বাক্য

পঞ্চনদের পাঞ্জাব

লিয়াকত হোসেন খোকন: পাঞ্জাব দিয়েই শক-ছন-দল পাঠান-মোগল এসেছিল ভারত-বাংলায়। আর্যরাও আসে হিন্দুকুশ পেরিয়ে এই পাঞ্জাব হয়েই। পাঞ্জাবের সিন্ধু নদের অববাহিকায় বিকাশ লাভ ঘটে আর্য সভ্যতার। তখন এই ভূখন্ডের নাম ছিল সপ্তসিন্ধু অর্থাৎ সাত সাগরের দেশ। কালে কালে সরস্বতী শুকিয়ে যায়। প্রমাদ শুনলেন পাঞ্জাবিরা। সিন্ধুও তাদের পছন্দ নয়। অর্থাৎ রইল বাকি পাঁচ-ঝিলাম, চেনার, রাতি, বিপাশা আর শতদ্রু। এই পঞ্চ নদের দেশ পাঞ্জাব। পাঞ্জাব নামটিও এসেছে ২টি ফারসি শব্দ থেকে – ‘পাঞ্জ’ মানে পাঁচ আর ‘আব’ অর্থাৎ জল থেকে।

একসময় পাঞ্জাব পারস্য সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত ছিল। আলেকজান্ডারও পাঞ্জাবের ওপর দিয়ে এগিয়ে চলেন ভারত অভিযানে। আর মৌর্য সম্রাট চন্দ্র গুপ্ত ম্যাসিডোনিয়ার গভর্নরকে হারিয়ে দখল করে নেয় পাঞ্জাব। ১০ শতকে মুসলমান দখলে যায় পাঞ্জাব।

কালে কালে ১৫ এবং ১৬ শতকে পাঞ্জাবিরা শিখ রাজ্য গড়তে সক্ষম হয়। বারবার খন্ডিত হয়েছে পাঞ্জাব। তাই ওখানে নদীর সংখ্যা পাঁচ নেই। এদিকে পাঞ্জাবের ৩টি পাহাড়ি জেলা সরে গিয়ে গড়ে ওঠে হিমাচল প্রদেশ। পাঞ্জাবের রাজধানী শহর লাহোর ১৯৪৭ সালে পাকিস্তানের দখলে চলে যায়।

৫ সংখ্যাটি পাঞ্জাবিদের কাছে অতি পবিত্র। যেমন – চুল, দারু বা হাড়ের চিরুনি, পাগড়ি, স্টিল কংকন আর কৃপান। পুরুষদের বসন লুঙ্গি ও পাঞ্জাবি। আর মহিলারা পরেন সালোয়ার-কামিজ। অর্থাৎ পাজামা ও হাঁটু পর্যন্ত জামা – সঙ্গে ওড়না। পাঞ্জাবিদের আয়ুর গড় ৬৫ বছর। শৌর্য ও বীর্যেও এদের খ্যাতি আছে। তেমনি খ্যাতি আছে এদের কণ্ঠ সহিষ্ণুতায়। সবুজ বিপ্লবেও এরা উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রেখেছে। পাঞ্জাবিদের লোকনৃত্য আর লোকসংগীতের খ্যাতিও আছে।

পাঞ্জাবে দর্শনীয় স্থান হলো যেমন চন্ডীগড়, অমৃতসর, জালিয়ানওয়ালাবাগ, জলেঙ্কর, হোশিয়ারপুর, লুধিয়ানা, পাতিয়ালা, পাঠানকোট। উল্লেখিত জায়গাগুলো এখন ভারতের পাঞ্জাব রাজ্যে। পাঞ্জাবের লাহোর, শিয়ালকোট এখন পাকিস্তানে। পাক সীমান্তবর্তী শহর অমৃতসর। ঘণ্টা তিনেকে অমৃতসর থেকে লাহোরে যাওয়া যায়।

অমৃতসর

রাজ্যের রাজধানী চন্ডীগড় হলেও শিখ ধর্ম ও সংস্কৃতির অন্যতম পীঠ স্থান অমৃতসর। শিখধর্মের অন্যতম তীর্থ অমৃতসর ও স্বর্ণ মন্দির এখানের প্রধান আকর্ষণ। ১৫৭৭ সালে শিখ গুরু রাম দাসের হাতে গড়ে ওঠে শহর। এরই কয়েক বছর পর এই মন্দিরটি স্থাপিত হয়। সরোবরের জল শুদ্ধ করে হয় অমৃত তুল্য। নাম হয় অমৃতের সরোবর অর্থাৎ অমৃতসর। এক সময় মন্দিরের নাম ছিল হরমন্দির। পরে নাম দেওয়া হয় স্বর্ণমন্দির। দেওয়ালি অমৃতসরের বরণীয় উৎসব। তখন মন্দিরের দীপ সজ্জা ও আতশিবাজির দেখার জন্য দূর-দূরান্ত থেকে পর্যটক আসেন।

জালিয়ানওয়ালাবাগ

অমৃতসরের কাছেই জালিয়ানওয়ালাবাগ। ব্রিটিশ রাজ্যের বুলেটের ক্ষত গায়ে নিয়ে আজও বাকশক্তিরহিত হয়ে বিষাদ মুখে দাঁড়িয়ে আছে এর দেয়ালগুলো। তবে ভারতবাসীর কাছে অতি পবিত্র তীর্থ এই মন্দির জালিয়ানওয়ালাবাগ। চারপাশে বাড়ি-ঘর, উঁচু দেয়ালে ঘেরা তারই মাঝে ময়দান। এই ময়দানে কয়েক হাজার লোকের উপস্থিতিতে সভা বসেছিল সামরিক আইন রাওয়াট অ্যাক্টের প্রতিবাদ জানাতে।

জালিয়ানওয়ালাবাগে হত্যাকান্ড

ব্রিটিশ জেনারেল ডায়ার কোনোরকম সতর্কতা ছাড়াই তার সেনাদল দিয়ে প্রবেপথে দাঁড়িয়ে গুলা বর্ষণ শুরু করে নিরস্ত্র জনতার ওপর। মৃত্যু ঘটে ২ হাজার লোকের। এ নৃশংস হত্যাকান্ডের ধিক্কার জানায় সারা বিশ্ব। বাংলার কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ক্ষিপ্ত হয়ে ব্রিটিশের দেওয়া খেতাব নাইটহুড বর্জনও করেছিলেন।

জলন্ধর

জলন্ধর প্রাচীন শহর। একসময় হিন্দু রাজার রাজধানীও ছিল। তবে আজকের জলন্ধরের খ্যাতি তার খেলাধুলার সামগ্রীর জন্য। শিল্পনগরীও এই জলন্ধর। জামে মসজিদ, ইমাম নাসিরের সমাধি, নায়ক-গায়ক কুন্দন লাল সায়গলের সমাধিসৌধও রয়েছে এখানে। পাঠানকোট সামরিক শহর। পাঠানকোট জলন্ধর রোডে ৫ কিমি দূরের দামতাল মন্দিরটির পর্যটক আকর্ষণও কম নয়। লুধিয়ানার অন্যতম আকর্ষণ রেশম, পশম ও সুতিবস্ত্রের পোশাক।

১৪৮০ খ্রিষ্টাব্দে লোধি বংশের দুই শাহজাদার হাতে লুধিয়ানা শহরের পত্তন হয়েছিল। তবে পাঞ্জাবের অন্যতম আকর্ষণ মোগল সম্রাট জাহাঙ্গীর এবং সম্রাজ্ঞী নূরজাহানের সমাধিসৌধ রয়ে গেছে পাকিস্তানের পাঞ্জাবে।

 

Related Articles

Adblock Detected

Please consider supporting us by disabling your ad blocker