বাক্য

জুলিয়াস সিজারের বীরত্বের গল্প

সাকিব আহমেদ রনি: জুলিয়াস সিজারের গুণকীর্তন করে শেষ করা যাবেনা। তিনি ছিলেন একাধারে শ্রেষ্ঠ সেনাপতি, শ্রেষ্ঠ রাজনীতিক এবং শ্রেষ্ঠ সমাজ সংস্কারক। তার তুলনা তিনি নিজেই। আজকে আলোচনা করবো ৪৮ খ্রিস্টপূর্বাব্দে রোমে ঘটে যাওয়া জুলিয়াস সিজারের অধীনস্থ ১০ম লিজিয়নে সেনা বিদ্রোহ ও এরই ফলশ্রুতিতে সিজারের গৃহীত পদক্ষেপ।

শুরু করার আগে লিজিয়ন কি বলে নেওয়া ভালো। তৎকালীন রোমান সামরিক ব্যবস্থার কার্যকরী ইউনিটকে বলা হতো লিজিয়ন। সিজারের সময়ে এক লিজিয়নে ৬০০০ লোক থাকতো, যাদের মধ্যে ৮০% সৈন্য এবং ২০% অন্যান্য কাজে নিয়োজিত। রোমান লিজিয়ন নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা উদ্দেশ্য নয়, তবে এটা বলে রাখি সৈন্যরা মূলত আসতো রোমান সমাজের প্লিবিয়ান বা প্লেবস বা সাধারণ নিম্নবিত্ত শ্রেণি থেকে। অন্যদিকে অফিসাররা ছিল সাধারণত প্যাট্রিশিয়ান বা অভিজাত শ্রেণির।

রোমান সমাজ ব্যবস্থায় প্রতিরক্ষা, রাজনীতি, প্রশাসন, আইন ব্যবস্থা, বিচার ব্যবস্থা সবই অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত ছিল। রোমান রিপাবলিক বা প্রজাতন্ত্রে কেন্দ্রীয় প্রশাসনের সর্বোচ্চ কর্তাব্যক্তিকে বলা হতো কনসাল। তবে একই সঙ্গে দু’জন কনসাল থাকতেন এবং তারা মাত্র ১ বছরের জন্যই নির্বাচিত হতেন। এভাবে ক্ষমতার ভারসাম্য রক্ষা করা হতো। কনসাল রোমান আইনসভা বা সিনেটের আনুষ্ঠানিক প্রধান হতেন এবং সিনেটের যেকোনো সিদ্ধান্তের বিপরীতে ভেটো প্রদানের ক্ষমতার অধিকারী হতেন। এছাড়া প্রজাতন্ত্র যুদ্ধে জড়িত হলে কনসাল তার সর্বাধিনায়ক হতেন এবং সাধারণত যুদ্ধের সামরিক নেতৃত্বও দিতেন। প্রশাসনিক ও পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রেও কনসালই ছিলেন শীর্ষ কর্তাব্যক্তি। প্রজাতন্ত্র বিশেষ সংকটে নিপতিত হলে অনেক সময় সিনেট শুধুমাত্র একজন কনসালকেই নির্বাচিত করতেন এবং তাকে সর্বময় ক্ষমতা প্রদান করতেন। তখন কনসালকে বলা হতো ডিকটেটর। কয়েকজন ব্যক্তি ক্ষমতার অপব্যবহার করে ডিকটেটর পদ কুক্ষিগত করেছিলেন। এদের বলা হয় টাইর‍্যান্ট। ১ বছরের দায়িত্ব পালন শেষে কনসালকে ৩-৫ বছরের জন্য রোমান অধিকৃত কোন প্রদেশে গভর্নর হিসেবে পাঠানো হতো। প্রদেশের আকার, জনসংখ্যা ও অন্যান্য বিষয়ের ওপর ভিত্তি করে কনসালকে প্রয়োজনীয় সেনা ধার্য করে দিতো সিনেট। সর্বনিম্ন এক লিজিয়ন থেকে সর্বোচ্চ ৩-৪ লিজিয়ন সৈন্যও অনেকে পেয়ে থাকতো। অতএব গভর্নর সেই প্রদেশের সামরিক প্রধানও হতেন। এধরণের গভর্নরদের বলা হতো প্রো-কনসাল। খ্রিস্টপূর্ব ৬৩ সালে সিজার প্রথম কনসাল হন। দায়িত্ব পালন শেষে সিজারকে স্পেনে গভর্নর হিসেবে পাঠানো হয়। সেখানে সিজারকে প্রথমে ১ লিজিয়ন সৈন্য দেয়া হলেও তিনি নিজে আরেক লিজিয়ন সৈন্যবাহিনী গড়ে তোলেন। সিজারের নিজ হাতে গড়া এই লিজিয়ন ছিল তখনকার আমলে রোমান প্রজাতন্ত্রের দশম লিজিয়ন।

স্পেনে সিজার ব্যাপক সামরিক সাফল্য পান। এতে বিশেষ ভূমিকা ছিল ১০ম লিজিয়নের। ৬০ খ্রিস্টপূর্বাব্দে তার গভর্নরশিপের মেয়াদ শেষ হলে রোমে প্রত্যাবর্তন করে তিনি পুনরায় কনসাল নির্বাচিত হন। এসময় সিজার রোমান সিনেটে পপুলারিস্ট দলের প্রতিনিধিত্ব করছিলেন। এর বিরুদ্ধে সক্রিয় ছিল আভিজাত ও রক্ষণশীলদের দল অপটিমেটস। এই দুই দলের মধ্যবর্তী একটি দল ছিল, যাদের বলা হতো লিবারেল। অপটিমেটস ও লিবারেলদের মূল নেতা ছিলেন যথাক্রমে কেটো ও সিসেরো। এসময় সিজার ছাড়াও রোমান রাজনীতিতে আরো দু’জন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি ছিলেন, রোমের ইতিহাসের সবচেয়ে অলঙ্কৃত সেনাপতি পম্পে ম্যাগনাস এবং রোমের সবচেয়ে ধনাঢ্য ব্যক্তি ক্র‍্যাসাস। পম্পের সামরিক সাফল্যকে অনেকে আলেকজান্ডার দ্যা গ্রেটের সাথে তুলনা করেছিলেন। তাই তাকে ম্যাগনাস (The Great) অভিধায় অভিহিত করা হয়।

রক্ষণশীল ও লিবারেলদের সম্মিলিত বাঁধার সম্মুখে সিজার ছিলেন একা। অন্যদিকে পম্পে ও ক্র‍্যাসাসের উত্থানকেও এরা সবসময়ই চ্যালেঞ্জ করে আসছিল। কারণ রিপাবলিকের মূল মন্ত্র ছিল এক ব্যক্তির হাতে অতিরিক্ত অর্থ বা ক্ষমতা যেন কুক্ষিগত না হয়। কিন্তু সিজারের উত্থান তাদের আরো শংকিত করে তোলে। কারণ সিজার এদের রাজনৈতিক আদর্শের মূলে যে কায়েমি স্বার্থ রয়েছে তা নিয়ে প্রচুর কথা বলেন এবং সাধারণ রোমানদের প্রিয়পাত্র হয়ে উঠেন। কেটো সিজারকে ধ্বংস করতে উঠেপড়ে লাগেন, সাথে যোগ দেয় লিবারেলরা। এসময় সিজার, পম্পে ও ক্র‍্যাসাস এক মৈত্রী স্থাপন করেন, ইতিহাসে যাকে প্রথম Triumvirate বলে আখ্যা দেয়া হয়। এর ফলে তিনজনই লাভবান হয়েছিলেন। তবে সবচেয়ে লাভবান হয়েছিলেন আসলে সিজার। ৫৯ খ্রিস্টপূর্বাব্দে পুনরায় তাকে প্রো-কনসাল করে পাঠানো হয় রোমানদের অধীনস্থ সবচেয়ে বড় প্রদেশ ট্রান্স আলপাইন গলে (আজকের ফ্রান্স)। এর সাথে তাকে ছোট্ট প্রদেশ ইলিরিয়াও দেয়া হয়। সিজারকে ৪ লিজিয়ন সৈন্য বরাদ্দ দেয়া হয়৷ কিন্তু সিজার আগের ২ লিজিয়ন সৈন্যও সাথে নিয়ে যান বেআইনিভাবে। এর মধ্যে একটি ছিল ১০ম লিজিয়ন। সিজার যাবার কিছুদিন পরেই পাশের প্রদেশ সিসালপাইন গলের গভর্নরের মৃত্যু হলে পম্পে ও ক্র‍্যাসাসের প্রভাবে সিনেট সিজারকে সেই প্রদেশটিও দিতে বাধ্য হয়। অতিরিক্ত আরো দুই লিজিয়ন সৈন্য পান সিজার। ৫৮ থেকে ৫০ খ্রিস্টপূর্বাব্দ পর্যন্ত প্রায় ৮ বছর সিজার এই সমগ্র অঞ্চল শাসন করেন এবং আরো প্রচুর অঞ্চল জয় করে রোমান প্রজাতন্ত্রের সীমানা বৃদ্ধি করেন। প্রচুর যুদ্ধ করতে হয় সিজারকে। সিজার ব্রিটেন ও জার্মানি পর্যন্ত জয় করেছিলেন, কিন্তু তা স্থায়ী হয়নি। এসব যুদ্ধকে একত্রে বলা হয় Gallic Wars। সিজারের ১০ম লিজিয়ন গলিক যুদ্ধে সবচেয়ে বীরত্ব প্রদর্শন করে।
গলে সিজারের ব্যাপক সাফল্য ম্লান করে দেয় পম্পে ম্যাগনাসকে। সিজারের জনপ্রিয়তা ও সাফল্য সমগ্র সিনেটের পাশাপাশি পম্পেকেও তার শত্রুতে পরিণত করে। এভাবেই খ্রিস্টপূর্ব ৪৯ সালে পম্পে ও সিজারের মধ্যে গৃহযুদ্ধ শুরু হয়। এই গৃহযুদ্ধে ১০ম লিজিয়ন সিজারের কাছে কতটা বিশ্বস্ত তার প্রমাণ পাওয়া যায়। রোমানরা সারা দুনিয়ায় যুদ্ধ করলেও রোমের অভ্যন্তরে সৈন্য হিসেবে প্রবেশ নিষিদ্ধ ছিল৷ পম্পে ও কেটোর প্ররোচনায় সিনেট সিজারকে রাষ্ট্রদোহী ঘোষণা করে। এসময় সিজার সরাসরি রোম আক্রমণের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। কিন্তু রোম আক্রমণ ছিল গর্হিত অপরাধ। তাই সিজারের অনুগত হলেও সৈন্যরা রোম আক্রমণ করতে দ্বিধাগ্রস্ত ছিল। কিন্তু সিজার সৈনিকদের পালস বুঝতেন খুব ভালো। তিনি বলেন, তোমরা কেউ যদি না যাও আমি শুধুমাত্র ১০ম লিজিয়ন নিয়েই রোমে প্রবেশ করবো, আমাদের যা হয় হবে। সিজার তার সৈন্যদের কাছে ছিলেন পিতার মতো, কারো কাছে দেবতার মতো। সিজারের এই কথায় অন্যান্য লিজিয়নের সৈনিকরা লজ্জিত হয়ে পড়ে। তারা তৎক্ষণাৎ রোম আক্রমণের জন্য সিজারকে প্রতিজ্ঞা করে। তবে এখানে একটা বিষয় লক্ষ্যণীয় অন্যান্য সকল লিজিয়নের চেয়ে সিজার ১০ম লিজিয়নকে বেশি বিশ্বাস করতেন।

৪৮ খ্রিস্টপূর্বাব্দে গৃহযুদ্ধের শেষ পর্যায়ে যুদ্ধ হচ্ছিলো গ্রীসে। এই যুদ্ধে অবশ্য ১০ম লিজিয়ন অংশগ্রহণ করেনি। এখানে বীরত্ব প্রদর্শন করেছিল ১৩তম লিজিয়ন। বলা বাহুল্য, ১৩তম লিজিয়নের মূল নেতা ছিলেন সিজারের সেকেন্ড ইন কমান্ড মার্ক এন্টনি। যুদ্ধে পরাজিত পম্পে মিশরের উদ্দেশ্যে পলায়ন করলে সিজার এন্টনি ও ১৩তম লিজিয়ন নিয়ে মিশরের উদ্দেশ্যে সমুদ্রযাত্রা করেন।

সিজার যখন মিশরে যান তখন ১০ম লিজিয়ন ছিল রোমে। প্রায় ১৫ বছর যুদ্ধ করে তারা ছিল ক্লান্ত, অন্যদিকে সবচেয়ে দক্ষ সৈন্য। সিজারের সামরিক সাফল্যের সবচেয়ে বড় ভাগীদার এই সৈন্যরা। সিজার বলেছিলেন যুদ্ধ শেষ হলে ১০ম লিজিয়নকে অবসর দেয়া হবে, ইতালিতে জমি দেয়া হবে এবং নগদ অর্থ দেয়া হবে। কিন্তু সিজার যখন পম্পেকে হারানোর পর রোমে না ফিরে মিশর চলে যান তখন সৈন্যরা ভাবে সিজার তাদের ভুলে গেছেন বা প্রতারণা করেছেন। রোমে তারা সিজারের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে বসেন। এসময় রোমের দায়িত্বে ছিলেন সিজারের অনুগত লেপিডাস (পরবর্তীতে ২য় Triumvirate এর একজন)। কিন্তু লেপিডাস সৈনিকদের মধ্যে জনপ্রিয় না থাকায় বিদ্রোহ সামাল দিতে ব্যর্থ হচ্ছিলেন।

এক্ষেত্রে বলে রাখি গল যুদ্ধে সিজারের প্রধান সহযোগী ছিলেন ল্যাবিয়েনাস। তিনি সেকেন্ড ইন কমান্ড ছিলেন। এরপর ছিলেন লেপিডাস। মার্ক এন্টনি প্রথমে ছিলেন তরুণ একজন অফিসার মাত্র। ল্যাবিয়েনাস নিজেকে সিজারের সমতুল্য মনে করতেন। সিজার যখন রোমান সিনেট ও পম্পের সাথে বিরোধে লিপ্ত হন ল্যাবিয়ানাস তখন পম্পে ও সিনেটের প্রতি তার আনুগত্য প্রকাশ করেন। এর কারণ হলো ল্যাবিয়েনাস অতীতে জেনারেল পম্পের অধীনে একজন অফিসার হিসেবে কাজ করেছিলেন। অবশ্য সিজার নিজেও একসময় পম্পের অধীনে কাজ করেছিলেন। সিজারের কাছ থেকে ৩ লিজিয়ন সৈন্য নিয়ে ল্যাবিয়েনাস আগেই ইতালি চলে আসেন। এরা ল্যাবিয়েনাসের অনুগত ছিল বলেই ধারণা করা হয়।

পূর্বে গল অভিযানের কথা বলা হয়েছে। গলদের বিরুদ্ধে সিজারের চূড়ান্ত অভিযান ছিল আলেসিয়ার যুদ্ধ। এ যুদ্ধে প্রায় ৬০ হাজার রোমানের বিরুদ্ধে কয়েকগুণ গল যুদ্ধ করে। আলেসিয়ার যুদ্ধ জয় সিজারের অন্যতম অতিমানবীয় কীর্তি। এমনকি আলেকজান্ডারও এমন কঠিন পরিস্থিতি থেকে বিজয় অর্জন করতে পারেন নি। আলেসিয়ার যুদ্ধে কমান্ডার মার্ক এন্টনি বীরত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। এরপর থেকেই বয়সে তরুণ হলেও এন্টনি সিজার ও সৈন্যদের কাছে প্রিয়পাত্র হয়ে উঠেন। সিজার ল্যাবিয়েনাস ও লেপিডাসের তুলনায় এন্টনিকে বেশি গুরুত্ব দেয়া শুরু করেন।

সিজার যখন ইতালিতে প্রবেশ করেন তখন পম্পে রোমে বসে বেশ নিশ্চিন্তই ছিলেন। কারণ ল্যাবিয়েনাস ৩ লিজিয়ন সৈন্য নিয়ে সিজারকে প্রতিরোধ করতে বসে ছিলেন। কিন্তু সিজার ইতালির সীমানায় প্রবেশ করার সাথে সাথে এক এক করে শহর, বন্দর, শহরতলি, গ্রাম সিজারের আনুগত্য স্বীকার করে। মজার ব্যাপার ল্যাবিয়েনাসের সৈন্যরা ল্যাবিয়েনাসকেই বন্দী করে এবং সিজারের হাতে তুলে দিয়ে বিদ্রোহে যোগ দেয়। সিজার ছিল দয়ালু ও বুদ্ধিমান। তিনি প্রতারণা করার পরেও ল্যাবিয়েনাসকে ক্ষমা করেন এবং সসম্মানে রোমে প্রত্যাবর্তনের ব্যবস্থা করেন। এতে সেনাবাহিনীর মধ্যে সিজারের মাহাত্ম্য আরো বেড়ে যায়। এ খবর শুনে পম্পে, কেটো, সিসেরোরা রোম ছেড়ে সাময়িকভাবে পালিয়ে যায়। আর অকৃতজ্ঞ ল্যাবিয়েনাস পম্পের সাথে পুনরায় যোগ দেয়। পরবর্তীতে যুদ্ধে ল্যাবিয়েনাস নিজের সাবেক সৈন্যদের হাতেই নিহত হন। পম্পেকে সিজার ক্ষমা করতেন। কিন্তু পম্পে তা অপমানজনক মনে করে মিশরে পালিয়ে যান। মিশরের রাজা (ফারাও) দ্বাদশ টলেমি পম্পের ঘনিষ্ঠ বন্ধু ছিলেন। কিন্তু তার বালক পুত্র ত্রয়োদশ টলেমি পম্পের সাথে প্রতারণা করেন। মিশরে পৌঁছামাত্র ফারাওয়ের সৈন্যরা পম্পেকে শিরোঃচ্ছেদ করে হত্যা করে। দুঃখের বিষয় পম্পের হত্যাকারী রোমান নাগরিক সেপটিমিয়াসও একসময় পম্পের অধীনে একজন সৈন্য ছিল। পরবর্তীতে ফারাওয়ের অধীনে উচ্চ বেতনে সামরিক বাহিনীতে যোগ দেয়।

সিজার মিশরে পৌঁছালে তাকে পম্পের মাথা উপহার দেয়া হয়। সিজারের মূল্যবোধ ছিল অন্যরকম। সিজার শত্রুকেও সম্মান দিতে জানতেন। সিজার সাবেক বন্ধুর এই করুণ পরিণতিতে ক্ষুব্ধ হয়ে উঠেন এবং ফারাওয়ের নিজ দরবারেই ফারাওকে বর্বর বলে গালি দেন। ফারাও ভেবেছিলেন পম্পেকে হত্যা করলে সিজার বরং আনন্দিত হবেন। মাত্র ১ লিজিয়ন সৈন্য নিয়ে সিজার পুরো মিশরকে কাঁপিয়ে দিয়েছিলেন। আর মাত্র আধা লিজিয়ন সৈন্য নিয়ে বর্বর ফারাওকে উৎখাত করে ক্ষমতায় বসান তার বোন ক্লিওপেট্রাকে। সে আরেক ইতিহাস। সিজার মিশরেই পম্পের শেষকৃত্য করেন। এসময় সিজারের চোখে ছিল জল। সিজার পম্পের হত্যাকারী সেপটিমিয়াসকে খুঁজে বের করে শিরোঃচ্ছেদ করেন। মিশর জয় করে ৪৭ খ্রিস্টপূর্বাব্দে রোমে ফিরে সিজার পম্পের শেষকৃত্যের ছাই তার স্ত্রী কর্নেলিয়াকে পৌঁছে দেন ও কর্নেলিয়ার নিরাপত্তার দায়িত্বও গ্রহণ করেন। বলা বাহুল্য কর্নেলিয়ার নিজের পিতা স্কিপিও সিজারের বিরুদ্ধে আফ্রিকায় যুদ্ধের প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। স্কিপিও কেটোর অনুসারী ছিলেন। যুদ্ধে স্কিপিওর পরাজয় হলে কেটো ও স্কিপিও আত্মহত্যা করেন। তবে কর্নেলিয়া সসম্মানেই রোমে বাস করছিলেন।

সিজার যখন মিশরে ছিলেন তখন রোমের সেনাবিদ্রোহ সামাল দিতে অর্ধেক লিজিয়ন সৈন্যসহ এন্টনিকে রোমে ফেরত পাঠান। এন্টনি ১০ম লিজিয়নের সৈনিকদের সাথে মধ্যস্থতা করার চেষ্টা করেন। এন্টনি বলেন, সিজার আসলে সব সমস্যার সমাধান হবে। সৈনিকরা এন্টনির আশ্বাসে কোন ভ্রুক্ষেপই করেনি, বরং এন্টনিকে অস্ত্রসহ ধাওয়া করে। এন্টনি পালিয়ে প্রাণ রক্ষা করে। তাদের কথা ছিল, আমরা সিজারের সাথে বোঝাপড়া করবো।

সিজার ফিরে এসে এন্টনি ও লেপিডাস সিজারকে পরিস্থিতির গুরুত্ব বুঝানোর চেষ্টা করেন। এবং দু’জনই সিজারকে ১০ম লিজিয়নের ক্যাম্পে যেতে নিষেধ করেন। তারা ভেবেছিলেন সৈন্যরা সিজারকে হত্যাও করতে পারে। তারা বরং ১০ম লিজিয়নকে আক্রমণ করে পরাজিত করার চিন্তা করছিলেন। সিজার বলেন, আমার সৈন্যরা আমার সন্তানের মতো। ওরা আমাকে মারবে এ আমি বিশ্বাস করিনা। সিজার সেখান থেকে উঠে মাত্র দু’জন সৈন্য নিয়ে সরাসরি ১০ম লিজিয়নে পৌঁছান। সিজারকে একা আসতে দেখে বিদ্রোহীরা অবাক হয়ে যায়। সিজার একাই হেঁটে হেঁটে বিদ্রোহীদের সদর দপ্তরে গিয়ে কমান্ডারের চেয়ারে বসেন। বিদ্রোহীরা শান্ত হয়ে যায়। কেউ সিজারকে আক্রমণ তো দূরের কথা, সিজারের সামনেই যেতে সাহস পাচ্ছিল না। অবশেষে তারা আসে। সিজার বলে, তোমাদের কোন দুঃখ কষ্ট থাকলে বলতে পারো। তখন বিদ্রোহীরা বলে, আমরা ওয়াদামাফিক জমি চাই, নগদ অর্থ চাই এবং অবসর চাই। সিজার আবারো জিজ্ঞেস করেন, আর কিছু চাওয়ার আছে তোমাদের? সৈন্যরা বলে, স্যার আর কোন দাবি নেই। সিজার বলেন, মঞ্জুর। এই কথা শুনে সৈন্যরা আনন্দে ফেটে পড়ে। সিজারের নামে জয়ধ্বনি দেয়। কিন্তু সিজার ভারাক্রান্ত মনে ক্যাম্প থেকে বেরিয়ে আসেন।

এসময় সিজার স্কিপিওর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে আফ্রিকা যাবার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। অন্যান্য সকল লিজিয়ন যখন যুদ্ধের প্রস্তুতি নিচ্ছে তখন ১০ম লিজিয়ন যাচ্ছে অবসরে। তখন তারা বুঝতে পারলো তাদের এই বিদ্রোহ আসলে তাদের রোমান জনগণের কাছে কাপুরুষে পরিণত করেছে। লজ্জায় তারা সিজারের কাছে ক্ষমা চায়। সিজার তাদের ক্ষমা করেন। কিন্তু যুদ্ধে সঙ্গে নিতে রাজি হচ্ছিলেন না। তখন তারা বুঝতে পারে তারা সিজারের মনে কতো আঘাত দিয়ে ফেলেছে। ১০ম লিজিয়ন সিজারের সাথে আফ্রিকা যেতে ধনুকভাঙ্গা পণ করে। না হলে তারা গণহারে আত্মহত্যার প্রস্তুতি নেয়। তারা সিজারের দেয়া জমি, অর্থ সব ফিরিয়ে দেয়। সিজারের কাছে তারা হারানো গৌরব ফিরিয়ে দিতে প্রার্থনা করেন। শেষ পর্যন্ত সিজার তাদের আফ্রিকায় সাথে নিতে রাজি হন। আফ্রিকায় সিজারের বিজয় হয়। যুদ্ধের পর শুধুমাত্র ১০ম লিজিয়ন নয়, সকল লিজিয়নকেই সিজার নগদ অর্থ ও জমি প্রদান করতে আইন পাশ করেন।

একজন মানুষ একদিকে কিংবদন্তি হয় না। সিজারের ফুফা ম্যারিয়াস একসময় রোমের সবচেয়ে ক্ষমতাধর ব্যক্তি ছিলেন। ম্যারিয়াসকে পরাজিত করে সুল্লা ক্ষমতা দখল করেন। সুল্লা ছিলেন একজন টাইর‍্যান্ট। পম্পে ছিলেন সুল্লার প্রধান জেনারেল। সুল্লা সিজারকে হত্যার নির্দেশ দেন (Proscription)। ভাগ্যের কি পরিহাস সিজার বেঁচে যান কোনভাবে। নির্বাসিত হয়ে বিভিন্ন দেশে দেশে ঘুরে বেড়ান। এসময় একদিন সিজার কাঁদছিলেন। একজন জিজ্ঞেস করে, তুমি কাঁদছো কেন? সিজার বলেন, আমার বয়সে আলেকজান্ডার সমগ্র পৃথিবী দখল করে ফেলেছিল, আর আমি কপর্দকহীনভাবে নির্বাসিত হয়ে পড়ে আছি। মানুষ তার স্বপ্নের সমান বড়। সিজার কোন রাজা ছিলেন না, সম্রাট ছিলেন না। তবুও সিজার শব্দের প্রতিশব্দ হয়ে উঠেছে সম্রাট।

Related Articles

Adblock Detected

Please consider supporting us by disabling your ad blocker