খেলা

‘আন্দ্রেস এস্কোবার’ আত্মঘাতী গোল যার জন্য ছিল প্রাণঘাতী!

 

সাইদুর রহমান সেতুঃ

২২ জুন ১৯৭৪, আমেরিকা বনাম কলম্বিয়ার মধ্যকার ম্যাচ। উপস্থিত দর্শকের সংখ্যা ৯৩ হাজারেরও বেশি। হাই ভোল্টেজ এই ম্যাচের ৩৫ তম মিনিটে আমেরিকান মিডফিল্ডার জন হার্কসের একটি ক্রস ফেরাতে গিয়ে ভুলক্রমে নিজেদের জালে জড়িয়ে ফেলেন কলম্বিয়ান ডিফেন্ডার আন্দ্রেস এস্কোবার।কিন্তু তিনি কী জানতেন এই আত্মঘাতী গোলের ফলে তার মৃত্যু পরোয়ানায় স্বাক্ষর করা হয়ে গেছে?নির্মম মনে হলেও সত্যিই শুধুমাত্র একটি আত্মঘাতী গোলের জন্যে প্রাণ দিতে হয় ‘দি জেন্টেলম্যান’ ডাকনামের আদ্রেস এস্কোবারকে১৯৯৮ সালের বিশ্বকাপে কলম্বিয়া ছিলো হট ফেবারিট দল। লোজানো,  ভালদেরামা, ভ্যালেন্সিয়াদের নিয়ে গড়া কলম্বিয়া আশা জাগিয়েছিলো তাদের পুরো দেশের মানুষের।কলম্বিয়ার ফুটবলের উন্নতির পিছনে ছিলো মূলত অঢেল টাকার বিনিয়োগ। যার সিংহভাগ অর্থের যোগান দিয়েছিলো কলম্বিয়ার তৎকালীন কুখ্যাত ড্রাগ লর্ডরা। আর্জেন্টিনা, পেরু, প্যারাগুয়েকে হারিয়ে বিশ্বকাপ বাছাই পর্বের গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন হয়ে কলম্বিয়া পুরো বিশ্বকেই জানিয়ে দিয়েছিলো তাদের অপার সম্ভাবনার কথা।

তবে বিশ্বকাপের মূল পর্বে এসে কেনো জানি খেই হারিয়ে ফেলে কলম্বিয়া।হারের বৃত্তে ঘুরতে থাকে পুরো দল।প্রথম ম্যাচেই রোমানিয়ার কাছে ৩-১ গোলে হেরে বড় ধাক্কা খায় কলম্বিয়া। পরের রাউন্ডে যেতে হলে পরের ম্যাচে আমেরিকার বিরুদ্ধে অবশ্যই জিততে হতো কলম্বিয়াকে। কিন্তু বিধিবাম, আন্দ্রেস এস্কোবারের আত্মঘাতী গোলের পরে আর ঘুরে দাড়াতে পারেনি কলম্বিয়া। ফলাফল ২-১ গোলের পরাজয়। এই হারের পরেই বিশ্বকাপ থেকে বাদ পড়ে যায় কলম্বিয়া।শেষ ম্যাচে সুইজারল্যান্ডের বিপক্ষে ২-০ গোলের জয় ছিলো শুধুই সান্ত্বনা।কলম্বিয়ার সাধারণ জনগণ তাদের বিশ্বকাপের ভরাডুবির জন্যে দায়ী করে এস্কোবারের আত্মঘাতী গোলটিকে।হত্যার হুমকিও দেয়া হয় এস্কোবারকে। নিজের জীবন নিয়ে ভীত এস্কোবার সাহায্য চেয়েছিলেন পুলিশের কাছে। কিন্তু শেষ রক্ষা হয়নি। শেষ পর্যন্ত জুলাই মাসের দুই তারিখে, বিশ্বকাপ থেকে ফেরার মাত্র ১০ দিনের মাথায় রাত তিনটার সময় মেডেলিনের এক পার্কিং লটে আতোতায়ীর হামলার শিকার হন এস্কোবার। তার দিকে ১২ টি গুলি ছোড়ে খুনিরা। অনর্থক প্রতিহিংসায় উন্মাদ খুনি প্রতিবার গুলি করে গোল…গোল… বলে উল্লাস করেছিল। আক্রান্ত হওয়ার ৪৫ মিনিটের মাথায় একটি হাসপাতালে মারা যান আন্দ্রেস এস্কোবার।আন্দ্রেস এস্কোবারের এই করূণ পরিণতি যেনো কিছুতেই মেনে নিতে পারছিলো না কলম্বিয়ানরা। শোকে স্তব্ধ হয়ে যায় পুরো জাতি। ৩ দিনের রাষ্ট্রীয় শোক ঘোষণা করা হয় এস্কোবারের মৃত্যুতে। কলম্বিয়ার জাতীয় ফুটবল দলের অনেক তারকাই পদত্যাগ করেন এই ঘটনার প্রতিবাদ হিসেবে। এর পরে টানা চারটি বিশ্বকাপ খেলারই যোগ্যতা অর্জন করতে পারেনি কলম্বিয়া।এস্কোবারকে হত্যা করার দায়ে ক্যাস্ট্রো মুনোজ নামের এক ব্যক্তিকে আটক করা হয়। ১৯৯৫ সালে বিচার কার্য শেষে তাকে ৪৩ বছরের সাজা দেয় আদালত। যদিও মাত্র এগারো বছর পরেই জেলের বাহিরে চলে আসে সে।আন্দ্রেস এস্কোবারের স্মরণে মেডেলিনের রোসালেসে নির্মিত ভাস্কর্যে প্রতি বছর শ্রদ্ধা জানায় পুরো পৃথিবী। মাত্র ২৭ বছর বয়সে অকালে চলা যাওয়া এই প্রতিভাবান ফুটবলারকে পুরো ফুটবল বিশ্ব শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করে রেখেছে।

 

Related Articles

Adblock Detected

Please consider supporting us by disabling your ad blocker