বাক্যবিশ্লেষণহোমপেজ স্লাইড ছবি

ইলুমিনাতি : বর্তমান পৃথিবীর নিয়ন্ত্রক?

মঞ্জুর দেওয়ান: ইলুমিনাতি শব্দটি শুনলে অনেকে রহস্যের গন্ধ পান। কেউবা পান ষড়যন্ত্রের! ১৭৭৬ সালের ১ মে সংগঠিত প্রতিষ্ঠানটি নিয়ে মানুষের ধারণা দিনে দিনে এমন জায়গাতেই পৌঁছেছে। বিশেষ করে নানা সময়ের চাঞ্চল্যকর কিছু ঘটনা এমন কিছু ভাবতে বাধ্য করেছে। খ্রিষ্টধর্ম ও রাজতন্ত্রের বিনাশ, পারিবারিক বন্ধন ও বিবাহ নামক সামাজিক বন্ধন ছিন্ন করাসহ আরো বেশকিছু প্রথাকে মুছে দেয়াই ছিলো এর শুরুর দিকের লক্ষ্য। আঠারোশো শতকের কিছুকাল আগে থেকে সংগঠিত হওয়া পৃথিবীর বড় সব যুদ্ধের পেছনে ছিলো এই গুপ্ত সংগঠনটির হাত। একচোখা চিহ্ন নিয়ে ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকেও বেশ আলোচিত। ইসলামিক দৃষ্টিকোণে ইলুমিনাতি হলো সেই সংঘ যেটি দাজ্জালকে নির্দেশ করে। আর বাইবেলের মতে অ্যান্টিক্রাইস্ট!

একটি স্পর্শকার্তর ও রহস্যে ঘেরা সংগঠন হয়েও লোক চক্ষুর আড়ালে ইলুমিনাতি। সাধারণ মানুষের কাছে ইলুমিনাতি শব্দটি অপরিচিত হলেও এর প্রভাব সবাই অবলোকন করছে দীর্ঘদিন ধরে। কেননা, বিশ্বের ক্ষমতাধর সব রাজনীতিবিদ, ধনী আর রাঘববোয়ালদের সংমিশ্রণে প্রতিষ্ঠিত সংগঠনের প্রভাব এড়ানো আম জনতার পক্ষে সম্ভব হয়ে উঠেনি। কোনো না কোনো ভাবে বিশ্বের সকল দেশের রাজনীতি, অর্থনীতি এবং মিডিয়াকে নিয়ন্ত্রণ করছে। নিজেদের ক্ষমতাকে কাজে লাগিয়ে গোটা বিশ্বকে নিজেদের তৈরি নিয়মের মধ্যে নিয়ে আসতে চান ইলুমিনাতির সদস্যরা। একটি সূক্ষ্ম প্রক্রিয়ার মাধ্যমে কাজগুলো করার ফলে সাধারণ মানুষের চোখ এড়িয়ে যাচ্ছে ইলুমিনাতির কার্যক্রম।

তবে এই সংগঠনের গোড়াপত্তন নিয়ে ভিন্ন মত লক্ষ্য করা গেছে। ১৭৭৬ সালে অ্যাডাম উইশপট যখন বাভারিয়ান ইলুমিনাতি নামক সোসাইটি গঠন করে তখন তার উদ্দেশ্য ছিলো এখনকার ইলুমিনাতির তুলনায় অনেকটাই ভিন্ন। তখনকার সমাজ ব্যবস্থায় কুসংস্কারের আনাগোনাকে দূরে ঠেলে দেয়ার জন্য কাজ করতে চেয়েছিলেন আইনের অধ্যাপক অ্যাডাম উইশপট। চলমান খ্রিষ্টান সমাজ ব্যবস্থার বাইরে যাওয়া ছিলো ঘোর অপরাধ। অ্যাডাম উইশপট তখন একটি গুপ্ত সংগঠনের মাধ্যমে সমাজ ব্যবস্থাকে বদলানোর চিন্তা করলেন। একা একটি সমাজকে বদলে দেয়া সম্ভব না বুঝতে পেরে শিক্ষিত ও ধনী ব্যক্তিদের ইলুমিনাতির অংশ করতে চান। অ্যাডাম উইশপট সক্ষমও হন। তখনকার সময়ের ধনী ও বিশিষ্ট ব্যক্তিদের দলে টানতে সমর্থ হন।

কিন্তু অ্যাডামের চিন্তাধারা সমাজ থেকে কুসংস্কারকে দূর করা হলেও নতুন করে যোগ দেয়া সদস্যদের চিন্তা ছিলো একেবারেই ভিন্ন। তাড়া নতুন নিয়ম প্রবর্তন করে পৃথিবীকে বদলাতে চান। পুরো পৃথিবীকে নিজেদের শাসনে আনা-ই ছিলো ওই সদস্যদের মূল লক্ষ্য। নিজেদের দলকে আরোও ভারি করতে সারা পৃথিবীর ক্ষমতাধর ব্যক্তিদের দলে আনতে চায় তারা। কেউ স্বেচ্ছায় না আসলে তাকে কৌশলে দলে টেনে নিতো ইলুমিনাতি। যাদেরও মূল উদ্দেশ্য হয়ে যায় পুরো পৃথিবীর শাসন ব্যবস্থাকে নিজেদের করে নেয়া। উদ্দেশ্য, সুনির্দিষ্ট দেশের মানুষকে ক্ষমতায় বসিয়ে রাখলেও পেছন থেকে কলকাঠি নাড়বেন তারা।

আবারও ফিরে যাওয়া যাক পিছনে! ইলুমিনাতির প্রতিষ্ঠার দশ বছর না যেতেই ইলুমিনাতির সদস্য সংখ্যা দাড়ায় ৬৫০ এ। তবে অ্যাডামের হিসেবে তার সংখ্যা দুই হাজারের উপরে। এসব সদস্য গোপনে যোগদান করলেও একসময় ইলুমিনাতির ঠিক উল্টো মতবাদে বিশ্বাসী আরেকটি সংগঠন রসিক্রুসিয়ানরা জেনে যায়। ইলুমিনাতি ধর্মনিরপেক্ষতার কথা বললেও একটি নাস্তিক সংঘ হিসেবে পরিচিতি পেয়ে যায় ইউরোপে। নাস্তিকতার বিরুদ্ধে ব্যাপক জনমত গড়ে উঠার পর তখনকার বাভারিয়ার শাসক চার্লস থিওডোর, ইলুমিনাতিকসহ সকল গুপ্ত সংগঠন নিষিদ্ধ ঘোষণা করে। উপায়ন্ত না দেখে অ্যাডাম পালিয়ে যান। অ্যাডামের অনুপস্থিতিতে ইলুমিনাতির অনেক নথি সরকারের হাতে চলে আসে। তারপর থেকে এর শেষই দেখে আসছিলেন সবাই। কিন্তু এর পরের শতকের বড় কিছু ঘটনা ইলুমিনাতিকে আবার জনসম্মুক্ষে নিয়ে আসে।

ফরাসী বিপ্লবের মধ্য দিয়ে নতুন করে আলোচনায় আসে ইলুমিনাতি। নেপোলিয়নের ওয়াটারলু যুদ্ধের ফলাফলের পেছেনেও ছিলো ইলুমিনাতির হাত। বিভিন্ন সময়ে মার্কিন প্রেসিডেন্টদের হত্যার পেছনের কলকাঠিও নেড়েছেন। হেনরি হ্যারিসন, জ্যাকরী টেলর, আব্রাহাম লিঙ্কনের মতো বিখ্যাত প্রেসিডেন্টদের হত্যাকাণ্ডে ইলুমিনাতির হাত ছিলো। বাংলাদেশের মতো তৃতীয় বিশ্বের দেশেও রয়েছে ইলুমিনাতির আধিপত্য। ইলুমিনাতি নিজের নামে কোন কর্মকাণ্ড পরিচালনা করেনা। তাই আমাদের আশেপাশের বিশেষ কেউ হয়তো গোপন এই সংগঠনের হয়ে কাজ করছে!

Related Articles

Adblock Detected

Please consider supporting us by disabling your ad blocker