বৃহস্পতিবার, ২৪ মে ২০১৮
Mon, 07 May, 2018 12:24:46 PM
ফাহমিদা খানম।
 
আজকাল সবাই নিজেকে আধুনিকতম করার প্রতিযোগিতায় এতোই ডুবেছে যে, আশেপাশের সবকিছু খুব নির্বিকারভাবেই মেনে নিচ্ছে। অল্পবয়সী ছোট ছোট বাচ্চারাও আধুনিকতার জোয়ারে ভাসতে গিয়ে অজান্তেই ফাঁদে পড়ছে। ওদের করুণ পরিণতি মেনে নিতে ভীষণ কষ্ট হচ্ছে। নেটেই অজানা, অচেনা মানুষের সাথে প্রেমে জড়িয়ে যাচ্ছে তারপর দেখা করতে গিয়েই বিপদে পড়ছে। ভালোমন্দ বোঝার আগেই প্রেম, ব্রেকআপ, হত্যা, আত্মহত্যা খুব সহজ হয়ে যাচ্ছে। আগে কি এসব হতো না? হতো তবে এতো ভয়ানক ছিলো না সংখ্যাটা।
 
বাচ্চাদের নিরাপত্তার জন্য মোবাইল এখন বুমেরাং হয়ে গেছে। মা-বাবা কিনে দিয়েই দায়িত্বপালন শেষ ভাবেন। সন্তান কাকে বন্ধু করছে, কার সাথে দেখা করতে গেছে এই খবরটুকু পেতে পেতে অনেক দেরী করে ফেলেন। প্রতিদিন নতুন, নতুন সংবাদ পাই আর দীর্ঘশ্বাস ফেলে আমরাও দায়িত্ব শেষ করি অথবা নিজের টাইমলাইনে স্ট্যাটাস দিয়ে। এর বাহিরে কি কিছুই করার নেই? এক একটি প্রাণ এতো সস্তাদর! আর কতো! কবে থামবে এই নির্মমতা!

আজকাল নাকি বয়ফ্রেন্ড, গার্লফ্রেন্ড না থাকলে প্রেষ্টিজের ব্যাপারস্যাপার তাই ক্লাস ফোর, ফাইভের বাচ্চাদের ও ছেলেবন্ধু, মেয়েবন্ধু আছে। প্রাকৃতিকভাবের বয়:সন্ধিকালে বাচ্চাদের শরীর, মনে পরিবর্তন আসে, এটা আমরা কেউই আটকে রাখতে পারবো না কিন্তু ওদের সময় দিলে, বুঝিয়ে বললে অন্তত ভুল করার আগেভাগে একবার হলেও ভাববে।
 
এখন খেলার মাঠ তেমন নেই, নিরাপত্তার জন্য আমরাও ছাড়তে ভয় পাই তাই ঘরে বসে নেটের জগতেই ওরা বিনোদন খুঁজছে। দোষ কার? কোচিং আর স্কুলের ভারেই চাপা পড়ছে ওদের শৈশব আর কৈশোরকাল। বিনোদন নেই বলেইতো আসক্তি বেড়েই চলছে। তারপর অজান্তেই হচ্ছে সংবাদের খবর। চোখের সামনে তাসফিয়া জ্বলজ্যান্ত প্রমাণ। একবার এক রেষ্টুরেন্টে খেতে গিয়ে দেখি ১৩/১৪ বছরের এক মেয়ে ৩০+ লোকের সাথে ঘনিষ্ঠ হয়ে বসে আছে। এখানে মেয়েটি ভুল করছে আর লোকটি অপরাধ।
 
প্রেম-ভালবাসা অপরাধ নয় তবে সবকিছুর জন্য একটা বয়স থাকতে হবে। অন্ধ আবেগে প্রেমেজর্জর হয়ে একাকী দেখা করতে যাওয়া অপরাধ। এই জেনারেশন সবকিছুর উপরে প্রেমকে প্রাধান্য দিচ্ছে। পরিবারের মান সম্মানের কথা ভাবছে না। নিজের জীবনের সাথে কতকিছু জড়িত, ভুলে যাচ্ছে। ব্যাপারটা এমন রিলেশন তাদের কাছে মুখ্য। আর এই ব্যাপারটা অনেকটা এমন যে, আমরা আধুনিক তাই লুকোচুরির ধার ধারিনা। বলে বের হচ্ছে, বন্ধু বান্ধবীর বাসা আসলে সে নিজেই লুকোছাপার আশ্রয় নিয়ে বিপদে ফেলছে পরিবারকে। কিছু আরো এক ডিগ্রী উপরে --পৃথিবীতে এনেছ বলে কি কিনেছ নাকি! কি ভয়ংকর ব্যাপারস্যাপার! ন্যায় অন্যায়, অপরাধবোধ সব গুলিয়ে ফেলছে। ধর্মীয় মুল্যবোধ গুরুত্বহীন হয়ে যাচ্ছে, নৈতিকতাকে থু থু মেরে আত্মপ্রচারের লোভ, সেলিব্রেটি হবার লোভ অনেকের ভিতরেই ঢুকেছে তাই নিজেকে সস্তাদর করতে তাদের বিবেকে লাগছে না। একই ছাদের নীচে থেকেও বাবামা থেকে সন্তানের দুরত্ব বাড়ছে।আর সন্তানদের ভুলের খেসারত দিতে হচ্ছে পরিবারকেই।

পশ্চিমা সংস্কৃতির ভালো দিকের চেয়ে মন্দগুলোকেই আমরা সাদরে বরণ করেছি। ওদের সাথে আমাদের ধর্ম, সংস্কৃতি কোনটারই মিল নেই তবুও অনেক দিবস ঘটা করে এখন পালন করা হয়। বিজাতীয় সংস্কৃতি আমাদের মুল্যবোধ নষ্ট করে দিচ্ছে। আগে যে শব্দগুলো বইয়ের পাতায় পড়লেও আমরা লজ্জা পেতাম এরা দিব্যি তা বলছে। বাংলা ইংরেজি মিশিয়ে এক অদ্ভুত জগাখিচুড়ী ভাষা ওদের বুলি। আমরা শুধু চেয়ে দেখি আর মনেমনে বলি দৃষ্টিভঙীর পরিবর্তন সবসময় ভালো না।

শুঁয়োপোকা খোলস ছেড়ে বর্ণিল প্রজাপতি হয় আর মানুষ মানবিকতার পোষাক গায়ে রাখাকেই ঝামেলাপূর্ণ ভাবছে। পত্রিকাদি এসব এতো রসিয়ে রসিয়ে লিখে যে, আমাদের অনুভুতিশীল মনটাও আর আগের মতো নেই, পড়ে পড়ে অসাড় হয়ে গেছে।

অনুভুতি পুরো শেষ হবার আগেই সচেতনতা বাড়াতে হবে। সন্তানদের সঠিক শিক্ষা না দিতে পারলে এর রেশ আমাদেরই টানতে হবে, পারিবারিক বন্ধন মজবুত করতে হবে। অক্ষমতার দায়ভার প্রথমেই পরিবারের। স্কুলেও বাচ্চাদের কাউসেলিং করাতে হবে। সবাই মিলে যদি এই এক ব্যাপারে একমতাবলম্বী হয় তাহলে হয়ত কিছুটা হলেও রাশ টানা সম্ভবপর হবে। আর তা না হলে অশুভ শক্তিরই জয় হবে। তছনছ হয়ে যাবে সংস্কৃতি আর মুল্যবোধ। বাবামায়ের ব্যস্ততা কমিয়ে সন্তানদের আরো বেশী সময় দিতে হবে। এখুনি রেশ না টানলে নিজেদের নিয়ে ব্যস্ত থাকলে খবরের সংখ্যা আশংকাজনক বেড়ে যাবে।
 
নতুনবার্তা/কিউএমএইচ



 
  

 


Print
আরো খবর
    সর্বশেষ সংবাদ


    শিরোনাম
    Top