শুক্রবার, ২২ সেপ্টেম্বর ২০১৭
webmail
Tue, 22 Aug, 2017 04:34:24 PM
সাম্প্রতিক বন্যা
এম ও ফারুক
বাংলাদেশে প্রাকৃতিক দূর্যোগগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো বন্যা। প্রতিবছর মৌসুমি বায়ুর প্রভাবে কমবেশী সারাদেশে বৃষ্টিপাত হয়।যেখানে বার্ষিক গড়ে প্রায় ২০৩ সেন্টিমিটার। যার মধ্যে শুধু বর্ষাকালে গড় বৃষ্টিপাত হয় ৩০৯ সেন্টিমিটার। এছাড়াও আবহাওয়ার কারণেও ব্যাপক বৃষ্টিপাত হয় এদেশে।
 
বিশেষ করে বর্ষা মৌসুমে এর ভয়াবহতা রুপ নেয় বিশাল আকারে।নদীমাতৃক এ দেশেবর্তমানে অভিন্ন নদী রয়েছে মোট ৫৮ টি।যার প্রায় সবগুলো এসেছে আমাদের প্রতিবেশী দেশ ভারত থেকে। আর মায়ানমার থেকে এসেছে ৩টি নদী।ভারত থেকে আসা অভিন্ন এ নদীগুলো বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে উত্তরবঙ্গের জেলাগুলো দিয়ে। বিশেষ করে ব্রহ্মপুত্র,তিস্তা ও ধরলা নদী যা উত্তরবঙ্গের এ জেলাগুলোর মধ্যদিয়ে দক্ষিণ দিকে প্রবাহিত হয়েছে।
 
শুকনো মৌসুমে এ নদীগুলো যেমন চাষাবাদ ও মানুষের জন্য আর্শীবাদ হয়ে দাড়ায় ঠিক বর্ষা মৌসুমে তার একেবারে উল্টো চিত্র দেখা দেয়। বর্ষার অতিবৃষ্টি ও উজান থেকে নেমে আসা  পানিতে নদীগুলো হয়ে ওঠে টইটুম্বর। যা হয়ে ওঠে মরার উপর খারার ঘাঁ স্বরূপ।বিস্তৃর্ণ জোড়া ফসলের মাঠ,মানুষের ঘর-বাড়ি ও গবাদিপশুসহ সবকিছু ভাসে যায় নদীগুলোর ভয়াল ¯্রােতে। হেক্টরের পর হেক্টর আবাদি জমির ধান পানির নিচে ডুবে নষ্ট হয়ে যায়।
 
নতুন করে বীজতলা তৈরীর অর্থনৈতিক সামর্থ্যও নেই খেটে খাওয়া এসব আবাদিদের।যার ফলে বাংলাদেশ কৃষিনির্ভর দেশ হওয়ার এবার আমনে ফসলের ব্যাপক ঘাটতি হওয়ার কারণে অর্থনীতির উপর বিরূপ প্রভাব পড়তে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।যা দেশের জিডিপি বৃদ্ধিতে বাঁধা দিবে বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা।
 
১৯৮৮ ,১৯৯৮ ও ২০০৪ সালের বন্যার কথা মনে করিয়ে দেয় ২০১৭ সালের এবারের বন্যা।বিশেষ করে এবারে নেপাল ও ভারতের আসাম,উড়িষ্যা ও বিহারে ভয়াবহ বন্যায় প্রায় দুই শতাধিক মানুষ প্রাণ হারায়। হাজার হাজার বসত বাড়ি পানির নিচে তলিয়ে যায়।যার প্রভাব পড়ে আমাদের বাংলাদেশেও ।
 
বিশেষ করে উত্তরবঙ্গের- কুড়িগ্রাম,নিলফামারী,লালমনিরহাট,ঠাকুরগাঁও,রংপুর ও দিনাজপুরে বন্যার কারণে রেকর্ড পরিমাণ ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। এবার বন্যায় কুড়িগ্রামের প্রায় লক্ষাধিক মানুষ পানি বন্দী হয়ে পড়ে। অসংখ্য ঘর-বাড়ি ও ধানক্ষেত নষ্ট হয়েছে।শতশত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। যার ফলে স্বাভাবিক শিক্ষাকার্যক্রম ব্যহত হচ্ছে বলেমনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। এদিকে রংপুরের ঘাঁঘট নদীর কয়েকটি বাঁধ ভেঙ্গে প্লাবিত হয়েছে অনেকগুলো গ্রাম ।
 
হুমকির মুখে রয়েছে কয়েকটি বাঁধ। অপরদিকে দিনাজপুরে এবারের বন্যায় ফসলি জমির ব্যাপক ক্ষতিসহ শহরের আলিগলিতেও কোমর পরিমাণ পানিতে প্লাবিত হয়ে পড়ে।এর ফলে সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষেরা পড়ে চরম দূর্ভোগে।মানুষ ঘর থেকে বের না হতে পারার ফলে দেখা দেয় চরম খাদ্য ও বিশুদ্ধ পানির সংকট।দিনাজপুরের মানুষেরা বলছেন এবারের বন্যার মতো এর আগে কখনো তারা এধরনের ভয়াবহবন্যা দেখেনি।
 
অন্যদিকে জয়পুরহাট,নওগাঁ,রাজশাহী ও বগুড়ার সারিয়াকান্দি পয়েন্টে এবারের বন্যার প্রভাব পড়ে।জয়পুরহাটের ছোট যমুনা ও নওগাঁর আত্রাই নদীর পানি বিপদসীমার উপর দিয়ে প্রবাহিত হওয়া ও কয়েকটি বাঁধ ভেঙ্গে যাওয়ার কারণে শতশত গ্রাম প্লাবিত হয়।ডুবে যায় শতশত একর আবাদি ধানক্ষেত।রাস্তাঘাট ভেঙ্গে যাওয়ার ভোগান্তিতে পড়ে যাত্রীরা।তবে এসব জেলার বন্যা পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলেও নতুন করে প্লাবিত হচ্ছে গাইবান্ধা,সিরাজগঞ্জ ও টাঙ্গাইল জেলা বিভিন্ন অঞ্চল।
 
গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জ তিস্তার নদীর পানিতে নতুন করে প্লাবিত হয়েছে অনেক গ্রাম ও গোবিন্দগঞ্জের বাঙ্গালী নদীর পানি বিপদসীমা অতিক্রম করে ঢাকা-দিনাজপুর মহাসড়কের গোবিন্দগঞ্জশহর থেকে কাঁটা পর্যন্ত রাস্তা পানির নিচে তলিয়ে যায়।অপরদিকে টাঙ্গাইল ও সিরাজগঞ্জের বিভিন্ন জায়গায় নতুন বন্যা দেখা দিচ্ছে।
 
তবে এখন উত্তরবঙ্গের পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলেও দুশ্চিন্তা কড়া নাড়ছে বন্যাকবলিত প্রতিটি মানুষের মনে। বন্যার সময় পর্যাপ্ত ত্রাণ না পাওয়ার কারণে অনেকে থেকেছেন অনাহারে। নিজেরা না খেয়ে সন্তান-সন্তাতিদের খাইয়েছেন। কিছু স্থানীয় প্রতিনিধিরা তাদের পাশে এসে দাঁড়ালেও অধিকাংশ প্রতিনিধিরা মানুষের পাশে দাঁড়ায়নি বলে অভিযোগ করেছেন বন্যা কবলিত মানুষেরা।
 
এবার সরকারের পাশাপাশি  রাজনৈতিক,সাংস্কৃতিক ও স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনসহ বিভিন্ন বেসরকারী সংগঠন বন্যার্তদের মাঝে শুকনা খাবার,গ্যাম লাইট ও মোমবাতিসহ প্রয়োজনীয় জিনিসপাতি বিতরন করেন।তবে তা যথেষ্ট নয় বলে মন্তব্য করেছেন অনেকে।
 
বন্যাকবলিত এলাকায় বন্যা পরবর্তী সময়টা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কেননা এসময় বন্যার পানি নেমে যাওয়া সাথে সাথে বিভিন্ন ধরনের পানিবাহিত রোগের প্রাদুর্ভাব দেখা যায়। যেমন ,ডাইরিয়া,কলেরা ,আমাশয় ও জন্ডিসসহ নানা ধরনের রোগ বালাই।এসময় সরকারকে বিভিন স্বাস্থ্যসেবা বিষয়ক পদক্ষেপ হাতে নিতে হবে। শুধু তাই না বিনামূল্যে চিকিৎসা সেবা, বিনামূল্যে ঔষধ সহবরাহ করতে হবে।
 
এছাড়াও এবারে যেহেতু অধিকাংশ ফসলি জমির ধান নষ্ট হয়ে গেছে।সেহেতু যত তাড়াতাড়ি সম্ভব নতুন বজিতলা তৈরীর জন্য বিনামূল্যে স্বল্পমেয়াদী উন্নতজাতের ধানের বীজ সরবরাহ করতে হবে। সাথে সাথে কৃষকদের সার্বিক উন্নয়নের জন্য সুদমুক্ত ঋণ প্রদানের ব্যবস্থা নিশ্চিতকরণ এবং  প্রয়োজনীয় কীটনাশক ও রাসায়নিক সার স্বল্পমূল্যে দেয়ার ব্যবস্থা করতে হবে। প্রয়োজনে ক্ষণস্থায়ী প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।
 
অন্যদিকে এবারের বন্যায় ফসলি মাঠের ক্ষতির পাশাপাশি সবচেয়ে বেশী ক্ষতি হয়েছে মানুষের ঘর-বাড়ি ও রাস্তাঘাটের।বিশেষ করে কুড়িগ্রাম,গাইবান্ধা ও দিনাজপুরে এর ক্ষয়ক্ষতি ছিল উল্লেখ করার মতো।  মানুষেরা এসে রাস্তায় অস্থায়ী উঠেছিল পরিবার-পরিজন নিয়ে। ঘর-বাড়ি নির্মাণের সকল সরঞ্জাম নদীতে ভেসে যাওয়ার কারণে বন্যা পরবর্তী সময়ে সাধারণ মানুয়েরা পড়ে সবচেয়ে বেশী ভোগান্তিতে।আর্থিক সহায্যের জন্য অসহায়ের মতো করুন অবলোকনে চেয়ে থাকে কর্তৃপক্ষের দিকে।
 
অপরদিকে যাতায়াতের জন্য যে রাস্তাগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে সেগুলোর সংস্কার কাজ অতি দ্রুত শেষ করার জন্য সরকার তথা সংশ্লিষ্ট বিভাগের হস্তক্ষেপ কামনা করছেন বন্যাকবলিত সাধারণ মানুষেরা।
 
তাই আসুন ধর্মবর্ণনির্বিশেষে আমরা এসব বন্যাকবলিত মানুষের পাশে এসে দাড়ায়। সরকারের পাশাপাশি সাহায্য-সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেই নিজেদেরে সামর্থ্য অনুযায়ী।যার ফলে অসহায় দরিদ্র মানুষেরা পেট ভরে খেতে পারবে দো-বেলা দু-মুঠো ভাত।
 
আগের মতো ছাত্রছাত্রীরা আবার স্কুলে যেতে পারবে। তাহলেই তাদের মুখে ফুটবে হাসি,হাসবে সমাজ তথা পুরো দেশ। আর এর মাধ্যমেই জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের বুকে ধারন করা লালিত স্বপ্ন সোনার বাংলা গড়ার কাজকে ত্বরান্বিত করা সম্ভব হবে । আমাদের সুজলা-সুপলা,শষ্য-শ্যামলা সোনার বাংলাদেশ ২০৪১ সালের মধ্যে উন্নত দেশ হওয়ার যে স্বপ্ন দেশে তা অনেকাংশে পূরণ হবে।
 
নতুন বার্তা/কেএফ

Print
আরো খবর
    সর্বশেষ সংবাদ


    শিরোনাম
    Top