমি বিরোধ। শাহানা বলেন, রাস্তায় চলছে মানুষের বিক্ষোভ আর বাসায় বসে আমার যেন নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে যাচ্ছিল। আমি চেয়েছিলাম কাশ্মীরে কী ঘটছে, তা নিয়ে রিপোর্ট করতে।

তবে, আগেই বলা হয়েছে, কাশ্মীরের মতো গোলযোগপূর্ণ এলাকায় নারীদের পক্ষে রিপোর্টিং করা বড় সহজ নয়। শাহানা বাটের অভিজ্ঞতা এক্ষেত্রে উল্লেখের দাবি রাখে। তিনি বলেন, আমি যখন প্রথম শুরু করি তখন লোকজন অবাক হয়ে আমাকে দেখতো আর ভাবতো, এই মেয়ে মাইক্রোফোন হাতে নিয়ে রাস্তায় দাঁড়িয়ে আছে কেন আর মানুষজনকেই বা কী প্রশ্ন করছে!

শাহানা বলেন, কাশ্মীরে নারীদের সাংবাদিকতা করার বাস্তব অসুবিধাও আছে। যেমন, এই পেশায় রাত করে বাড়ি ফিরতে হয়। আর কাশ্মীর এমন একটি এলাকা, যেখানে রাত ৮টার মধ্যেই সবকিছু বন্ধ হয়ে যায়। তাই কেউ যদি ৭টার মধ্যে বাড়ি না-ফেরে, তাহলে বাড়ির সবাই দুশ্চিন্তায় পড়ে যায়। মেয়েদের বেলায় এই দুশ্চিন্তা আরো বেশি।

আরো বাধা আছে। যেমন, কাশ্মীরে শীর্ষস্থানীয় ইংরেজি দৈনিক গ্রেটার কাশ্মীর –এর একটি উর্দু দৈনিক ও একটি মাসিক ম্যাগাজিন আছে। কিন্তু তারা কেউই নারী সাংবাদিক নিয়োগ দেয় না। কেন ? কর্তৃপক্ষের জবাব, ‘নারীদের জন্য অফিসে আলাদা ওয়াশরুম নেই, তাই।’ বুঝুন অবস্থা।

তবে কোনো বাধাই কাশ্মীরী নারীদের সাংবাদিকতা থেকে দূরে সরিয়ে রাখতে পারেনি। দূরদর্শন-এর স্ট্রিংগার হিসেবে ফারজানা মুমতাজ (৩৫) সাংবাদিকতায় আসেন ২০০২ সালে। এখন তিনি নিউজ কাশ্মীর নামে একটি ইংরেজি সাপ্তাহিক ম্যাগাজিন চালান। শুরুর দিনগুলোর স্মৃতিচারণ করে তিনি বলেন, তখন কাশ্মীরে কোনো নারী সাংবাদিক খুঁজে পাওয়া ছিল দুস্কর। একজনের কথা শুধু জানতাম, তিনি কাজ করতেন উর্দু দৈনিক আফতাব- এ।

ফারজানা বলেন, সাংবাদিক হিসেবে আমাকে পুলিশ ও বিচ্ছিন্নতাবাদী – দুপক্ষের সঙ্গেই যোগাযোগ রাখতে হয়। কিন্তু সমাজ বিষয়টা মেনে নিতে চায় না। তবে অবস্থা আগের চেয়ে অনেক উন্নত হয়েছে। এখন আমাদের চারপাশে অনেক নারী সাংবাদিক, আসছে আরো অনেকে।

অনেকে আসতে থাকলেও বাস্তবতা হচ্ছে, তারা সবাই কাজ করে স্থানীয় মিডিয়ায়। অথচ প্রধান চারটি জাতীয় টিভি চ্যানেল টাইমস নাউ, এনডিটিভি, সিএনএন-নিউজ ১৮ ও ইন্ডিয়া টিভির ব্যুরো অফিস আছে শ্রীনগরে। তাদের কোনোটাতেই একজন নারী সাংবাদিকও নেই। কাশ্মীরে নারী টিভি সাংবাদিক বলতে একজনই – শাহানা বাট। তিনি কাজ করেন ইরানের সরকারি টিভি প্রেসটিভিতে।

ভারতের চার শীর্ষ দৈনিক – ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস, হিন্দুস্থান টাইমস, দি ট্রিবিউন ও দ্য হিন্দুর ও কাশ্মীরে ব্যুরো অফিস আছে। এই চার অফিসে নারী সাংবাদিক বলতে সাকুল্যে আছে দুইজন।

এ অবস্থার ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে হিন্দুস্থান টাইমস-এর শ্রীনগর ব্যুরোপ্রধান তৌফিক রশিদ বলেন, সবচাইতে বড় বাধাটা আসে নিউজরুমের ভেতর থেকে, সহকর্মীদের মধ্য হতে। কাশ্মীরে এই ক্ষেত্রটা এখনো পুরুষ-নিয়ন্ত্রিত। তাই নারীদের এখনো মনে করা হয় বহিরাগত। তবে সবাই এরকম নয়।

তিনি বলেন, আবার এমনও ভাবা হয়, নারী সাংবাদিকের কাজ হলো নারী বিষয়ক ইস্যুতে অথবা বড় জোর তারা হেলথ রিপোর্টিং করতে পারে। কিন্তু ভাবনাটা ঠিক নয়। আমি এখানে এমন কয়েকজনের সঙ্গে কাজ করেছি, যারা পুরুষ সহকর্মীদের চাইতে কয়েক কদম এগিয়ে।

এরকম একজন হলেন সুমাইয়া ইউসুফ (২৫)। কাজ করেন ইংরেজি দৈনিক রাইজিং কাশ্মীর- এ। তাঁর কাজের ক্ষেত্র প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তা।

কাশ্মীরে নারী সাংবাদিকরা অপর যে সমস্যাটির মুখে পড়েন, তা অবশ্য সারা বিশ্বেই আছে। সেটি হলো, বেতনবৈষম্য। ইংরেজি দৈনিক গ্রেটার কাশ্মীর-এর সাংবাদিক জেহরু নিসা (৩৪) বলেন, শুরুতে আমি দেখি কি, একই কাজ করে পুরুষ সহকর্মীরা আমার চেয়ে অনেক বেশি বেতন পাচ্ছে। আমি অবশ্য এটা মেনে নিইনি। পাওনা আদায় করেই ছেড়েছি।

কাশ্মীরে ছোট-বড় মিলিয়ে আটশ’র বেশি সংবাদপত্র আছে। এর মধ্যে প্রধান কয়েকটি হলো গ্রেটার কাশ্মীর, রাইজিং কাশ্মীর, কাশ্মীর রিডার, কাশ্মীর লাইফ ও কাশ্মীর টাইমস। এসব পত্রিকায় ১০ জন নারী সাংবাদিক আছে। উর্দু দৈনিকগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে আফতাব, কাশ্মীর উজমা, সাংগারমল প্রভৃতি। তবে সেগুলোতে একজন নারী সাংবাদিকও নেই।

যাহোক, নানামুখী বাধার বিন্ধ্যাচল অতিক্রম করে কাশ্মীরের নারীরা সাংবাদিকতায় আসছে এবং কাজ করে যাচ্ছে – এটাই বাস্তবতা। কাশ্মীর বিশ্ববিদ্যালয়ের মিডিয়া এডুকেশন রিসার্চ সেন্টারের প্রফেসর আলিয়া আহমেদ বলেন, সারা দুনিয়ায় নারী সাংবাদিকরা তাদের যোগ্যতা প্রমাণ করেছে। তাই সিরিয়া, লিবিয়া, ইয়েমেন ও মিশরে কাজ করছে। কাজেই নারী সাংবাদিকতা করতে পারবে কি না - এটা আজ আর কোনো প্রশ্নই নয়। (নিউজলড্রিডটকম থেকে আদনান ভাটের প্রবন্ধ অবলম্বনে)

এখানে প্রকাশিত সব মতামত লেখকের ব্যক্তিগত, নতুন বার্তা ডটকম’র সম্পাদকীয় নীতির আওতাভুক্ত নয়।

 


Print
আরো খবর
    সর্বশেষ সংবাদ


    শিরোনাম
    Top