মঙ্গলবার, ২৩ মে ২০১৭
webmail
Thu, 18 May, 2017 05:45:04 PM
এম মাঈন উদ্দিন
মিরসরাই (চট্টগ্রাম) প্রতিনিধি
নতুন বার্তা ডটকম

মিরসরাই: চট্টগ্রামের মিরসরাইয়ে কয়েকটি হাসপাতাল বর্জ্যে দিশেহারা এখানকার বাসিন্দারা। এসব চিকিৎসাবর্জ্যের সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা ও প্রক্রিয়াজাতকরণে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের অসচেতনতা, অজ্ঞতা, অনীহা ও কারিগরি অদক্ষতার কারণে ক্ষতির মুখোমুখি হচ্ছে পরিবেশ প্রতিবেশ। অন্যদিকে, জনস্বাস্থ্য পড়ছে মারাত্মক হুমকির মুখে। যা মানুষের জীবনে ডেকে আনছে অনাকাঙ্খিত স্বাস্থ্যঝুঁকি।

মিরসরাই পৌরসভার মোমিনটোলা গ্রামের বাসিন্দা ৫৫ বছর বয়সী মো. সিরাজুল ইসলাম বলেন, “পৌর এলাকার কয়েকটি হাসপাতালের বর্জ্যে দিশাহারা মোমিনটোলাসহ আশপাশের গ্রামগুলোর কৃষক ও বাসিন্দারা। ধানি জমি, খাল-বিলে পা রাখলেই ফুটে সুই, খালের পানি শরীরে লাগলে ভীষণ চুলকায়। আর জমির সবখানে হাসপাতালের আবর্জনা ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ে থাকে। কার কাছে যাব, কাকে বললে সমাধান হবে তাও জানি না।”

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, গত ১০ বছরে মিরসরাই উপজেলা এলাকায় বেসরকারিভাবে গড়ে ওঠেছে ৯টি ক্লিনিক ও ১৬টি ডায়াগনস্টিক সেন্টার। এসব গড়ে ওঠলেও ঠিক সেভাবে তাল মিলিয়ে গড়ে ওঠেনি সঠিক চিকিৎসাবর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও প্রক্রিয়াজাতকরণ ব্যবস্থা। এসব স্বাস্থ্য সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানে প্রতিদিন জমা হয় বিপুল পরিমাণ জীবাণুবাহী চকিৎসাবর্জ্য। যা ফেলে দেয়া হয় যত্রতত্র।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, মিরসরাইয়ে গড়ে ওঠা হাসপাতাল ও ক্লিনিকের চিকিৎসাবর্জ্য সঠিকভাবে ধ্বংস না করে গোপনে রাতের অন্ধকারে অথবা দিনের আলোতে ফেলে দেওয়া হচ্ছে পার্শ্ববর্তী বিভিন্ন প্রবহমান খালে, নালা নর্দমায়, জনচলাচলের রাস্তার পাশে ও পৌরসভার উন্মুক্ত সাধারণ ডাস্টবিনে। পরে এই বর্জ্যগুলোর কিছু অংশ কাক ও কুকুর খোলা জায়গা থেকে ছড়িয়ে ছিটিয়ে দিচ্ছে জনবহুল স্থানে এবং এর বেশির ভাগই প্রবহমান ছড়া অথবা খালের পানিতে ভেসে গিয়ে তা ছড়িয়ে পড়ছে লোকালয় কিংবা কৃষিজমিতে। এতে খুব সহজেই এই চিকিৎসাবর্জ্যের সংস্পর্শে আসছে মাঠের কৃষক, জেলে এবং সাধারণ মানুষ।

বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের মতে, এসব বর্জ্যের কারণে মানুষ আক্রান্ত হচ্ছে চর্মরোগ, হেপাটাইটিস ‘বি’, হেপাটাইটিস ‘সি’, যক্ষ্মা, এইডসসহ বিভিন্ন রক্তবাহিত প্রাণঘাতী রোগে।

এছাড়া এই চিকিৎসাবর্জ্যে যেসব বিপজ্জনক তরল রাসায়নিক দ্রব্য থাকে তা ক্রমান্বয়ে মাটিতে মিশে জৈব খাদ্যচক্রের মাধ্যমে আবার মানবদেহে ফিরে আসে। যার কারণে জনজীবনে মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি হয়। জানা গেছে, বিপদ এখানে শেষ নয়, এই চিকিৎসাবর্জ্য খোলা জায়গায় ফেলার সুযোগ নিচ্ছে এক শ্রেণির নিম্ম আয়ের মানুষ। তারা এই চিকিৎসাবর্জ্যগুলোর ভেতর থেকে খুঁজে বের করে আনে প্লাস্টিকজাত জিনিসগুলো যেমন, ব্যবহৃত সিরিঞ্জ, স্যালাইনের ব্যাগ, রক্তের ব্যাগ, ক্যাথেটারের নলসহ ব্যাগ ও স্যলাইন সেট ইত্যাদি। এগুলো তারা ধুয়ে মুছে পরে আবার কেজি হিসাবে বিক্রি করে ভাঙারি দোকানে। পরে তারা দেশের প্লাস্টিকজাত বিভিন্ন কম্পানির কাছে কাঁচামাল হিসেবে বিক্রি করা হয়।

সরেজমিনে দেখা গেছে, মিরসরাই পৌরসভার প্রায় দুই কিলোমিটার পশ্চিমে নাজিরপাড়া গ্রামের পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া মলিয়াইশ খালের পাড়ে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে বিভিন্ন রকমের চিকিৎসাবর্জ্য। পরে এ বর্জ্যের উৎস খুঁজতে আরো অনুসন্ধান চালাতে গিয়ে দেখা মিললো অছিমিয়া ব্রিজের পূর্ব পাশে মলিয়াইশ খালের পাড়ে চিকিৎসাবর্জ্যের বিশাল স্তুপ। এখান থেকেই এই ভয়ঙ্কর বর্জ্যগুলো পানিতে প্রবাহিত হয়ে এলাকার বিভিন্ন জায়গায় ছড়িয়ে পড়ছে।

চিকিৎসাবর্জ্যের ব্যবস্থাপনা সম্পর্কে উপজেলার বিভিন্ন বেসরকারি হাসপাতালের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সাথে কথা বলে জানা যায়, হাসপাতাল বর্জ্য ব্যবস্থাপনা সম্পর্কে বেশির ভাগেরই কোনো সুস্পষ্ট ধারণা নেই। তারা কেউ কেউ বলেন আমার এসব বর্জ্য অন্যান্য গৃস্থালি বর্জ্যের মতো পৌরসভার নিদিষ্ট ড্রামে অথবা নিজস্ব উদ্যোগে অপেক্ষাকৃত নির্জন জায়গায় ফেলে আসি।

বারইয়ারহাট কমফোর্ট হাসপাতাল প্রাইভেট লিমিটেডের চেয়ারম্যান মো. নিজাম উদ্দিন বলেন, “আমরা হাসপাতালে উৎপন্ন বর্জ্যগুলো আলাদা পাত্রে সংরক্ষণ করি, পরে এ বর্জ্য পৌরসভার লোকজন এসে নিয়ে যায়। তারা কোথায় এই বর্জ্য ফেলে তা জানি না। তবে, আমরা বিশেষ করে সিরিঞ্জের নিডেলগুলো ‘নিডেল ডেস্ট্রয়ার’ দিয়ে নষ্ট করে ফেলি।”    

চিকিৎসাবর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও প্রক্রিয়াজাতকরণ সম্পর্কে উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. মো. আবদুল খালেক বলেন, “এ ব্যাপারে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর বর্জ্য ব্যবস্থাপনার কাজে নিয়োজিত ব্যক্তিদের কীভাবে নিজ নিজ প্রতিষ্ঠানের চিকিৎসাবর্জ্য নির্দিষ্ট প্রক্রিয়া অনুসরণ করে ধ্বংস করতে হয় সে ব্যাপারে আরো কাউন্সেলিং করা প্রয়োজন।”

আমরা অতি দ্রুত এ ব্যাপারে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করব। চিকিৎসাবর্জ্য সাধারণ মানুষের সংস্পর্শে আসলে কি ধরনের স্বাস্থ্যঝুঁকি থাকে এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, “জনসাধারণ এই চিকিৎসাবর্জ্যের সংস্পর্শে আসলে বিভিন্ন রক্তবাহিত রোগ দ্রুত শরীরে সংক্রমিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।”

নতুন বার্তা/টিটি

 


Print
আরো খবর
    সর্বশেষ সংবাদ


    শিরোনাম
    Top